তিব্বত সীমান্তবর্তী নেপালে গত বুধবারের ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার পেছনে একটি বিশাল হিমবাহের ধস মূল কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের ধারণা, আনুমানিক ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত একটি হিমবাহের নিচের বড় অংশ ভেঙে প্রায় ১ হাজার ২০০ মিটার নিচে উপত্যকায় প্রচণ্ড বেগে আছড়ে পড়ার ফলে এই প্রলয়ংকারী বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়েছে। আন্তর্জাতিক মার্কিন কৃত্রিম উপগ্রহ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ‘প্ল্যানেট ল্যাবস’-এর পাঠানো উপগ্রহচিত্র ও স্যাটেলাইট ডাটা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞ দল এই চাঞ্চল্যকর তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
পর্যালোচনা করা উপগ্রহচিত্রে দেখা যায়, দুর্যোগের প্রভাবে ওই অঞ্চলের চিরসবুজ পাহাড়ি এলাকাগুলো এখন বাদামি রঙের ভয়াবহ ধ্বংসস্তূপ ও পলিমাটির ঘন স্তূপে ঢেকে গেছে। তবে ঠিক কী কারণে হিমবাহটি হঠাৎ ধসে পড়ল, তা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে বিশ্লেষণ চলছে। নেপালের সরকারি কর্মকর্তাদের প্রাথমিক ধারণা, বিপর্যয়ের মাত্র কয়েক মিনিট আগে ওই অঞ্চলে আঘাত হানা একটি ভূকম্পন বা ভূমিকম্প এর পেছনে সরাসরি অনুঘটক হিসেবে কাজ করে থাকতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (ইউএসজিএস) তথ্যমতে, তিব্বত অঞ্চলে অনুভূত হওয়া ওই ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৪.৪, যার উৎপত্তিস্থল ছিল নেপালের গোসাইকুন্ড হ্রদ থেকে ৪৭ কিলোমিটার উত্তরে। নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল দেশের পার্লামেন্টে জানান, স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে ভূমিকম্পটি অনুভূত হয় এবং তার মাত্র ৩ মিনিটের মাথায়, অর্থাৎ ৮টা ৪০ মিনিটে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা শুরু হয়।
আন্তর্জাতিক সীমান্ত সংলগ্ন উভয় দেশের কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক আশঙ্কানুযায়ী, প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত পরিমাণ বর্তমান অনুমানের চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে। বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত প্রাপ্ত হালনাগাদ তথ্যে নেপালে ১৬২ জনের নিশ্চিত মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে এবং ৩০০ জনেরও বেশি বিদেশি ও স্থানীয় পর্যটক এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। অন্যদিকে চীন সীমান্তে ৩ জনের মৃত্যু ও অন্তত ৫৫৮ জন নিখোঁজ থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।
ভারতের সিকিম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল ভূতত্ত্বের অধ্যাপক বিক্রম গুপ্ত জানান, হিমবাহের অগ্রভাগের একটি বিশালাকার অংশ ধসে পড়ার মাধ্যমেই এ ঘটনার সূত্রপাত ঘটে, যার সঙ্গে বিপুল পরিমাণ পলিমাটি ও কঠিন পাথর নিচে নেমে এসেছে। পাশাপাশি কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ক্যালগারির ভূবিজ্ঞানী ড্যান শুগার জানান, দুর্যোগের ঠিক আগের ২৪ ঘণ্টায় অতিরিক্ত উষ্ণ আবহাওয়ার কারণে এলাকাটিতে প্রচুর বরফ গলে উন্মুক্ত বরফস্তরে পরিণত হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট’ (আইসিআইএমওডি) জানিয়েছে, হিমবাহ ধসে তৈরি হওয়া এই ‘আইস-রক অ্যাভালাঞ্চ’ ভোটে কোশি ও ত্রিশূলী নদী অববাহিকায় তীব্রগতিতে কাদা ও পাথর প্রবাহিত করে, যার ফলে গালছি এলাকায় নদীর পানির স্তর মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে অবিশ্বাস্যভাবে ৯ মিটার বা ৩০ ফুট বৃদ্ধি পায়। কাঠমান্ডুভিত্তিক গবেষক চিয়াংগং ঝাং সতর্ক করে জানিয়েছেন, উজান সীমান্তে এখনো নদীর গতিপথে কৃত্রিম প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়ে রয়েছে, ফলে যেকোনো মুহূর্তে দ্বিতীয় দফায় আরও একটি ভয়াবহ বন্যা আছড়ে পড়ার প্রবল ঝুঁকি রয়েছে।
(সূত্র: রয়টার্স ও এএফপি)