তিব্বত সীমান্তে আকস্মিক ভয়াবহ হিমধসের প্রভাবে নেপালে নেমে এসেছে ভয়াবহ প্লাবন ও পাহাড়ি ঢল। পাহাড়ি অঞ্চল থেকে উজান হয়ে ধেয়ে আসা এই অস্বাভাবিক ও তীব্র জলউচ্ছ্বাসে নেপালের তিনটি জেলায় এ পর্যন্ত অন্তত ১৬০ জনের করুণ প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। নেপালের রসুয়া জেলায় সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা ও ভয়াবহ হড়পা বানের জেরে উদ্ভূত এই মারাত্মক প্রাকৃতিক সংকটের প্রভাব এসে পড়েছে প্রতিবেশী ভারতের বিহার রাজ্যেও। উজান থেকে ধেয়ে আসা বিশাল পানিস্রোত সরাসরি বিহার রাজ্যে প্রবেশ করতে শুরু করায় পুরো রাজ্যজুড়ে এখন ভয়াবহ এক বন্যার বড় ধরনের আশঙ্কাজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
উদ্ভূত এই মারাত্মক দুর্যোগপূর্ণ ও সংকটময় পরিস্থিতিতে সমগ্র বিহার রাজ্যজুড়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা বা ‘হাই অ্যালার্ট’ জারি করেছে স্থানীয় প্রশাসন। সামগ্রিক পরিস্থিতির তীব্রতা বিবেচনা করে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরী জরুরি ভিত্তিতে একটি উচ্চপর্যায়ের ‘হাই লেভেল টিম’ গঠন করেছেন। একই সাথে তিনি সংশ্লিষ্ট সব সরকারি কর্মকর্তাদের সার্বক্ষণিক সতর্ক থাকার স্পষ্ট বার্তা ও নিবিড় নির্দেশ দিয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রী নদীর চারদিকের সার্বিক পরিস্থিতির ওপর নজরদারি বাড়ানোর কঠোর আদেশ জারি করেছেন। বিশেষ করে গণ্ডক নদীর বাঁধ এবং বাঁধ সংলগ্ন এলাকাগুলোতে বুধবার ও বৃহস্পতিবার নিবিড় নজরদারি জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রাজ্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে রাতের বেলা নৈশকালীন টহল বা ‘নাইট পেট্রোলিং’ বৃদ্ধি করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব ও জোর দেওয়া হয়েছে।
গণ্ডক নদীর আশপাশে ও তীরবর্তী এলাকায় অবস্থিত পশ্চিম চম্পারণ, পূর্ব চম্পারণ, মুজাফফরপুর, বৈশালী, গোপালগঞ্জ ও সারণ জেলা প্লাবিত হতে পারে— এমন তীব্র আশঙ্কায় প্রতিটি জেলা প্রশাসনকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় বা হাই অ্যালার্টে রাখা হয়েছে। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজ্য সরকারের সব সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের অর্জিত ও সাধারণ ছুটি তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল করা হয়েছে।
নেপাল থেকে ধেয়ে আসা এই বিপুল পরিমাণ পাহাড়ি ঢলের পানি সরাসরি গণ্ডক নদী হয়ে বিহার রাজ্যে প্রবেশ করছে। বিহার প্রশাসনের প্রবল আশঙ্কা, মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পাহাড়ি ঢাল বেয়ে একসঙ্গে প্রায় সাড়ে তিন লাখ কিউসেক পানি প্রবল বেগে নিম্নাঞ্চলের দিকে নেমে আসবে। এ কারণে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে আগাম নিরাপত্তা ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে নদী তীরবর্তী ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী বাসিন্দাদের অবিলম্বে নিরাপদ ও উঁচু স্থানে আশ্রয় নেওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে।
ইতোমধ্যেই বাল্মীকিনগরে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ গণ্ডক নদী ব্যারেজের নিরাপত্তা ও শারীরিক স্থায়িত্ব বহুলাংশে বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বিহার এবং উত্তর প্রদেশের অভিজ্ঞ প্রকৌশলীরা নিরবচ্ছিন্নভাবে ব্যারেজের সার্বিক সুরক্ষা ও পানি ধারণক্ষমতা পর্যবেক্ষণ করছেন।
বিহার সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, স্থানীয় সময় বুধবার (২৬ আগস্ট) রাত সাড়ে ১১টার দিকেই নেপালের উজান থেকে ধেয়ে আসা পানি প্রবল বেগে বিহারের গণ্ডক নদীতে প্রবেশ করতে শুরু করে। পানির এমন তীব্র চাপ ও পানির প্রবল স্রোত সামাল দিতে উত্তর বিহারের বাল্মীকিনগরে অবস্থিত গণ্ডক ব্যারেজের মোট ৩৬টি গেটই ধাপে ধাপে সম্পূর্ণ খুলে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সম্ভাব্য প্লাবনের ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় থেকে বন্যপ্রাণী ও বনাঞ্চল রক্ষায় বাল্মীকিনগরের বিখ্যাত ‘বাল্মীকিনগর টাইগার রিজার্ভ’ এলাকার বন্যপশুদের দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়ার কাজ জরুরি ভিত্তিতে শুরু করা হয়েছে।