মধ্যপ্রাচ্যের স্পর্শকাতর অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক মোতায়েন এবং সেনাসদস্যদের মানসিক চাপ ও জীবনযাত্রার মানের চরম অবনতি ঘটায় যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণুশক্তিচালিত বিশাল বিমানবাহী রণতরী ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’ অবশেষে থাইল্যান্ডের উপকূলে নোঙর করছে। টানা ২০০ দিনেরও বেশি সময় সমুদ্রবক্ষে অবস্থান করার পর আগামী সপ্তাহে মার্কিন এই যুদ্ধজাহাজটি থাইল্যান্ডের সমুদ্রসীমায় পৌঁছাবে বলে নিশ্চিত করেছেন থাইল্যান্ড সরকারের উচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তা। মধ্যপ্রাচ্য ছেড়ে আসা এই রণতরীটি আধুনিক ইতিহাসে টানা সমুদ্রে অবস্থান করার ক্ষেত্রে এক নতুন রেকর্ড গড়েছে বলে উল্লেখ করেছেন মার্কিন ডেমোক্র্যাটদলীয় আইনপ্রণেতারা। সাধারণত পেন্টাগনের নিয়ম অনুযায়ী মার্কিন নৌবাহিনীর কোনো মিশন বা মোতায়েন ৬ থেকে ৯ মাসের জন্য নির্ধারিত থাকে, তবে সংঘাতময় বিশেষ পরিস্থিতিতে এই সময়সীমা বৃদ্ধি করা হয়। প্রায় ৫ হাজার নাবিক ও মেরিন সেনাসদস্যকে বহনকারী এই বিশাল রণতরী মূলত দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার পর শারীরিক ক্লান্তি দূর করা, বিশ্রাম ও বিনোদনের উদ্দেশ্যে থাইল্যান্ডে যাত্রাবিরতি করছে।
থাইল্যান্ডের নৌবাহিনী নিশ্চিত করেছে যে, মার্কিন নৌবাহিনীর এই শক্তিশালী ‘ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ’ তাদের সেনাসদস্যদের শারীরিক ও মানসিক বিশ্রাম প্রদান, বিনোদন এবং প্রয়োজনীয় জ্বালানি ও রসদ সংগ্রহের অংশ হিসেবেই পূর্ব থাইল্যান্ডের বন্দরে সংক্ষিপ্ত অবস্থান নেবে। তবে এই সফরকালে দুই দেশের মধ্যে কোনো যৌথ সামরিক মহড়া অনুষ্ঠিত হবে না। নিরাপত্তার স্বার্থে থাই নৌবাহিনী সুনির্দিষ্ট কোনো তারিখ কিংবা এই বহরে থাকা অন্য ৩টি মার্কিন যুদ্ধজাহাজের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি। থাই নৌবাহিনীর মুখপাত্র এক বিবৃতিতে স্পষ্ট করেছেন, এই স্থগিতাদেশটি একটি নিয়মিত বন্দর সফরের অংশ, যার মূল লক্ষ্য সেনাসদস্যদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও লজিস্টিক সহায়তা নিশ্চিত করা। অবশ্য এই সফর এবং সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে ব্যাংককে অবস্থানরত মার্কিন দূতাবাস তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করা থেকে বিরত থেকেছে।
উল্লেখযোগ্য যে, গত নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের সান ডিয়েগোর প্রধান সামরিক ঘাঁটি থেকে নিজ মিশন নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’। পরবর্তীতে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যবর্তী সামরিক যুদ্ধ পরিস্থিতিতে পেন্টাগনের নির্দেশে এটিকে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত অঞ্চলে মোতায়েন করা হয়। দীর্ঘদিন সামরিক অভিযানের চাপে রণতরীটির সৈন্যদের মানসিক ও শারীরিক বিধ্বস্ত দশা নিয়ে চলতি মাসেই মার্কিন সামরিক সংবাদমাধ্যম ‘নেভি টাইমস’ এবং ‘স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস’ বিশেষ তদন্তমূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে উল্লেখ করা হয়, টানা সাগরে অবস্থানের কারণে নাবিকদের আত্মহত্যার চেষ্টা এবং মনোবল ভেঙে পড়ার একাধিক ঘটনা ঘটেছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এসব প্রতিবেদন ভিত্তিহীন বলে প্রত্যাখ্যান করেন এবং দাবি করেন জাহাজের প্রকৃত পরিস্থিতিকে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ১৯৫৪ সাল থেকে মিত্রতা বজায় রাখা এবং ২০০৩ সালে ‘মেজর নন-ন্যাটো অ্যালাই’ মর্যাদা পাওয়া থাইল্যান্ড মূলত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মূল ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান ও সুদৃঢ় সামরিক অংশীদার হিসেবে কাজ করে আসছে।
(সূত্র: রয়টার্স, নেভি টাইমস, স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস)