নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের পর নতুন করে আরেকটি বড় ধরনের ঝুঁকির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। দেশটিতে একটি কৃত্রিম লেক তৈরি হয়েছে, যেটি যেকোনো সময় ভেঙে গিয়ে ভয়াবহ বন্যার সৃষ্টি করতে পারে বলে সতর্ক করেছে চীন। সম্ভাব্য এই বিপর্যয় ঘটলে ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
বুধবার (২৬ আগস্ট) নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার ঘটনা ঘটে। এতে এখন পর্যন্ত সাড়ে তিনশোর বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। ভয়াবহ এই দুর্যোগের পরও বিভিন্ন এলাকায় উদ্ধার অভিযান চলছে। এর মধ্যেই নতুন কৃত্রিম লেক নিয়ে চীনের সতর্কবার্তা নেপালের জন্য পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
চীনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নেপালে তৈরি হওয়া কৃত্রিম লেকটি পানিতে ভরে গেছে। অতিরিক্ত পানি জমার কারণে লেকটির বাঁধ বা প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতা ভেঙে যেতে পারে। এ ধরনের ঘটনা ঘটলে নিচের দিকে থাকা এলাকাগুলোতে আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হতে পারে।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) চীনা সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল টাইমস চীন সেন্ট্রাল টেলিভিশনের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে। প্রতিবেদনে চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সতর্কতার কথা তুলে ধরা হয়েছে।
চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, লেকটি ইতিমধ্যে পানিতে পূর্ণ হয়ে গেছে। শনিবার সকাল পর্যন্ত সেখানে বিপুল পরিমাণ পানি জমা হয়েছিল। আগামী দুই থেকে তিন দিনে পানির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। এতে লেকটি যেকোনো সময় ভেঙে গিয়ে নিচের দিকে ভয়াবহ বন্যা সৃষ্টি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কৃত্রিম লেকটি ছোচেন খোলা এবং পুরেপু সাংপো নদীর মোহনার কাছে তৈরি হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এই জলাধারের ওপর নিবিড় পর্যবেক্ষণ চালানো হচ্ছে। পরিস্থিতির যেকোনো পরিবর্তন দ্রুত শনাক্ত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্ক রাখা হয়েছে।
চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, সম্ভাব্য বন্যা হলে এর প্রভাব কোন কোন এলাকায় পড়তে পারে, তা নিরূপণের কাজ চলছে। একই সঙ্গে জরুরি উদ্ধার অভিযান পরিচালনায় কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, সেটিও পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
ছোচেন খোলা এবং পুরেপু সাংপো নদীর উৎপত্তি তিব্বতে। নেপালে প্রবেশের আগে নদী দুটি একত্রিত হয়েছে। নেপালে প্রবেশের পর এই নদীটি ভোটেকোশি নদী নামে পরিচিত। ভোটেকোশি নদী ত্রিশূলি নদীর প্রধান ঊর্ধ্ব শাখা নদী হিসেবে পরিচিত।
বুধবারের ভয়াবহ বন্যার সময় ভোটেকোশি নদী ব্যাপকভাবে ফুলে ওঠে। নদীর আশপাশের নিচু এলাকাগুলোতে দ্রুত পানি ও কাদা প্রবেশ করে। প্রবল পানির স্রোত ও ধ্বংসাবশেষের আঘাতে নদীর তীরবর্তী বিভিন্ন স্থাপনা ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত ও ধ্বংস হয়ে যায়।
বন্যার পানির সঙ্গে বিপুল পরিমাণ কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ প্রবাহিত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। নদীর আশপাশের জনবসতিগুলোতে পানি ঢুকে পড়ায় বহু মানুষ আটকা পড়েন। দুর্গম ও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে উদ্ধারকারী দল পৌঁছাতে গিয়ে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়ছে।
বন্যার পর এখনো নিখোঁজদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান চলছে। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে উদ্ধারকারী দল, নিরাপত্তা বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো কাজ করছে। একই সঙ্গে দুর্গত মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যেই নতুন কৃত্রিম লেকের বিষয়ে সতর্কতা নেপালের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ, লেকটি ভেঙে গেলে এর পানি ও ধ্বংসাবশেষ দ্রুত নিচের দিকে নেমে আসতে পারে। এতে আগের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো নতুন করে বিপদের মুখে পড়তে পারে।
চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় লেকটির ওপর নিবিড় নজর রাখা হচ্ছে। পানির উচ্চতা, জলাধারের অবস্থা এবং আশপাশের নদীগুলোর পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হলে দ্রুত উদ্ধার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
নেপালে চলমান দুর্যোগের মধ্যে নতুন এই ঝুঁকি সামনে আসায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে নদী ও জলাধারের আশপাশের এলাকায় বসবাসকারী মানুষের নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সম্ভাব্য বন্যার গতিপথ ও প্রভাব সম্পর্কে আগাম তথ্য সংগ্রহের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড়ি এলাকায় হিমবাহ ধস, ভূমিধস এবং আকস্মিক জলপ্রবাহের কারণে তৈরি হওয়া জলাধার অনেক সময় বড় ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এসব জলাধারে অতিরিক্ত পানি জমে গেলে প্রাকৃতিক বাধা ভেঙে দ্রুত বিপুল পরিমাণ পানি নিচের দিকে নেমে আসতে পারে।
বুধবারের বন্যায় ইতোমধ্যে নেপালের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। শত শত মানুষের প্রাণহানি এবং বিপুলসংখ্যক মানুষের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় দেশজুড়ে শোকের পরিবেশ বিরাজ করছে। উদ্ধারকারীরা যখন আগের বিপর্যয়ের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা ও নিখোঁজদের সন্ধানে ব্যস্ত, তখন নতুন এই কৃত্রিম লেকের ঝুঁকি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
এ অবস্থায় নেপালের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে সম্ভাব্য নতুন বন্যার ঝুঁকি মোকাবিলা করা। চীনের সতর্কতার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কৃত্রিম লেকটির পরিস্থিতির ওপর নজরদারি বাড়িয়েছে। লেকটি ভেঙে গেলে যাতে দ্রুত সতর্কতা জারি এবং উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করা যায়, সে বিষয়ে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের ধাক্কা সামলাতে থাকা নেপাল এখন আরেকটি সম্ভাব্য বিপর্যয়ের শঙ্কায় রয়েছে। নতুন কৃত্রিম লেকটি শেষ পর্যন্ত কতটা ঝুঁকি তৈরি করবে, তা নির্ভর করছে পানির পরিমাণ ও জলাধারের স্থিতিশীলতার ওপর। তবে পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় চীন ইতোমধ্যে সতর্কতা জারি করেছে এবং সম্ভাব্য বন্যার প্রভাব মোকাবিলায় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।