বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) যাত্রাসূচনা হয়েছিল ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাত ধরে। দেখতে দেখতে ঐতিহ্যবাহী এই রাজনৈতিক দলটি প্রতিষ্ঠার ৪৮ বছর পূর্ণ করল। দীর্ঘ এই রাজনৈতিক পথপরিক্রমায় দলটি কখনো রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন ছিল, আবার কখনো রাজপথের প্রধান বিরোধী দলের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। দলটির নেতৃত্ব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শুরুর দিনে জিয়াউর রহমান, পরবর্তীতে তার সহধর্মিণী খালেদা জিয়া এবং বর্তমানে তাদের সুসন্তান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই বিশাল সংগঠনের হাল ধরেছেন।
তারেক রহমানের শক্তিশালী রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও নেতৃত্বে এবারই প্রথমবারের মতো বিএনপি নির্বাচনে বিপুল সাফল্য অর্জন করেছে। দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে দলটি। তবে দীর্ঘ সময় বিরোধী দলের ভূমিকায় থাকার পর পুনরায় ক্ষমতার কেন্দ্রে ফিরে আসায় বিএনপির সামনে সৃষ্টি হয়েছে বহুমুখী নতুন পরীক্ষা। একদিকে রাষ্ট্র পরিচালনা ও বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন, অন্যদিকে সংগঠনকে সুশৃঙ্খল রাখা ও জনগণের অর্জিত আস্থা অক্ষুণ্ন রাখার গুরুদায়িত্ব এখন তাদের কাঁধে।
বিএনপির রাজনীতির প্রথম পর্ব সূচিত হয় জিয়াউর রহমানের মাধ্যমে। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, পূর্ণাঙ্গ গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও আত্মনির্ভরশীলতার মূল চেতনাকে পাথেয় করে দলটির ১৯ দফা কর্মসূচি ঘোষিত হয়েছিল। তৎকালীন সময়ে সমাজের বিভিন্ন রাজনৈতিক মত ও চিন্তাধারার মানুষকে একক প্ল্যাটফর্মে ঐক্যবদ্ধ করার এক অভূতপূর্ব রাজনীতি শুরু করেন জিয়াউর রহমান। এর ফলে অত্যন্ত অল্প সময়ের ব্যবধানে বিএনপি দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। কিন্তু ১৯৮১ সালের ৩০ মে জিয়াউর রহমান নির্মমভাবে নিহত হলে দলটি এক গভীর ও অভূতপূর্ব নেতৃত্ব সংকটের মুখে পতিত হয়। সেই সংকটময় মুহূর্তে রাজনীতিতে অনভিজ্ঞ ‘গৃহবধূ’ খালেদা জিয়া দলের হাল ধরতে এগিয়ে আসেন।
১৯৮২ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগ দিয়ে খালেদা জিয়া তার রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন। ১৯৮৩ সালে তিনি দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান এবং ১৯৮৪ সালের ১০ মে কাউন্সিলে সর্বসম্মতিক্রমে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। সেই থেকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত দীর্ঘ ৪২ বছর তিনি এই পদে থেকে দল পরিচালনা করেছেন। তার বলিষ্ঠ ও আপসহীন নেতৃত্বে এরশাদবিরোধী স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এক অভূতপূর্ব গতি পায়, যা বিএনপিকে জনমানুষের আস্থাভাজন রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করে।
১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে বিএনপি যখন সরকার গঠন করে, তখন খালেদা জিয়া দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। চেয়ারপারসনের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি মোট তিনবার দেশের প্রধানমন্ত্রীর পদ আলোকময় করেছেন। তার মাধ্যমে জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত দলটি দীর্ঘ সংগ্রাম, সুষ্ঠু নির্বাচন ও রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যাপক অভিজ্ঞতা লাভ করে। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি ছিলেন বিএনপির সকল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র।
বিএনপির রাজনীতির তৃতীয় অধ্যায় ও তারেক রহমানের উত্থান অত্যন্ত ঘটনাবহুল। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের উত্তাল সময়ে তারেক রহমান রাজপথে নামেন। ১৯৮৮ সালে বগুড়ার গাবতলী উপজেলা ইউনিটে একজন সাধারণ সদস্য হিসেবে তার আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক পথচলা শুরু হয়। ১৯৯১ সালের নির্বাচনের আগে বেগম খালেদা জিয়ার সাথে তিনি টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া চষে বেড়ান এবং তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সংগঠিত করেন। পরবর্তীতে ১৯৯৩ সালে বগুড়া জেলা ইউনিটে তিনি এক ঐতিহাসিক সম্মেলনের আয়োজন করেন, যেখানে গোপন ব্যালটের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নেতৃত্ব নির্বাচন করা হয়। বগুড়ার এই সফল মডেলের পর তিনি সারাদেশের অন্যান্য জেলা ইউনিটগুলোতেও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নেতা নির্বাচনের চর্চা ত্বরান্বিত করেন।
