আন্তর্জাতিক ডেস্ক
দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলার সঙ্গে ‘বিশ্ব ইতিহাসের বৃহত্তম তেল চুক্তি’ সম্পাদনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক বার্তায় বহুল আলোচিত ও ঐতিহাসিক এই চুক্তির বিস্তারিত তথ্য নিশ্চিত করেছেন তিনি।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ভেনেজুয়েলার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র একটি সর্বাত্মক ও সমন্বিত চুক্তিতে উপনীত হয়েছে। এই চুক্তির মূল লক্ষ্য হলো বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল সমৃদ্ধ দেশ ভেনেজুয়েলার ভূগর্ভে থাকা বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেলের বিশাল মজুতে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি প্রবেশাধিকার ও বাণিজ্যিক কর্তৃত্ব তৈরি করা। এই পদক্ষেপের ফলে ভেনেজুয়েলার ভঙ্গুর তেল খাতে মার্কিন ও আন্তর্জাতিক বিনোযোগের এক বিশাল ও অভূতপূর্ব দিগন্ত উন্মোচিত হতে যাচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সেই বার্তায় ট্রাম্প আরও উল্লেখ করেন যে, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ অত্যন্ত নিবিড় কূটনৈতিক আলোচনা ও দীর্ঘ মধ্যস্থতার মাধ্যমে ঐতিহাসিক এই চুক্তির শর্তাবলি চূড়ান্ত করেছেন। ট্রাম্প উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে লিখেছেন, “যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার সঙ্গে বিশ্বের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় তেল চুক্তিতে প্রবেশ করেছে।”
চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই ভেনেজুয়েলা সরকারের পক্ষ থেকে প্রকাশিত এক সরকারি বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, ঐতিহাসিক এই চুক্তির প্রত্যক্ষ আওতায় দেশটির কৌশলগত ১৭টি প্রধান তেলক্ষেত্রের সামগ্রিক আধুনিকায়ন ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন ঘটানো হবে। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এই ১৭টি চিহ্নিত তেলক্ষেত্রে প্রমাণিতভাবে প্রায় ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল গচ্ছিত রয়েছে। চুক্তির পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ প্রভাবে ভেনেজুয়েলার তেল খাতে প্রায় ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণ নতুন বেসরকারি বিনিয়োগ আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে এই বিপুল বিনিয়োগ থেকে ভেনেজুয়েলা সরকারের রাজস্ব হিসেবে ২০৯ বিলিয়ন ডলারের চেয়েও বেশি বিপুল অংকের কর আদায় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ভেনেজুয়েলার ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টেলিগ্রাম অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক বিশেষ বার্তায় আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত এই মেগা চুক্তি ভেনেজুয়েলার মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে অত্যন্ত গতিশীল ও যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করবে।
এই চুক্তি প্রণয়নের প্রক্রিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত এক উচ্চপদস্থ মার্কিন প্রশাসনিক কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন যে, চুক্তির বিধান অনুযায়ী ভেনেজুয়েলায় একটি নতুন যৌথ কোম্পানি গঠনের পূর্ণ আইনি সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। একটি নির্ভরযোগ্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে গঠিত এই নতুন সত্তাটি ভেনেজুয়েলার স্থবির হয়ে পড়া তেলক্ষেত্রগুলোর মজুত ও উৎপাদন সক্ষমতা আধুনিকায়নের দায়িত্বভার গ্রহণ করবে। রদ্রিগেজের নেতৃত্বাধীন সরকার ওই নতুন বহুজাতিক কোম্পানিকে নির্দিষ্ট তেলক্ষেত্রগুলোর উন্নয়ন ও উত্তোলনের জন্য দীর্ঘ ১০০ বছরের একচ্ছত্র বাণিজ্যিক অধিকার ও সনদ প্রদান করেছে।
