হিমবাহ ধসের কারণে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে নেপালে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৩৫৯ জনে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) বিকেল ৫টায় নেপালের পুলিশ হতাহতের সর্বশেষ এই তথ্য জানিয়েছে। একই ঘটনায় এখনো বিপুলসংখ্যক মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।
বুধবার (২৬ আগস্ট) সকালে নেপাল–তিব্বত সীমান্তে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা ঘটে। এতে সীমান্তের উভয় পাশে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। প্রাথমিকভাবে প্রায় এক হাজার মানুষ নিখোঁজ থাকার তথ্য পাওয়া যায়। নিখোঁজদের মধ্যে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বিদেশি পর্যটকও রয়েছেন।
নেপালের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে ১৭৮ জন ভারতীয়, ১২৭ জন নেপালি, ৬৫ জন আমেরিকান এবং যুক্তরাজ্যের ৩৩ নাগরিক রয়েছেন। এ ছাড়া নেপালের সেনাবাহিনী ও পুলিশের বেশ কয়েকজন সদস্যও নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানা গেছে।
প্রাকৃতিক এই দুর্যোগে নেপালের বিভিন্ন এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আকস্মিক বন্যার পানির সঙ্গে বিপুল পরিমাণ পাথর, মাটি ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ প্রবাহিত হওয়ায় অনেক এলাকা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। দুর্গম এলাকায় উদ্ধারকাজ পরিচালনা করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
চীনের তিব্বত অংশেও এই দুর্যোগের ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। সেখানে তিনজন নিহত এবং ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে বন্যা ও ভূমিধসের কারণে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস জানিয়েছে, হিমবাহ ধস এবং এর সঙ্গে বয়ে আসা ধ্বংসাবশেষের প্রবাহ থেকে আকস্মিক এই বন্যার সৃষ্টি হয়েছে। হিমবাহ ও পাহাড়ি এলাকা থেকে নেমে আসা পানি ও ধ্বংসাবশেষ নদীগুলোতে জমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
ইউএসজিএসের মতে, নদীর প্রবাহে ধ্বংসাবশেষ জমে যাওয়ার কারণে ভবিষ্যতে একই ধরনের আরও আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে উদ্ধারকাজের পাশাপাশি নতুন করে বন্যার ঝুঁকি মোকাবিলায় সতর্কতাও জোরদার করা হচ্ছে।
এদিকে নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ বৃহস্পতিবার আকস্মিক বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকটি এলাকা পরিদর্শন করেছেন। তিনি নুয়াকোট জেলার বিদুর এবং এর আশপাশের জনপদগুলো ঘুরে দেখেন। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার পরিস্থিতি সরেজমিনে পরিদর্শনের পাশাপাশি উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমের বিষয়েও খোঁজ নেন তিনি।
দুর্যোগের কারণে নেপাল ও চীনের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথগুলোর কয়েকটিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে চীনের গিরং স্থলবন্দরটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই স্থলবন্দর চীন ও নেপালের মধ্যে পর্যটক এবং যানবাহন চলাচলের অন্যতম প্রধান সীমান্ত পারাপার কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
বুধবারের আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে গিরং স্থলবন্দরটি দৃশ্যত ব্যাপকভাবে বিধ্বস্ত হয়েছে। সীমান্তবর্তী এ অঞ্চলে বন্যার পানি ও ধ্বংসাবশেষের প্রবাহে সড়ক, স্থাপনা এবং যোগাযোগ অবকাঠামোর ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিনহুয়া জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার তিব্বত অংশের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো পরিদর্শন করেছেন চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন এবং উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম সম্পর্কে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে তথ্য নেন।
এর আগে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে সর্বাত্মক উদ্ধারকাজ চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং। দুর্যোগের পর নিখোঁজদের সন্ধান, আটকে পড়াদের উদ্ধার এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের সহায়তা দিতে ব্যাপক তৎপরতা শুরু করা হয়েছে।
নেপাল ও তিব্বতের সীমান্তবর্তী পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে দুর্গম ভূপ্রকৃতির কারণে উদ্ধারকাজ বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। অনেক এলাকায় সড়ক যোগাযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উদ্ধারকারী দলকে বিকল্প পথে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে হচ্ছে। নিখোঁজদের সন্ধানে বিভিন্ন বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো কাজ করছে।
নিখোঁজদের বড় একটি অংশ বিদেশি পর্যটক হওয়ায় তাদের পরিচয় শনাক্ত ও অবস্থান নিশ্চিত করার কাজও গুরুত্বের সঙ্গে চলছে। ভারত, আমেরিকা ও যুক্তরাজ্যের নাগরিকদের নিখোঁজ থাকার তথ্য প্রকাশ পাওয়ায় সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
নেপালের পুলিশ জানিয়েছে, উদ্ধারকাজের পাশাপাশি হতাহত ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। দুর্গত এলাকায় নতুন করে বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি থাকায় উদ্ধারকারীদের সতর্কতার সঙ্গে কাজ করতে হচ্ছে।
আকস্মিক এই দুর্যোগে নেপাল ও তিব্বতের সীমান্তবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকায় যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তাতে নিহত ও নিখোঁজের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে নদীগুলোতে ধ্বংসাবশেষ জমে থাকায় নতুন করে আকস্মিক বন্যার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমের পাশাপাশি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ জোরদার করা হয়েছে।