ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬,  ১০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
যুক্তরাষ্ট্রের হুমকিতে ইরানের হুঁশিয়ারি, এক ফোঁটা তেলও নয় মঙ্গলবার রাজধানীর যেসব মার্কেট ও দোকানপাট বন্ধ ডিএনএ পরীক্ষায় মিলল পিতৃত্বের প্রমাণ, ফেঁসে গেলেন মাদরাসা শিক্ষক সাগর ছয় মাসে বন্ধ ৯৫ কারখানা, কর্মসংস্থান হারিয়েছেন প্রায় ৬২ হাজার শ্রমিক: সিপিডি রাজধানীতে ৫ হাজারের বেশি ইয়াবাসহ পল্লবী থানার এএসআই গ্রেপ্তার আলোচিত শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় হাইকোর্টের রায় আজ . ৯ জেলায় ঝোড়ো হাওয়াসহ বজ্রবৃষ্টির আভাস হাইতিতে রাতভর সশস্ত্র গ্যাংয়ের তাণ্ডব: নিহত অন্তত ৪৭ হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কড়াকড়ি: ৪৫ জাহাজের পণ্য জব্দের হুঁশিয়ারি ইরানকে একঘরে করতে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করল যুক্তরাষ্ট্র

দুই হাজার কোটি টাকা কর ফাঁকি

সামিটের ৭ পরিচালকের বিরুদ্ধে মামলার সিদ্ধান্ত এনবিআরের


  • আপলোড সময় : বৃহস্পতিবার ২০ আগস্ট, ২০২৬ সময় : ১১:১৭ এএম

দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান সামিট পাওয়ার লিমিটেড এবং সিঙ্গাপুরের অন্যতম শীর্ষ ধনকুবের আজিজ খান পরিবারের বিরুদ্ধে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা কর ফাঁকির গুরুতর অভিযোগ তুলেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এই বিশাল অঙ্কের কর ফাঁকির অভিযোগের বিপরীতে রাজস্ব বোর্ডের আইনি প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে এনবিআরের মুখোমুখি হয়ে গত দুই বছরে উচ্চ আদালতে একের পর এক মোট ২০টি রিট মামলা দায়ের করেছে সামিট গ্রুপ। তবে সমস্ত জটিলতা কাটিয়ে এবার ফাঁকি দেওয়া কর আদায় নিশ্চিত করতে এবং অপরাধের দায়ে সামিট পাওয়ারের সাতজন পরিচালকের বিরুদ্ধে সরাসরি ফৌজদারি মামলা দায়েরের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজস্ব বোর্ড। অভিযুক্ত এই সাতজন পরিচালকই মূলত আজিজ খান পরিবারের সদস্য।


জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অভ্যন্তরীণ নথিপত্র ও প্রাতিষ্ঠানিক সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বিদ্যুৎ খাতের অন্যতম প্রধান কোম্পানি সামিট পাওয়ার লিমিটেড। এই প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের এক ডজনেরও বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী ও সরবরাহকারী কোম্পানি পরিচালিত হয়। সামিট পাওয়ারের সিংহভাগ বা ৬৩ দশমিক ১৯ শতাংশ শেয়ারের মালিক মূল প্রতিষ্ঠান সামিট করপোরেশন। ফলে সামিট পাওয়ারের উপার্জিত বাৎসরিক মুনাফার ৬৩ দশমিক ১৯ শতাংশ অর্থ লভ্যাংশ বা ডিভিডেন্ড হিসেবে আইন অনুযায়ী সামিট করপোরেশনের অ্যাকাউন্টে জমা হয়।


অন্যদিকে, এই সামিট করপোরেশনের প্রায় ৯৯ শতাংশ শেয়ারের মালিকানা সিঙ্গাপুরে নিবন্ধিত আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান সামিট পাওয়ার ইন্টারন্যাশনালের হাতে। ফলে সামিট করপোরেশনের উপার্জিত আয়ের সিংহভাগ অর্থই শেষ পর্যন্ত সিঙ্গাপুরে অবস্থিত সামিট পাওয়ার ইন্টারন্যাশনালে সরাসরি স্থানান্তরিত হয়। অর্থাৎ, কাঠামোগতভাবে সামিট পাওয়ারের অর্জিত আয় সামিট করপোরেশনের মাধ্যমে শেষমেশ সিঙ্গাপুরের সামিট পাওয়ার ইন্টারন্যাশনালে চলে যায়। আর এই বিশাল অঙ্কের লভ্যাংশ ও অর্থ স্থানান্তরের সময় সামিট পাওয়ার থেকে সামিট করপোরেশনে অর্থ পরিশোধের ক্ষেত্রে বড় আকারের উৎসে কর ফাঁকি দেওয়া হয়েছে বলে এনবিআরের অনুসন্ধানে ধরা পড়েছে।