চুক্তির মূল আর্থিক ও মালিকানা শর্তাবলি বিশ্লেষণ করে মার্কিন কর্মকর্তা দাবি করেছেন, নতুন যৌথ কোম্পানির কার্যকর মোট তেল উৎপাদনের সিংহভাগ অর্থাৎ ৫৫ শতাংশের ওপর থাকবে সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি। এই নিয়ন্ত্রণের মধ্যে কেবল সাধারণ মালিকানার অংশীদারত্বই থাকছে না, বরং অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট উৎপাদন খরচে তেল ক্রয়ের বিশেষ অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্যিক অধিকারও রাখা হয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের অনুমান, চুক্তি বাস্তবায়িত হলে এই যৌথ কোম্পানিটি সৌদি আরবের সুবিখ্যাত রাষ্ট্রায়ত্ত তেল প্রতিষ্ঠান সৌদি আরামকোর পরেই বিশ্বজুড়ে প্রমাণিত তেল মজুতের দ্বিতীয় বৃহত্তম করপোরেট ও বাণিজ্যিক মালিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।
ঐতিহাসিক এই কূটনৈতিক চুক্তিটি এমন এক সময়ে সম্পন্ন হলো যখন অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি ও সাধারণ তেলের মূল্য স্মরণকালের মধ্যে সর্বনিম্নে নামিয়ে আনার জন্য ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে ইরান ও তার সংশ্লিষ্ট সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রুট হরমুজ প্রণালি দিয়ে খনিজ তেল পরিবহন অভাবনীয়ভাবে থমকে গেছে। উল্লেখ্য, এই সংঘাত তীব্র হওয়ার পূর্বে বিশ্বজুড়ে ব্যবহৃত মোট পেট্রোলিয়ামের প্রায় ২০ শতাংশ এককভাবে এই আন্তর্জাতিক নৌপথ দিয়েই পরিবহন করা হতো। তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন পেট্রোলের গড় খুচরা মূল্য গিয়ে ঠেকেছিল প্রায় ৪ দশমিক ০৯ ডলারে, যা ঠিক এক বছর আগের একই সময়সীমার ৩ দশমিক ২১ ডলারের চেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেশি।
তবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে জানিয়েছেন যে, এই ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেই যুক্তরাষ্ট্রে খুব দ্রুত বা তাৎক্ষণিকভাবে জ্বালানি তেলের দাম কমে যাবে—এমনটা ভাবা সঠিক হবে না। বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক অবহেলা ও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে ভেনেজুয়েলার তেল ক্ষেত্রের বেশিরভাগ যন্ত্রপাতি ও অবকাঠামো জরাজীর্ণ ও ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। দেশটির তেল উৎপাদন পুনরায় আগের মতো বিপুল পরিমাণে বাড়াতে হলে পুরোনো এই পরিকাঠামো বহুমাত্রিকভাবে সংস্কার ও সম্প্রসারণ করা আবশ্যক। এর জন্য অন্তত কয়েক বছর সময় এবং শত শত বিলিয়ন ডলারের সুদীর্ঘ বিনিয়োগ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
উল্লেখ্য, সারাবিশ্বের মধ্যে ভূগর্ভস্থ তেলের সবচেয়ে বড় ও সমৃদ্ধ মজুত রয়েছে লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলায়। মার্কিন এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের আনুষ্ঠানিক উপাত্ত অনুযায়ী, ভেনেজুয়েলার ভূগর্ভে আনুমানিক ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল গচ্ছিত রয়েছে, যা সমগ্র বিশ্বের প্রমাণিত তেল সম্পদের প্রায় ১৭ শতাংশ। কিন্তু অতিমাত্রায় দুর্বল প্রযুক্তি, প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম ও জরাজীর্ণ অবকাঠামোর কারণে বিশ্বজুড়ে মোট তেল উত্তোলনে দেশটির বর্তমান অবদান নেমে এসেছে মাত্র ১ শতাংশে।
চুক্তির কৌশলগত দিক তুলে ধরে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে উল্লেখ করেছেন, এটি ভেনেজুয়েলা এবং যুক্তরাষ্ট্র—উভয় দেশের সাধারণ মানুষের জন্যই এক অবিস্মরণীয় ঐতিহাসিক অর্জন। ভেনেজুয়েলার জনগণের জন্য এই চুক্তি অন্তত ১০০ বিলিয়ন ডলারের রেকর্ড পরিমাণের বেসরকারি বিনিয়োগ নিশ্চিত করবে, হাজার হাজার উচ্চ বেতনের নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করবে এবং দেশটির ঝিমিয়ে পড়া অর্থনীতিকে সচল করতে মূল চালিকাশক্তি বা ড্রাইভিং ফোর্স হিসেবে কাজ করবে।
(সূত্র: এনডিটিভি, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস)