ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬,  ১০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
যুক্তরাষ্ট্রের হুমকিতে ইরানের হুঁশিয়ারি, এক ফোঁটা তেলও নয় মঙ্গলবার রাজধানীর যেসব মার্কেট ও দোকানপাট বন্ধ ডিএনএ পরীক্ষায় মিলল পিতৃত্বের প্রমাণ, ফেঁসে গেলেন মাদরাসা শিক্ষক সাগর ছয় মাসে বন্ধ ৯৫ কারখানা, কর্মসংস্থান হারিয়েছেন প্রায় ৬২ হাজার শ্রমিক: সিপিডি রাজধানীতে ৫ হাজারের বেশি ইয়াবাসহ পল্লবী থানার এএসআই গ্রেপ্তার আলোচিত শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় হাইকোর্টের রায় আজ . ৯ জেলায় ঝোড়ো হাওয়াসহ বজ্রবৃষ্টির আভাস হাইতিতে রাতভর সশস্ত্র গ্যাংয়ের তাণ্ডব: নিহত অন্তত ৪৭ হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কড়াকড়ি: ৪৫ জাহাজের পণ্য জব্দের হুঁশিয়ারি ইরানকে একঘরে করতে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করল যুক্তরাষ্ট্র

হাইতিতে রাতভর সশস্ত্র গ্যাংয়ের তাণ্ডব: নিহত অন্তত ৪৭


  • আপলোড সময় : মঙ্গলবার ২৫ আগস্ট, ২০২৬ সময় : ৯:২২ এএম

ক্যারিবিয়ান অঞ্চলের সংকটকবলিত দেশ হাইতির রাজধানী পোর্ট-অ-প্রিন্সে রাতভর সশস্ত্র গ্যাংয়ের তাণ্ডবে অন্তত ৪৭ জন নিহত হয়েছেন। নির্মম এই রক্তক্ষয়ী হামলায় গুরুতর আহত হয়েছেন আরও অন্তত ২২ জন। রাজধানীর প্রবেশপথের অত্যন্ত কৌশলগত এলাকা কেন্সকফে এই নৃশংস সহিংসতার ঘটনাটি ঘটে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, স্থানীয় সময় সোমবার আন্তর্জাতিক সংস্থা জাতিসংঘের ইন্টিগ্রেটেড অফিস এই হতাহতের তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছে। তবে উদ্ধারকাজ অব্যাহত থাকায় এবং এলাকাটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় হতাহতের সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

হাইতির রাজধানী পোর্ট-অ-প্রিন্সে প্রবেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ সড়কের কাছে অবস্থিত পাহাড়ি এলাকা কেন্সকফ। গত বছরের পর থেকে শক্তিশালী সশস্ত্র গ্যাংগুলো এলাকাটিতে দখল বিস্তার করতে এক ডজনেরও বেশি ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে। এসব রক্তক্ষয়ী সহিংসতার কারণে ইতোমধ্যে হাজার হাজার সাধারণ মানুষ নিজেদের ভিটেমাটি ও ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। হাইতির মানবাধিকার সংস্থা আরএনডিডিএইচ এর তথ্য অনুযায়ী, রোববার রাত সাড়ে ১০টার দিকে অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত গ্যাং সদস্যরা কেন্সকফ এলাকায় অতর্কিত এই হামলা শুরু করে। তারা কেবল সাধারণ মানুষকে লক্ষ্য করে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হত্যাই করেনি, বরং বহু বসতবাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। এমনকি খ্যাতনামা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ জ্যঁ উইলিয়াম পাপের বাসভবনেও অগ্নিসংযোগ করে পুড়িয়ে দেওয়া হয়।

বহু বছর ধরে কয়েকটি বড় জোটের অধীনে থাকা এসব শক্তিশালী গ্যাং পোর্ট-অ-প্রিন্সের ওপর নিজেদের একছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই অপরাধী দলগুলো রাজধানীর সীমানা ছাড়িয়ে আশপাশের শান্ত এলাকাগুলোতেও তাদের অপরাধের নেটওয়ার্ক ছড়িয়ে দিচ্ছে। দেশটির ভঙ্গুর ও দুর্বল পুলিশ বাহিনীকে শক্তিশালী করতে আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে বারবার চেষ্টা চালানো হলেও বাস্তব পরিস্থিতির কোনো দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি। দফায় দফায় গ্যাং হামলার পরও পুলিশ প্রশাসন নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছেন স্থানীয় অধিবাসীরা। তাদের অভিযোগ, কেন্সকফ এলাকায় থানা থেকে মাত্র কয়েক মিনিটের দূরত্বে অবস্থান করে সশস্ত্র দুর্বৃত্তরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা মানুষকে হত্যা করেছে, কিন্তু পুলিশ তাদের রক্ষায় এগিয়ে আসেনি। এই চরম চরম ব্যর্থতার দায় নিয়ে কেন্সকফের স্থানীয় বাসিন্দারা অবিলম্বে ওই এলাকার পুলিশপ্রধানের পদত্যাগের জোর দাবি জানিয়েছেন।

