বিশ্বের পোশাকবাজার প্রতিনিয়ত ও দ্রুত গতিতে বদলে যাচ্ছে। প্রচলিত তুলানির্ভর পোশাকের বাজার ছেড়ে বিশ্বের আন্তর্জাতিক ক্রেতারা ক্রমেই কৃত্রিম ও অন্যান্য তন্তুনির্ভর পোশাকের দিকে ঝুঁকছেন। বৈশ্বিক বাজারে বর্তমানে সক্রিয় জীবনযাপনের উপযোগী পোশাক, খেলাধুলার পোশাক, প্রযুক্তিনির্ভর কাপড়, বিশেষ ধরনের শীতবস্ত্র এবং উচ্চমূল্যের পোশাকের চাহিদা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে তুলানির্ভর পোশাকের অংশ ক্রমেই কমে আসছে এবং বিপরীতে দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে কৃত্রিম ও অন্যান্য বিশেষ তন্তুনির্ভর পোশাকের চাহিদা। তবে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাজারের এই নতুন পরিবর্তনের সাথে কাঙ্ক্ষিত গতিতে তাল মেলাতে পারছে না। দেশের মোট পোশাক রপ্তানির প্রায় তিন-চতুর্থাংশ এখনও সেই পুরোনো তুলানির্ভর পণ্যের ওপরই আটকে রয়েছে।
গত পাঁচ বছরের পরিসংখ্যান পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, এ অবস্থার ইতিবাচক কোনো পরিবর্তন হয়নি। বরং আন্তর্জাতিক বাজারে তুলার বাইরে গিয়ে কৃত্রিম তন্তুর পোশাকের অংশ যত বৃদ্ধি পেয়েছে, বৈশ্বিক বাজারের সাপেক্ষে বাংলাদেশের ব্যবধান ততই বড় ও উদ্বেগজনক হয়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কেন্দ্রের (আইটিসি) ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের (বিএভি) তৈরি করা এক বিশেষ পর্যালোচনায় এই চিত্র স্পষ্ট ফুটে উঠেছে।
প্রদর্শিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালে বিশ্ব পোশাক রপ্তানিতে তুলানির্ভর পোশাকের অংশ ছিল ৪৪.৯ শতাংশ। কিন্তু ২০২৫ সালে এসে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪১.৬ শতাংশে। ঠিক একই সময়ে তুলার বাইরে কৃত্রিম ও অন্যান্য তন্তুনির্ভর পোশাকের অংশ ৫৫.১ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ৫৮.৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি খাতের চিত্রে দেখা যায়, ২০২১ সালে তুলানির্ভর পোশাকের অংশ ছিল ৭৩.২ শতাংশ। দীর্ঘ পাঁচ বছর পর ২০২৫ সালে এসেও তা প্রায় একই স্থানে—অর্থাৎ ৭২.৭ শতাংশে আটকে আছে। এই দীর্ঘ সময়ে দেশে তুলাবহির্ভূত বা কৃত্রিম তন্তুর পোশাকের অংশ মাত্র ০.৫ শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়ে ২৬.৮ শতাংশ থেকে ২৭.৩ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ বিশ্ববাজার যখন তুলাবহির্ভূত পোশাকের দিকে অতি দ্রুত এগিয়ে গিয়েছে, বাংলাদেশ তখন কার্যত একই জায়গায় স্থবির দাঁড়িয়ে আছে।
পরিসংখ্যানের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, বৈশ্বিক চাহিদার সঙ্গে বাংলাদেশের সমন্বয়ের ব্যবধান কমছে না, বরং প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০২১ সালে বিশ্ব পোশাক রপ্তানিতে তুলাবহির্ভূত পোশাকের অংশ ছিল ৫৫.১ শতাংশ, যেখানে বাংলাদেশের অংশ ছিল ২৬.৮ শতাংশ। অর্থাৎ তখন ব্যবধান ছিল প্রায় ২৮ শতাংশীয় পয়েন্ট। তবে ২০২৫ সালে এসে বিশ্ববাজারে তুলাবহির্ভূত পোশাকের অংশ বেড়ে ৫৮.৪ শতাংশে পৌঁছালেও বাংলাদেশে তা বেড়ে হয়েছে মাত্র ২৭.৩ শতাংশ। ফলে এই ব্যবধান এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩১ শতাংশীয় পয়েন্টে। এটি কেবল ধীরগতির অগ্রগতির চিত্র নয়, বরং পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ যে দিন দিন পিছিয়ে পড়ছে, সেই বার্তাই দিচ্ছে।