সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি / : 27
প্রযুক্তির দ্রুত প্রসার এবং আধুনিক রাইস মিলের সহজলভ্যতায় গ্রামবাংলার শত বছরের ঐতিহ্যবাহী ঢেঁকি আজ বিলুপ্তির পথে। একসময় অগ্রহায়ণ ও পৌষের নবান্ন কিংবা পৌষ-পার্বণে যে ঢেঁকির ছন্দময় শব্দে গ্রামের গৃহস্থের ঘুম ভাঙত, তা এখন স্মৃতি হতে চলেছে। সিরাজগঞ্জের তাড়াশসহ আশপাশের এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ বাড়িতেই এখন আর ঢেঁকি নেই; যা-ও দু-একটি আছে, তা-ও পড়ে রয়েছে গোয়ালঘর, রান্নাঘর কিংবা পরিত্যক্ত কোণে।
আগে অগ্রহায়ণ মাসে নতুন ধান ঘরে ওঠার পর শুরু হতো চাল ও চালের গুঁড়া তৈরির তোড়জোড়। ঢেঁকিছাটা চাল ও চালের গুঁড়া দিয়েই তৈরি হতো ভাপা, চিতই, দুধ পিঠা, তেলের পিঠাসহ নানা দেশীয় খাবার। তাড়াশ গ্রামের ১০৭ বছর বয়সী তছিরন জানান, শীতের সময় ঢেঁকিকে কেন্দ্র করে গ্রামে যে উৎসবের পরিবেশ ও স্বজনদের আনাগোনা তৈরি হতো, তা এখন আর দেখা যায় না। মাধাইনগর আদিবাসী কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুল মান্নান জানান, ঢেঁকি কেবল একটি কাঠের যন্ত্র ছিল না, এটি ছিল গ্রামীণ অর্থনীতি, পারস্পরিক সহযোগিতা ও সামাজিক বন্ধনের প্রতীক।
তবে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গ্রামে গ্রামে গড়ে উঠেছে আধুনিক রাইস মিল। তাড়াশ বাজারের রাইস মিল মালিক কামাল হোসেন জানান, কম সময় ও খরচে প্রতি বস্তা ধান ভাঙাতে ৪০-৪৫ টাকা এবং আতপ চালের আটা তৈরিতে কেজিতে ১৫ টাকা খরচ হয়। শ্রম ও সময় বাঁচাতে মানুষ এখন রাইস মিলমুখী। ফলে ঢেঁকির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা গ্রামীণ নারীদের ঐতিহ্যবাহী আয়ের পথটিও বন্ধ হয়ে গেছে। একসময় গ্রামের বিধবা ও স্বামীপরিত্যক্তা নারীরা অন্যের বাড়িতে ধান ভেনে জীবিকা নির্বাহ করতেন; এখন তাঁরা অন্য শ্রমনির্ভর কাজে বাধ্য হচ্ছেন।
প্রযুক্তির প্রয়োজনে যান্ত্রিকীকরণ স্বাভাবিক হলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পালিশ না করা ঢেঁকিছাটা চালে পুষ্টি উপাদান তুলনামূলক বেশি বজায় থাকে। সচেতন মহলের মতে, স্থানীয় জাদুঘর, মেলা বা পর্যটনকেন্দ্রে ঢেঁকি সংরক্ষণ করা জরুরি। পাশাপাশি ঢেঁকিছাটা চাল ও ঐতিহ্যবাহী পিঠাপুলিকে আধুনিক ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে বাজারজাত করা গেলে প্রান্তিক নারীদের নতুন কর্মসংস্থান এবং লোকজ সংস্কৃতি রক্ষা—উভয়ই সম্ভব।