উৎক্ষেপণস্থল থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে যুক্তরাষ্ট্রের আকাশসীমার কাছাকাছি থাকা বিমানে নিখুঁতভাবে আঘাত হানতে সক্ষম এক অভিনব ও শক্তিশালী হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে চীন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গের এক বিশেষ প্রতিবেদনে চীনা সামরিক উৎসের বরাতে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। ব্লুমবার্গকে একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, চীন এমন এক ধরনের হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকেল তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে, যা হাজার হাজার মাইল দূরে অবস্থানরত পেন্টাগনের কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল এয়ারক্রাফটের মতো উচ্চমূল্যের ও কৌশলগত দূরপাল্লার লক্ষ্যবস্তুতে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে আঘাত হানবে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে দীর্ঘ ছয় মাসব্যাপী রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর যুক্তরাষ্ট্র যখন নিজেদের মূল আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র এবং অত্যন্ত দূরপাল্লার অস্ত্রের মারাত্মক সরবরাহ ঘাটতি ও সংকটে ভুগছে ঠিক তখনই চীনের অস্ত্রাগারে এই শক্তিশালী প্রযুক্তির সংযোজন ওয়াশিংটনের জন্য বড় ধরনের উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
চীনা এই নতুন প্রযুক্তি মার্কিন বিমান বাহিনীর আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী বিশেষ ট্যাংকার, আকাশ থেকে আগাম সতর্কতা ও নিয়ন্ত্রণকারী বিমান এবং উড়ন্ত কমান্ড পোস্টের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামরিক বিমানগুলোর নিরাপত্তার জন্য এক বিশাল ও প্রত্যক্ষ হুমকি হয়ে উঠতে পারে। সামরিক সূত্রের বরাতে ব্লুমবার্গ জানিয়েছে, চীনের সামরিক বাহিনী তাদের বেশ কিছু শক্তিশালী হাইপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রে বিশেষ আকাশ থেকে আকাশে লক্ষ্যভেদের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত করেছে। সেই সঙ্গে বেশ কিছু নতুন তৈরি ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে জাহাজ-বিধ্বংসী বিশেষ সক্ষমতাও সফলভাবে সংযোজন করেছে। উল্লেখ্য, বর্তমানে গোটা বিশ্বের একমাত্র দেশ হিসেবে চীনই অত্যন্ত প্রকাশ্যে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণে সক্ষম হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকেল (এইচজিভি) তৈরি ও পরিচালনা করছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে চীনা সেনাবাহিনীর সংগ্রহে ৩ হাজার ১৫০টিরও বেশি শক্তিশালী ব্যালিস্টিক অস্ত্র রয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে একক দেশ হিসেবে সর্বোচ্চ। সামরিক অভিযানের পরিধি অভাবনীয়ভাবে বাড়াতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং যেভাবে দেশের ক্ষেপণাস্ত্র বহরকে ঢেলে সাজাচ্ছেন, এই অর্জন তারই অন্যতম সেরা দৃষ্টান্ত।
প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণে দেখা যায়, হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকেল বা এইচজিভি মূলত এক বিশেষ ধরণের অত্যন্ত আধুনিক ওয়ারহেড। এই ওয়ারহেড ব্যালিস্টিক বা ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে বায়ুমণ্ডলে উৎক্ষেপণের পর শব্দের চেয়ে বহু গুণ বেশি দ্রুতগতিতে গতিপথ পরিবর্তন করে উড়ে যেতে পারে। অত্যন্ত দ্রুতগতির কারণে এবং গন্তব্যে যাওয়ার পথে হঠাৎ করে দিক পরিবর্তনের বিশেষ সক্ষমতা থাকায় একে মাঝপথে রাডার দিয়ে চিহ্নিত করে ধ্বংস করা কিংবা প্রতিরোধ করা প্রায় অসম্ভব। চায়না অ্যারোস্পেস স্টাডিজ ইনস্টিটিউট ও আন্তর্জাতিক ব্লুমবার্গের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, চীনের তৈরি ডিএফ-১৭ ক্ষেপণাস্ত্র থেকে উৎক্ষেপণ করা এইচজিভি প্রায় ২ হাজার ৪১৪ কিলোমিটার দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তুতে অনায়াসে আঘাত করতে পারে, যা চীন থেকে প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান সামরিক ঘাঁটি গুয়াম ভূখণ্ডের ব্যবধানের প্রায় সমান।
