ইয়েমেনের কৌশলগত লোহিত সাগরের তীরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ বন্দরশহর হোদেইদায় ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে এক জোরালো ও ঝটিকা অভিযান চালিয়েছে ইয়েমেনের সরকারি সামরিক বাহিনী ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্স (এনআরএফ)। সরকারি বাহিনীর এই হামলায় অন্তত ১৪ জন হুথি যোদ্ধা নিহত হয়েছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যার দিকে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে ইয়েমেনের ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্স (এনআরএফ) এই রক্তক্ষয়ী সেনা অভিযানের তথ্য নিশ্চিত করেছে। এনআরএফের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, হোদেইদা শহরের ভেতরে হুথিদের সামরিক ঘাঁটি, ঘাঁটিসংক্রান্ত স্থাপনা ও শক্ত ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে এই ঝটিকা হামলা পরিচালনা করা হয়, যার ফলে ১৪ জন হুথি সদস্য প্রাণ হারান। তবে সরকারি বাহিনীর এই বড় ধরনের আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ ও হতাহতের ঘটনার বিষয়ে বিদ্রোহী হুথি গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ফোর্সের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বিদ্রোহী হুথিদের দখল থেকে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো পুনরুদ্ধার করতে মঙ্গলবার হোদেইদায় বিশেষ ‘প্রতিরোধমূলক’ পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য সরাসরি নির্দেশ প্রদান করেছিল ইয়েমেনের উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিল। শীর্ষ কাউন্সিলের সেই সরাসরি নির্দেশের ভিত্তিতেই মাঠপর্যায়ে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে এই অভিযান পরিচালনা করা হয়। ইয়েমেনের সরকারি রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সাবার পরিবেশিত তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের পরিষদ সভায় কৌশলগত এই অভিযানের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। রিয়াদের সেই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে ইয়েমেনের প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিল এবং সৌদি নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক সামরিক জোটের শীর্ষ প্রতিনিধিরা সশরীরে উপস্থিত থেকে এই সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেন।
মঙ্গলবারের সফল অভিযানের পর প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়, ইয়েমেন রাষ্ট্র তার হারানো প্রতিষ্ঠানগুলো পূর্ণ উদ্ধার করতে, সমগ্র জাতীয় ভূখণ্ডের উপর আইনগত কর্তৃত্ব পুনরায় প্রতিষ্ঠা করতে এবং ইরান-সমর্থিত সন্ত্রাসী হুথি মিলিশিয়াদের অরাজকতায় সৃষ্ট দীর্ঘদিনের মানবিক দুর্ভোগের অবসান ঘটাতে সর্বাত্মক চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। উল্লেখ্য, ২০১৪ সালে ইয়েমেনে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। গৃহযুদ্ধ শুরুর মাত্র এক বছরের মাথায় ২০১৫ সালে হুথি বিদ্রোহীরা আচমকা রাজধানী সানা দখল করে নিলে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মনসুর আবদ-আল হাদি সৌদিতে পালিয়ে যান। পরবর্তীতে হাদির আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে পুনরায় ক্ষমতায় বসাতে ওই বছর থেকেই ইয়েমেনে সরাসরি বিস্তৃত সামরিক অভিযান শুরু করে সৌদি সেনাবাহিনী, যা এখনও দৃশ্যমান রয়েছে।
বর্তমানে ইয়েমেনের মোট ভৌগোলিক ভূখণ্ডের প্রায় অর্ধেকের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে হুথি গোষ্ঠীর হাতে এবং বাকি অর্ধেক অংশ পরিচালিত হচ্ছে সৌদি সমর্থিত প্রেসিডেন্সিয়াল কাউন্সিল সরকারের মাধ্যমে। এই প্রেসিডেন্সিয়াল কাউন্সিল আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করেছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি সেনাবাহিনীর উপস্থিতি না থাকলে হয়তো এতদিনে পুরো ইয়েমেনের নিয়ন্ত্রণ হুথিদের হাতে চলে যেত। দীর্ঘ সংঘাতের পর ২০২২ সালে সৌদি আরব এবং হুথি গোষ্ঠী এক অনানুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। তারপর থেকে উভয়পক্ষ বড় ধরনের হামলা থেকে বিরত থেকে যুদ্ধবিরতি মেনে চললেও, গত সপ্তাহে সানার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের গুরুত্বপূর্ণ রানওয়েতে এক ভয়াবহ হামলা চালানো হয়। সৌদি সমর্থিত প্রেসিডেন্সিয়াল কাউন্সিল সরকার সেই রানওয়ে হামলার সরাসরি দায় স্বীকার করার পর থেকেই মূলত সৌদি আরব ও হুথি গোষ্ঠীর মধ্যে পুনরায় ব্যাপক সামরিক উত্তেজনার পারদ চড়তে শুরু করেছে।
(সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি)