‘ইউজড স্পেয়ার পার্টস’ বা পুরোনো যন্ত্রাংশ ঘোষণার আড়ালে জাপান থেকে আমদানিকৃত প্রায় ১২ কোটি টাকা মূল্যের বিলাসবহুল গাড়ি ও যন্ত্রাংশ নিলাম প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চতুরতার সঙ্গে খালাসের অপচেষ্টা প্রতিহত করেছে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর (সিআইআইডি)।
চট্টগ্রাম বন্দরে এক বিশেষ অভিযান চালিয়ে খণ্ডিত অবস্থায় থাকা এসব বিলাসবহুল গাড়ির গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ জব্দ করা হয়েছে বলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এক সংবাদ বিবৃতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে। উদ্ধারকৃত কন্টেইনার তল্লাশি করে গাড়ির যন্ত্রাংশের মধ্যে লেক্সাস এলএক্স ৬০০, লেক্সাস এসসি ৪৩০ ও বিএমডব্লিউ এম৫ মডেলের উচ্চমানের বিভিন্ন অংশ পাওয়া গেছে। এছাড়া হোন্ডা বি১৮সি টাইপ-আর ইঞ্জিন, ফ্রন্ট হাফ বা হাফ-কাট, ব্যবহৃত টায়ারসহ বিপুল পরিমাণ স্পর্শকাতর মেকানিকাল পার্টস উদ্ধার করা হয়।
কাস্টমস গোয়েন্দা সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, জাপান থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে এসে পৌঁছানো এই বিশাল চালানটি মূলত ‘ইউজড স্পেয়ার পার্টস’ হিসেবে কাগুজে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। পণ্যগুলো বন্দরে পৌঁছানোর পর প্রায় এক মাসেরও বেশি সময় পার হয়ে গেলেও সংশ্লিষ্ট আমদানিকারকের পক্ষে কোনো ‘বিল অব এন্ট্রি’ দাখিল করা হয়নি। পরবর্তী সময়ে আমদানিকারক শুল্ক ফাঁকি দিয়ে নিলাম প্রক্রিয়ার সুযোগ নিয়ে চালানটি বন্দর থেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার এক গোপন পরিকল্পনা করছিল বলে প্রাথমিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। গোপন খবরের সূত্রে কাস্টমস গোয়েন্দার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কন্টেইনারটির ওপর কড়া নজরদারি শুরু করেন। পরে কন্টেইনারের সিল কেটে কায়িক পরীক্ষা ও তল্লাশি চালানো হলে আমদানিকারকের প্রদত্ত ঘোষণার সঙ্গে পণ্যের মারাত্মক অসঙ্গতি ধরা পড়ে। সেখানে সাধারণ ব্যবহৃত খুচরা যন্ত্রাংশের পরিবর্তে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের বিলাসবহুল গাড়ির মূল কাঠামো ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ বিশেষ কৌশলে সাজানো অবস্থায় পাওয়া যায়।
তদন্তকারী কাস্টমস গোয়েন্দারা জানান, উদ্ধার করা খণ্ডিত অংশগুলোতে এমন কিছু সুনির্দিষ্ট মেকানিকাল নম্বর, কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য ও অরিজিনাল চিহ্ন রয়েছে, যার ওপর ভিত্তি করে গাড়িগুলোর মূল পরিচয় ও কাঠামো শনাক্ত করার জোর চেষ্টা চলছে। বিচ্ছিন্ন অবস্থায় আমদানি করা হলেও এসব পার্টসে পূর্ণাঙ্গ গাড়ির ‘এসেনশিয়াল ক্যারেক্টার’ বা আবশ্যকীয় বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান রয়েছে কিনা, তা যানবাহন বিশেষজ্ঞ ও অটোমোবাইল প্রকৌশলীদের প্রত্যক্ষ সহায়তায় নিবিড়ভাবে যাচাই করা হচ্ছে।
প্রাথমিক মূল্যায়নে কাস্টমস কর্মকর্তাদের শনাক্ত করা তথ্য অনুযায়ী, জব্দকৃত চালানটিতে থাকা লেক্সাস এলএক্স ৬০০, লেক্সাস এসসি ৪৩০ এবং বিএমডব্লিউ এম৫-এর সম্মিলিত সম্ভাব্য বাজারমূল্য এবং অন্যান্য যন্ত্রাংশসহ পুরো চালানের আনুমানিক মূল্য প্রায় ৯ কোটি ৫০ লাখ থেকে ১২ কোটি টাকার কাছাকাছি হতে পারে বলে ধরা হচ্ছে।
বর্তমানে এই বিশাল চালানটির প্রকৃত আমদানি মূল্য, ব্যাংক পেমেন্টের ধরন, সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক নথি ও আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেনের খুঁটিনাটি তথ্য পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করা হচ্ছে। একই সঙ্গে এই পণ্য আমদানির অন্তরালে কোনো ধরনের অবৈধ আর্থিক লেনদেন কিংবা মানি লন্ডারিংয়ের মতো গুরুতর অপরাধের সরাসরি সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখছেন গোয়েন্দারা।
প্রাথমিক পর্যায়ে আমদানিকৃত চালানটির প্রকৃত পণ্য, সঠিক শ্রেণিবিন্যাস ও শুল্ক-কর নির্ধারণের বিষয়টি নিরীক্ষা করা হচ্ছে। কাস্টমস কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত তদন্ত শেষে পণ্যের প্রকৃত শ্রেণিবিন্যাস নির্ধারণ করে রাজস্ব ফাঁকি কিংবা আইন লঙ্ঘনের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানসহ জড়িত সকলের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন ও শুল্ক বিধি অনুযায়ী কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।