২০০২ সালে বিএনপির স্থায়ী কমিটি তাকে সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে মনোনীত করে। ২০০৫ সালে তিনি সারাদেশে মাঠপর্যায়ে তৃণমূল সম্মেলন আয়োজন করেন এবং দেশের প্রতিটি উপজেলার নেতাকর্মীদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময় করেন। ২০০৭ সালে ওয়ান-ইলেভেনের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে তিনি গ্রেপ্তার হন এবং পরবর্তীতে চিকিৎসা নিতে বিদেশে নির্বাসিত হতে বাধ্য হন। দীর্ঘ ১৭ বছর পর ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর তিনি দেশে ফিরে আসেন। এর আগে ২০০৯ সালে তিনি দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান এবং ২০১৮ সালে খালেদা জিয়া কারারুদ্ধ হলে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দক্ষতার সাথে পালন করেন।
২০২৬ সালে খালেদা জিয়ার প্রয়াণে দলের চেয়ারপারসনের পদ খালি হলে স্থায়ী কমিটির সিদ্ধান্তক্রমে তারেক রহমান চেয়ারম্যান পদে আসীন হন। এর মাধ্যমেই জিয়া পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের নেতৃত্ব বিএনপির সর্বোচ্চ পদে প্রতিষ্ঠিত হয়। সার্বিকভাবে বিএনপির ৪৮ বছরের ইতিহাসকে তিনটি পর্বে ভাগ করা যায়— প্রথমত জিয়াউর রহমানের হাত ধরে ভিত্তি স্থাপন, দ্বিতীয়ত খালেদা জিয়ার সুদৃঢ় নেতৃত্বে গণমানুষের ও নির্বাচনী শক্তিতে রূপান্তর এবং তৃতীয়ত তারেক রহমানের অভিজ্ঞ নেতৃত্বে দীর্ঘ বিরোধী রাজনীতি পেরিয়ে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় সফলভাবে দল পরিচালনা।
তবে ক্ষমতায় আসার পর তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত বিএনপির সামনে বেশ কিছু নতুন ও জটিল চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সরকার ও দলের মধ্যে সঠিক ভারসাম্য রক্ষা করা। বিরোধী দলে থাকার সময়কার রাজপথের কৌশল আর সরকার পরিচালনার প্রশাসনিক নীতি কখনোই এক নয়। সরকারের সিদ্ধান্তের ভালো-মন্দ প্রভাব যেমন রাজনীতির ওপর পড়ে, তেমনি নেতাকর্মীদের নেতিবাচক কর্মকাণ্ডও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে পারে। স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব খাটানো বা ক্ষমতার অপব্যবহারের মতো প্রবণতা তৈরি হলে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা কমে যেতে পারে। তাই প্রশাসন থেকে দলকে পৃথক রেখে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখাই তারেক রহমানের প্রধানতম পরীক্ষা।
দ্বিতীয় বড় চ্যালেঞ্জ হলো তৃণমূলে উপদলীয় কোন্দল বা গ্রুপিং নিয়ন্ত্রণ। দীর্ঘদিন পর ক্ষমতায় আসায় পদ-পদবি, মনোনয়ন ও সুযোগ-সুবিধার জন্য নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হতে পারে। একই অঞ্চলে একাধিক নেতা নিজস্ব বলয় তৈরি করলে অভ্যন্তরীণ বিভক্তি বৃদ্ধি পাবে, যা স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এ কারণে যোগ্য ও দক্ষ নেতাদের মূল্যায়নের পাশাপাশি গ্রুপিং শক্ত হাতে দমন করা অত্যন্ত জরুরি।
তৃতীয়ত, বয়োজ্যেষ্ঠ ও তরুণ নেতৃত্বের মধ্য অনুকরণীয় সমন্বয় সাধন করা। আন্দোলন-সংগ্রামের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা সম্পন্ন প্রবীণ নেতাদের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের প্রগতিশীল কর্মীরা এখন দলের প্রধান চালিকাশক্তি। ফলে প্রবীণদের অভিজ্ঞতা ও নবীনদের আধুনিক চিন্তা-ভাবনার সঠিক মিলনে দলীয় আদর্শ বজায় রেখে সংগঠনকে এগিয়ে নেওয়াই এখন বড় কৌশল।
চতুর্থত, দলীয় শৃঙ্খলা ও শতভাগ জবাবদিহি নিশ্চিত করা। ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় নেতাকর্মীদের ক্ষমতার অপব্যবহার বা অনিয়ম পুরো দলের অর্জনকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে। তাই কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত অনুশাসন প্রয়োগ, অপরাধের দ্রুত তদন্ত ও সাংগঠনিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা বিএনপির বজায় রাখতে হবে।
পঞ্চমত, রাষ্ট্র পুনর্গঠন ও জনসম্পৃক্ততা ধরে রাখা। বিএনপির মতে, দলটির অন্যতম লক্ষ্য হলো ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনৈতিক খাত, ব্যাংকব্যবস্থা, প্রশাসনিক অবকাঠামো, বিচারবিভাগ ও সংস্কৃতিকে স্বাধীন ও জনবান্ধব হিসেবে গড়ে তোলা। কিন্তু এসব প্রশাসনিক পুনর্গঠনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের সমস্যা যেমন— নিত্যপণ্যের দাম, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার মতো মৌলিক বিষয়ে তাৎক্ষণিক ফল দেওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন। প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হলে জনপ্রিয়তা হ্রাসের ঝুঁকি থেকে যায়।
বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী তাই কেবল অতীত স্মৃতিচারণের মাধ্যম নয়, বরং নতুন অধ্যায়ের সূচনা। জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সুদৃঢ় রাজনৈতিক ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে দলটি যে নতুন যাত্রা শুরু করল, সেখানে মূল মূল্যায়ন হবে— দলকে সম্পূর্ণ সুশৃঙ্খল রেখে তিনি কীভাবে একটি জনকল্যাণমুখী, আধুনিক ও জবাবদিহিমূলক সরকার পরিচালনা করতে পারেন।