বসনিয়া যুদ্ধের সময় গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত বসনিয়ান সার্ব জেনারেল রাটকো ম্লাদিচ মারা গেছেন। প্রায় ৮ হাজার মুসলমানকে হত্যার পরিকল্পনা ও নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত এই সামরিক কর্মকর্তা ‘বসনিয়ার কসাই’ নামে পরিচিত ছিলেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর।
রাটকো ম্লাদিচের মৃত্যুর খবর জানিয়েছে সার্বিয়ার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন আরটিএস এবং বসনিয়ান সার্বদের সরকারি টেলিভিশন। রয়টার্সকে জাতিসংঘের এক কর্মকর্তাও তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে জাতিসংঘের কারাগার হাসপাতালেই ম্লাদিচের মৃত্যু হয়েছে। জীবনের শেষ কয়েক বছর তিনি কারাগারে বন্দি অবস্থায় কাটিয়েছেন। গুরুতর অপরাধে দণ্ডিত এই সাবেক জেনারেলের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বসনিয়া যুদ্ধের অন্যতম আলোচিত ও বিতর্কিত একটি অধ্যায়ের অবসান ঘটল।
১৯৯২ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত চলা বসনিয়া যুদ্ধে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড, গণহত্যা, নির্যাতন ও অন্যান্য নৃশংসতার ঘটনা ঘটে। ওই সময় বসনিয়ান সার্ব বাহিনীর সামরিক নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন রাটকো ম্লাদিচ। পরবর্তী সময়ে এসব অপরাধের জন্য তাকে আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারের মুখোমুখি হতে হয়।
১৯৯৫ সালে জাতিসংঘ ঘোষিত বসনিয়ার একটি ‘নিরাপদ এলাকায়’ অন্তত ৮ হাজার মুসলিমকে হত্যার পরিকল্পনা ও নেতৃত্ব দেওয়ার দায়ে ম্লাদিচ গণহত্যার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হন। স্রেব্রেনিৎসা হত্যাকাণ্ড নামে পরিচিত ওই ঘটনা বসনিয়া যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ অধ্যায়গুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত।
স্রেব্রেনিৎসায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে ভয়াবহ নৃশংসতার ঘটনাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সেখানে বসনিয়ান মুসলিম পুরুষ ও কিশোরদের ব্যাপকভাবে হত্যা করা হয়েছিল। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই হত্যাকাণ্ড গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও দীর্ঘ সময় রাটকো ম্লাদিচ গ্রেপ্তার এড়িয়ে আত্মগোপনে ছিলেন। তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি থাকলেও বহু বছর তাকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। অবশেষে ২০১১ সালে তাকে সার্বিয়ায় গ্রেপ্তার করা হয় এবং বিচারের জন্য দ্য হেগে পাঠানো হয়।
দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার পর ২০১৭ সালে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল রাটকো ম্লাদিচকে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। আদালতে তার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ প্রমাণিত হয়। তবে তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগে তিনি দোষী সাব্যস্ত হননি।
রায় ঘোষণার সময় আন্তর্জাতিক আদালত ম্লাদিচের অপরাধের ভয়াবহতা তুলে ধরে। আদালতের ভাষ্য অনুযায়ী, তার কর্মকাণ্ড মানবজাতির কাছে পরিচিত সবচেয়ে জঘন্য অপরাধগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল। বসনিয়া যুদ্ধের সময় সামরিক বাহিনীর নেতৃত্বে থেকে তিনি ব্যাপক হত্যাকাণ্ড ও নিপীড়নে ভূমিকা রেখেছিলেন বলে আদালতের রায়ে উঠে আসে।
পরবর্তীতে ম্লাদিচের পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হয়। তবে আপিলেও তার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল থাকে। ফলে জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত তাকে কারাগারেই থাকতে হয়েছে।
‘বসনিয়ার কসাই’ নামে পরিচিত রাটকো ম্লাদিচের মৃত্যুর খবর প্রকাশের পর আবারও বসনিয়া যুদ্ধ এবং স্রেব্রেনিৎসা হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহ স্মৃতি সামনে এসেছে। যুদ্ধের সময় নিহতদের স্বজন ও বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের কাছে ম্লাদিচ ছিলেন সেই সময়ের নৃশংসতার অন্যতম প্রধান প্রতীক।
ম্লাদিচের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর মধ্যে ছিল গণহত্যা, নিপীড়ন, হত্যা, নির্বিচারে হামলা, জিম্মি করা এবং জোরপূর্বক মানুষকে স্থানান্তরের মতো অপরাধ। আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থায় বসনিয়া যুদ্ধের অপরাধীদের বিচারের ক্ষেত্রে তার মামলা ছিল অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ।
জাতিসংঘের সাবেক মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান জেইদ রা’দ আল হুসেইন ম্লাদিচের দণ্ডাদেশের পর তাকে ‘অশুভের প্রতীক’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। তার এই মন্তব্য ম্লাদিচের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধগুলোর আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছিল, তা তুলে ধরে।
বসনিয়া যুদ্ধ ১৯৯৫ সালে শেষ হলেও ওই সময়ের গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধের বিচার বহু বছর ধরে আন্তর্জাতিক আদালতে চলেছে। নিহতদের পরিবার, যুদ্ধ থেকে বেঁচে যাওয়া মানুষ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর জন্য এসব বিচার ছিল দীর্ঘ প্রতীক্ষার বিষয়।
ম্লাদিচের মৃত্যু হলেও বসনিয়া যুদ্ধের ক্ষত এখনো পুরোপুরি শুকায়নি। স্রেব্রেনিৎসাসহ বিভিন্ন স্থানে নিহত হাজারো মানুষের স্মৃতি আজও বহন করছে তাদের পরিবার ও স্বজনরা। যুদ্ধাপরাধের বিচার এবং ঐতিহাসিক সত্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
বসনিয়া যুদ্ধের সময় সংঘটিত নৃশংসতার জন্য রাটকো ম্লাদিচের বিরুদ্ধে দেওয়া যাবজ্জীবন দণ্ড ছিল আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ রায়। ৮৪ বছর বয়সে দ্য হেগের কারাগার হাসপাতালে তার মৃত্যু হলেও তার বিরুদ্ধে প্রমাণিত অপরাধ এবং বসনিয়া যুদ্ধের ইতিহাস আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন আলোচিত থাকবে।