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেল জানান, বাংলাদেশের পোশাক খাত এখনও মূলত তুলানির্ভর পণ্যের কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে। অথচ বৈশ্বিক বাজারের চাহিদা খুব দ্রুত বদলে যাচ্ছে। উচ্চমূল্যের অনেক নতুন পণ্য এখন তুলার বাইরে গিয়ে কৃত্রিম ও বিশেষায়িত তন্তুনির্ভর কাঁচামালে তৈরি হচ্ছে। তাঁর মতে, বর্তমানে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে কেবল কম দামে পণ্য সরবরাহ করার সক্ষমতা হয়তো যথেষ্ট হতে পারে, তবে আগামী দিনের বৈশ্বিক বাজারে টিকে থাকতে হলে পণ্য উৎপাদনের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও পণ্যের বৈচিত্র্য অনেক বাড়াতে হবে।
আন্তর্জাতিক বাজারে যেসব তুলাবহির্ভূত পোশাকের চাহিদা বাড়ছে, তার মধ্যে রয়েছে খেলাধুলার পোশাক, সক্রিয় জীবনযাপনের পোশাক, উন্নত প্রযুক্তির শীতবস্ত্র, পানি ও বাতাস প্রতিরোধী পোশাক, কর্মক্ষেত্রে ব্যবহৃত বিশেষ পোশাক এবং বিভিন্ন ধরনের কার্যক্ষম টেক্সটাইল পণ্য। এসব তৈরি পণ্যে সাধারণত উন্নত কাঁচামাল, আধুনিক প্রযুক্তি, বিশেষায়িত যন্ত্রপাতি ও অত্যন্ত দক্ষ জনবলের প্রয়োজন হয়। বিশ্বমানের বড় ব্র্যান্ড ও আন্তর্জাতিক ক্রেতারা এখন সাধারণ টি-শার্ট, শার্ট বা ট্রাউজারের বাইরে গিয়ে এসব বিশেষায়িত পণ্যের দিকে নজর দিচ্ছেন। সাধারণ তুলানির্ভর পোশাকের বাজারে প্রতিযোগিতা ও দরকষাকষি বাড়লেও তুলাবহির্ভূত এসব বিশেষায়িত পণ্যে তুলনামূলকভাবে বেশি মূল্য সংযোজন বা অতিরিক্ত মুনাফার সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশের প্রধান শক্তি হলো এর বিপুল উৎপাদনক্ষমতা, প্রতিযোগিতামূলক শ্রম ব্যয় এবং দীর্ঘদিনের তৈরি পোশাক রপ্তানির অভিজ্ঞতা। কিন্তু কাঁচামালের অপ্রতুলতা, উন্নত প্রযুক্তি ও আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব এবং দক্ষতার সীমাবদ্ধতার কারণে দেশ এখনও তুলাবহির্ভূত পোশাকের বিশ্ববাজারে কাঙ্ক্ষিত অবস্থান তৈরি করতে পারছে না। এশিয়ার অন্যান্য পোশাক রপ্তানিকারক দেশ ইতোমধ্যে কৃত্রিম তন্তু ও মিশ্র তন্তুর পোশাকে তাদের অবস্থান সুদৃঢ় করেছে। উদাহরণস্বরূপ, ভিয়েতনাম ও চীনের মোট পোশাক রপ্তানিতে কৃত্রিম তন্তুনির্ভর পণ্যের অংশ প্রায় ৪৯ শতাংশের কাছাকাছি। এমনকি কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলোও এ খাতে নিজেদের অংশ বাড়িয়ে ৪০ শতাংশের ঘরে উন্নীত করেছে, যেখানে বাংলাদেশের অবস্থান এখনও মাত্র ২৭ শতাংশের কিছু ওপরে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল কম শ্রম ব্যয়ের সুবিধা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদে বৈশ্বিক তৈরি পোশাক বাজারে প্রাধান্য ধরে রাখা কঠিন হবে। বাংলাদেশের সামনে এখনো সুযোগ রয়েছে, কারণ দেশের অবকাঠামো ও উৎপাদন সক্ষমতা বিদ্যমান। প্রয়োজন পরিকল্পিত নতুন বিনিয়োগ, কৃত্রিম তন্তুর কাঁচামাল তৈরি, টেকসই ও পুনর্ব্যবহারযোগ্য উপকরণের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো। শুধু কম দামে পণ্য দেওয়ার প্রতিযোগিতা নয়, আগামী দিনের প্রতিযোগিতায় টিকতে হলে বাংলাদেশকে দ্রুত উচ্চমূল্যের কৃত্রিম ও মিশ্র তন্তুর পোশাক উৎপাদনে নজর দিতে হবে। (তথ্যসূত্র: আইটিসি, ইপিবি, বিএভি)