অন্যদিকে, বেইজিংয়ের আরও সর্বাধুনিক ও বিধ্বংসী ডিএফ-২৭ ক্ষেপণাস্ত্রের আনুমানিক পাল্লা প্রায় ৮ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত। এর সরাসরি অর্থ হলো, চীনের নিজস্ব ভূখণ্ড থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের মতো সুদূরবর্তী অঞ্চলের সংবেদনশীল মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম ও ঘাঁটিগুলো এখন বেইজিংয়ের সরাসরি নাগালের মধ্যে চলে এসেছে। তবে এত সুবিধার মধ্যেও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রূপান্তর করে দূরবর্তী উড়োজাহাজে আক্রমণ চালানো সামরিক কৌশলে বেশ ব্যয়বহুল, প্রযুক্তিগতভাবে কঠিন এবং ঝুঁকিপূর্ণ। সর্বোচ্চ দূরত্ব অতিক্রম করে কোনো লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের অন্তত ২০ মিনিট বা তার বেশি সময় প্রয়োজন হয়। তাই দীর্ঘপথ অতিক্রম করার পুরো সময়জুড়ে নিখুঁত ও ক্রমাগত হালনাগাদকৃত উপাত্ত পেতে হয়, যাকে সামরিক পরিভাষায় ‘কিল চেইন’ বলা হয়। বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, এই প্রক্রিয়ায় সময় বেশি লাগায় প্রতিপক্ষ দেশের পক্ষে সেন্সর সংযোগ বিচ্ছিন্ন বা ব্যাঘাত ঘটানো কিছুটা সহজ হতে পারে। তাছাড়া, ব্যালিস্টিক অস্ত্র দিয়ে হামলা চালালে প্রতিপক্ষ একে মারাত্মক পারমাণবিক আক্রমণ মনে করে ভুল করতে পারে, যা অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে পূর্ণাঙ্গ পারমাণবিক সংঘাত উসকে দিতে পারে।
এসব জটিলতা ও ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও চীন নিজেদের অস্ত্র আধুনিকায়ন দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে। পেন্টাগনের তথ্য বিশ্লেষণ করে ব্লুমবার্গ জানিয়েছে, ২০১৩ সালে শি জিনপিং ক্ষমতা গ্রহণের পর চীনের সামরিক উৎপাদন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বর্তমানে চীনের সামরিক বহরে ৩ হাজার ১৫০টি ব্যালিস্টিক এবং ৩০০টি স্থলভিত্তিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, যা ২০১৫ সালের তুলনায় ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনে যথাক্রমে ১৪৭ শতাংশ ও ৫০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নির্দেশ করে। অন্যদিকে, বেইজিংয়ের এই বিশাল আগ্রাসী তৎপরতা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মার্কিন সামরিক বাহিনীও প্রস্তুতি জোরদার করছে। যুক্তরাষ্ট্র তাদের আরটিএক্স করপোরেশনের এসএম-৬ এয়ার ডিফেন্স মিসাইলের ওপর ভিত্তি করে নতুন এআইএম-১৭৪বি ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেছে, যার স্থলভিত্তিক সংস্করণ ২৫০ মাইল দূরে লক্ষ্যভেদ করতে পারে। একই সঙ্গে মার্কিন নৌবাহিনী রায়থন কোম্পানির তৈরি এআইএম-৪২৪ ম্যালিস নামের আকাশ থেকে আকাশে হামলাকারী নতুন ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালাচ্ছে, যার পাল্লা ৩০০ মাইলের বেশি। এছাড়া লকহিড মার্টিন করপোরেশন তৈরি করছে দূরপাল্লার এআইএম-২৬০ ক্ষেপণাস্ত্র। পাশাপাশি ইউরোপে বহুল ব্যবহৃত এমবিডিএ ক্ষেপণাস্ত্র সিস্টেমের রামজেট ইঞ্জিনচালিত ‘মিটিওর’ ১০০ মাইলেরও বেশি দূরবর্তী শত্রু লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করতে পুরোপুরি সক্ষম।
(সূত্র: ব্লুমবার্গ)