সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম ছয় মাসে দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক চিত্রে এক গভীর বৈপরীত্য ও উদ্বেগজনক পরিস্থিতি ফুটে উঠেছে। অর্থনীতির ৩১টি প্রধান সূচকের মধ্যে প্রবাসী আয় ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভসহ ১২টি খাতে কিছু অগ্রগতি হলেও, মূল্যস্ফীতি, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানসহ বাকি ১৯টি গুরুত্বপূর্ণ সূচকে বড় ধরনের অবনতি ঘটে গেছে। সবচেয়ে সংকটাপন্ন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে দেশের শিল্প খাতে; চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট মাসের মধ্যে দেশের প্রধান তিনটি শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি শিল্প-কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে সরাসরি কাজ হারিয়েছেন ৬১ হাজার ৮৮১ জন সাধারণ শ্রমিক।
রাজধানীর ধানমন্ডিতে অবস্থিত সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)-এর কার্যালয়ে আয়োজিত ‘সরকারের ছয় মাস: একটি অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক মিডিয়া সংলাপে এই চিত্র তুলে ধরা হয়। সংস্থাটির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য অর্থনৈতিক মূল্যায়নের বিষদ তথ্য ও বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেন। সংবাদ সংলাপে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান এবং অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান উপস্থিত ছিলেন। ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য জানান, নতুন সরকারের কাছ থেকে দেশের মানুষের দুটি প্রধান দাবি ও প্রত্যাশা ছিল—প্রথমটি ভাঙন ধরে যাওয়া অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে এবং দ্বিতীয়টি সমাজে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু ছয় মাসের সার্বিক পর্যালোচনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই দুটি মৌলিক চাহিদার একটিতেও লক্ষণীয় সাফল্য আসেনি, বরং নানা খাতে স্পষ্ট অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।
পর্যালোচনায় জানানো হয়, পূর্ববর্তী আমল থেকে বর্তমান সরকার এক ভঙ্গুর ও টালমাটাল অর্থনীতি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিল। ব্যাংকিং খাতের বিপুল অনাদায়ী ঋণ, অর্থ পাচার, তীব্র টাকার সংকট ও বড় মাপের রাজস্ব ঘাটতি সামলে ওঠা সরকারের জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। কিন্তু এসব পরিস্থিতি সামলানোর প্রক্রিয়ায় আশানুরূপ গতি দেখা যাচ্ছে না। এছাড়া সমাজে মব কালচার বন্ধ, মেধার ভিত্তিতে উচ্চপদে পদায়ন নিশ্চিত করা, সিন্ডিকেট দমন এবং নারী, শিশু ও সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা প্রতিরোধে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির বাস্তবায়ন বাস্তবে দৃশ্যমান হয়নি। সরকার কোনো সুনির্দিষ্ট শ্বেতপত্র বা সমন্বিত তথ্যভিত্তিক দলিল প্রকাশ না করায় বর্তমান অর্থনৈতিক অগ্রগতি বা পদক্ষেপগুলো সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা জটিল হয়ে পড়েছে।
এদিকে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের গতি থমকে যাওয়াকে অর্থনীতির জন্য সবচাইতে বড় সংকেত হিসেবে চিহ্নিত করেছে সিপিডি। তথ্যানুসারে, মে থেকে জুনের মধ্যে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির হার এবং বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। শিল্প প্রবৃদ্ধির এই ঋণাত্মক পরিস্থিতির মধ্যে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সাময়িক বাড়লেও ড. দেবপ্রিয় প্রশ্ন তোলেন, বিনিয়োগ না হওয়ায় মূলধনি যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানি বন্ধ রয়েছে, যার কারণেই কেবল রিজার্ভ বাড়ছে। এটি সুস্থ অর্থনৈতিক স্বাস্থ্যের লক্ষণ নয়, বরং এটি এক ধরনের রক্তশূন্যতার বহিঃপ্রকাশ। গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া ও নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদী শিল্পাঞ্চলের কারখানা বন্ধের তথ্য তুলে ধরে বলা হয়, বর্তমান অর্থবছরে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার উচ্চ লক্ষ্যমাত্রার রাজস্ব আদায় করা বর্তমান বাস্তবতায় চরম কঠিন হতে চলেছে।
সরকারের প্রশাসনিক কাঠামো সম্পর্কে ড. দেবপ্রিয় মন্তব্য করেন, উপদেষ্টা ও মন্ত্রীদের সমন্বয়ে গঠিত এই সরকারকে ‘আড়াই-তলা সরকার’ হিসেবে অভিহিত করা যায়, যেখানে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ধীরগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সরকারের প্রশাসনিক জনপ্রিয়তার চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা বেশি, যা রাজনৈতিক কঠোর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ব্যবস্থার সুযোগ তৈরি করে। তবে সরকারি কর্মচারীদের বহুল আলোচিত বেতন কাঠামো ও মহার্ঘ ভাতার বিষয়ে দ্রুত ও স্পষ্ট সিদ্ধান্ত না নিলে কিংবা বিষয়টিকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ঝুলিয়ে রাখলে ভবিষ্যতে আর্থিক ও রাজনৈতিক সংকট আরও জটিল ও ঘনীভূত হবে বলে তিনি হুশিয়ারি প্রদান করেন।