এনবিআরের দাপ্তরিক নথির তথ্যমতে, আয়কর আইনের ১৪৩(৫) ধারার বিধান অনুযায়ী, একটি কোম্পানি অন্য কোনো কোম্পানিকে ডিভিডেন্ড বা লভ্যাংশ হিসেবে অর্থ দিলে সেখান থেকে ২০ শতাংশ হারে উৎসে কর কেটে রাখা বাধ্যতামূলক। লভ্যাংশ হস্তান্তরের সময় সংশ্লিষ্ট প্রদানকারী কোম্পানিকেই এই কর কেটে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হয়। কিন্তু সামিট পাওয়ার কর্তৃপক্ষের দাবি, বিদ্যুৎ খাতের বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কোম্পানির উপার্জিত আয় শতভাগ করমুক্ত। তাই লভ্যাংশ হস্তান্তরের ক্ষেত্রেও উৎসে করের এই বাধ্যবাধকতা তাদের ওপর প্রযোজ্য হতে পারে না। এনবিআরের প্রাথমিক দাবির ওপর আপত্তি তুলে গত বছর উচ্চ আদালতে রিট দায়ের করে সামিট। সাধারণত এ ধরনের কর সংক্রান্ত বিরোধ সিভিল বা দেওয়ানি মামলা হিসেবে বছরের পর বছর ধরে নিষ্পত্তি করে থাকে এনবিআর। কিন্তু গত জুলাই অভ্যুত্থানের পর নতুনভাবে আয়কর আইনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা হয়, যেখানে নথি জালিয়াতি বা মিথ্যা ভুল তথ্য দিয়ে কর ফাঁকি দেওয়ার প্রমাণ মিললে সরাসরি ফৌজদারি মামলা দায়েরের সুযোগ যুক্ত করা হয়।


আইনের নতুন এই ধারার ওপর ভিত্তি করে এবার সামিটের শীর্ষ সাত পরিচালকের বিরুদ্ধে সরাসরি ফৌজদারি মামলা দায়েরের প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে এনবিআর। অভিযুক্ত সাত পরিচালক হলেন—মোহাম্মদ আজিজ খান, আঞ্জুমান আজিজ খান, আদিবা আজিজ খান, মোহাম্মদ ফয়সাল করিম খান, মোহাম্মদ লতিফ খান, মোহাম্মদ ফরিদ খান এবং জাফর উমেদ খান।


এই বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে সামিট করপোরেশনের জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মোহসেনা হাসান জানিয়েছেন, সামিট গ্রুপ সবসময় দেশের প্রচলিত আইন ও বিধি মেনে সঠিক নিয়মে রাজস্ব পরিশোধ করে আসছে। তাদের করপোরেট স্বচ্ছতা ও আর্থিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে কেপিএমজি ও বেকার টিলির মতো খ্যাতনামা আন্তর্জাতিক অডিট প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত রাখা হয়েছে। তারা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক আইন মেনেই ব্যবসা পরিচালনা করছেন। বর্তমানে বিষয়টি আদালতে বিচারধীন থাকায় এর বেশি কিছু বলা সম্ভব নয়।


এনবিআর ও কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি) সূত্রে জানা যায়, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশের বড় ১০টি শিল্প গ্রুপের আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অনুসন্ধান শুরু হয়। এর অংশ হিসেবে সামিট পাওয়ার ও তাদের পরিচালনা পর্ষদের অনিয়ম অনুসন্ধানে নামে সিআইসি। পূর্বে ২০২৩ সালেও এনবিআরের কর অঞ্চল-১ থেকে সামিট পাওয়ারের ডিভিডেন্ডের ওপর ২০ শতাংশ উৎসে করের বিষয়টি তোলা হলেও তৎকালীন ব্যাখ্যার কারণে তা এগোয়নি। কিন্তু সম্প্রতি তদন্ত পুনঃউন্মোচন করে এনবিআর স্পষ্ট জানিয়েছে, এই ডিভিডেন্ডের ওপর ২০ শতাংশ উৎসে কর সম্পূর্ণরূপে প্রযোজ্য।


এনবিআরের পেশ করা নথিতে দেখা যায়, ডিভিডেন্ড সংক্রান্ত উৎসে কর ফাঁকির পরিমাণ ৯৬৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে সামিট পাওয়ার লিমিটেড ৭ বছরে ৩৮৭ কোটি ৬০ লাখ, সামিট গাজীপুর-২ লিমিটেড ১৭৬ কোটি ৫৭ লাখ, সামিট বরিশাল পাওয়ার ৫৬ কোটি ২৬ লাখ, সামিট মেঘনাঘাট পাওয়ার ৯২ কোটি ৮০ লাখ, সামিট নারায়ণগঞ্জ পাওয়ার ইউনিট-২ ২০ কোটি ৯ লাখ, সামিট এলএনজি টার্মিনাল ১০০ কোটি ৬০ লাখ এবং সামিট বিবিয়ানা পাওয়ার ১২৯ কোটি ৮৯ লাখ টাকা ফাঁকি দিয়েছে। এছাড়া আয়ের তথ্য গোপনের অভিযোগে আলাদা তিনটি নথিতে সামিট মেঘনাঘাট, বিবিয়ানা ও বরিশাল পাওয়ারের আরও ১ হাজার ১৯ কোটি ৬৯ লাখ টাকার রাজস্ব ফাঁকি ধরা পড়েছে। সব মিলিয়ে ফাঁকির মোট অঙ্ক দুই হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এসব দাবির মুখে সামিট উচ্চ আদালতে ২০টি রিট করলেও তা এখনো অমীমাংসিত রয়েছে।


এ সম্পর্কিত আরো খবর