ভয়াবহ এই ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে হাইতি সরকারের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, এই হামলাকে সরকার ‘জঘন্য’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছে। কোনো অবস্থাতেই কেন্সকফকে সন্ত্রাসীদের হাতে পরিত্যক্ত অবস্থায় ছেড়ে দেওয়া হবে না। কোনো ধরনের শিথিলতা বা বিলম্ব ছাড়াই কেন্সকফ ও তৎসংলগ্ন এলাকাগুলোতে সরকারি কর্তৃত্ব ও আইনি শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হবে। এরপর দিনের বেলা ঘটনা পরিদর্শনে যান দেশটির জাতীয় পুলিশপ্রধান ভ্লাদিমির প্যারাজন। সেখানে উপস্থিত হয়ে তিনি স্থানীয় সাংবাদিকদের বলেন, পুলিশ বাহিনী কখনোই সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে হাল ছেড়ে দেয়নি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় তাদের কাজ অব্যাহত রয়েছে।

এর আগে ২০২৫ সালের শুরুর দিকে টানা দুই মাস ধরে কেন্সকফে হামলা ও তাণ্ডব চালিয়েছিল গ্যাং সদস্যরা। সেই সহিংসতায় ২৬০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হন এবং অন্তত ২০০টি বাসগৃহ সম্পূর্ণ ধ্বংস ও জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল। জাতিসংঘের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সে সময় প্রায় ৩ হাজার মানুষ এলাকা ছেড়ে প্রাণ বাঁচাতে আত্মগোপনে চলে যেতে বাধ্য হন। এরপরও এলাকাটিতে বারবার আক্রমণ চালানো হয়েছে, যেখানে হত্যা, গণধর্ষণ, অপহরণ, অগ্নসংযোগ ও গবাদিপশু চুরির মতো জঘন্য ঘটনা প্রতিদিনের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। নিহত স্বজনের মরদেহের পাশে দাঁড়িয়ে কান্নাভেজা কণ্ঠে সাধারণ মানুষ আক্ষেপ করে বলছেন, সরকার ও প্রশাসনের চরম উদাসীনতার কারণেই আজকে হাজার হাজার পরিবার এই অবর্ণনীয় কষ্টের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।

এই ক্রমবর্ধমান সহিংসতা আগামী ডিসেম্বরে হাইতিতে নির্ধারিত নির্বাচন আয়োজনের সক্ষমতা নিয়ে পুরো বিশ্বমঞ্চে নতুন করে বড় ধরনের সংশয় ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। দীর্ঘ এক দশকের মধ্যে এই প্রথম দেশটিতে সাধারণ নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। তবে সশস্ত্র অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর ক্রমবর্ধমান নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাবের কারণে অতীতে পরপর কয়েকটি সরকার নির্বাচন স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছিল। পরিস্থিতি সামাল দিতে জাতিসংঘের সমর্থনে গঠিত আন্তর্জাতিক গ্যাং দমন বাহিনীকে হাইতি পুলিশকে সহযোগিতার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। চলতি বছরেই এই যৌথ বাহিনীর সদস্যসংখ্যা ৫ হাজার ৫০০ জনে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে, তবে কেন্সকফের এই সাম্প্রতিক জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সেখানে বাড়তি সেনা বা পুলিশ পাঠানো হয়েছে কি না, তা এখনও অস্পষ্ট।

উল্লেখ্য, ঐতিহাসিক পটভূমিতে ১৮০৪ সালে লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের প্রথম স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল হাইতি। প্রথমে স্পেনীয় ও পরবর্তীতে ফ্রান্সের উপনিবেশ হিসেবে দীর্ঘ সময় শোষিত হওয়ার পর ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসক শক্তিকে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে উৎখাত করে বিশ্বে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নেতৃত্বাধীন স্বাধীন সরকার গঠন করে হাইতির জনগণ। কিন্তু স্বাধীন হলেও বিগত দুই শতাব্দী ধরে দেশটি কোনো দিনই স্থায়ী স্থিতিশীলতা দেখেনি; বরং ক্রমাগত রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামরিক অভ্যুত্থান, বাহ্যিক আগ্রাসন ও নিষ্ঠুর পরিবারতান্ত্রিক দুভেলিয়ারদের স্বৈরতান্ত্রিক কর্তৃত্ববাদী শাসনের শিকার হয়ে আজ এক চরম অরাজকতার দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে।


এ সম্পর্কিত আরো খবর