দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে বলে দাবি করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ। জাতীয় সংসদে তিনি খুন, ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতন, মব সহিংসতা এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা ও সহিংসতার তুলনামূলক পরিসংখ্যান তুলে ধরেছেন। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় চলতি বছরের প্রথম আট মাসে এসব অপরাধের বেশ কয়েকটি সূচকে কমতি দেখা গেছে।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) জাতীয় সংসদে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে ফেনী-২ আসনের সংসদ সদস্য জয়নায় আবেদীনের প্রশ্নের লিখিত ও মৌখিক জবাবে এসব তথ্য জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত সময়ের সঙ্গে ২০২৬ সালের একই সময়ের তুলনা করলে দেশের প্রধান অপরাধগুলোর সংখ্যা কমেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এই পরিবর্তনকে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের ফল হিসেবে তুলে ধরেন তিনি।
সংসদে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম আট মাসে সারাদেশে খুনের ঘটনা ছিল ২ হাজার ৬০৭টি। চলতি বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা কমে ২ হাজার ৩৩২টিতে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে খুনের ঘটনা ২৭৫টি কমেছে।
নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনাতেও কমতির তথ্য তুলে ধরেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তার দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ছিল ১১ হাজার ২৬৯টি। ২০২৬ সালের একই সময়ে তা কমে ৯ হাজার ৩৪৭টিতে দাঁড়িয়েছে।
ধর্ষণের ঘটনাও গত বছরের তুলনায় কিছুটা কমেছে বলে সংসদে জানান সালাউদ্দিন আহমদ। ২০২৫ সালের প্রথম আট মাসে ধর্ষণের ঘটনা ছিল ৪ হাজার ৬৬৬টি। চলতি বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা কমে ৪ হাজার ৪০২টিতে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ধর্ষণের ঘটনা ২৬৪টি কমেছে।
মব সহিংসতার ঘটনাও কমেছে বলে সংসদে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের একই সময়ে সারাদেশে মব সহিংসতার ঘটনা ছিল ৮৯টি। চলতি বছরের একই সময়ে তা কমে ৫৬টিতে দাঁড়িয়েছে। এসব ঘটনা ভবিষ্যতে শূন্যে নামিয়ে আনতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলেও জানান তিনি।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা ও সহিংসতার ঘটনাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে বলে দাবি করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি জানান, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত এ ধরনের ঘটনা ছিল ৯৯৯টি। চলতি বছরের একই সময়ে তা কমে ১৬৩টিতে দাঁড়িয়েছে।
সালাউদ্দিন আহমদ বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সরকার বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। অপরাধের প্রবণতা কমিয়ে জননিরাপত্তা আরও জোরদার করার লক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
জলদস্যু ও বনদস্যু দমনের বিষয়েও জাতীয় সংসদে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি বলেন, সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর দক্ষিণাঞ্চলের সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের অনুরোধে সুন্দরবনসহ উপকূলীয় এলাকায় যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসব অভিযানের নাম দেওয়া হয় ‘অপারেশন রিস্টোর পিস’ ও ‘অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড’। কোস্টগার্ডের নেতৃত্বে র্যাব ও পুলিশের সমন্বয়ে এসব অভিযান পরিচালিত হয়। অভিযানে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার এবং বহু জলদস্যু ও বনদস্যুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তিনি জানান, দস্যুদের দমন করার পাশাপাশি তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার বিষয়েও সরকার উদ্যোগ নিয়েছে। একপর্যায়ে দস্যুদের অস্ত্র সমর্পণ এবং ক্ষমা প্রদর্শনের সুযোগ দেওয়া হয়। এর ফলে অনেক দস্যু অপরাধের পথ ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সুযোগ পান।
তবে এ উদ্যোগের ইতিবাচক ফল পাওয়ার পরও কিছু আত্মসমর্পণকারী অপরাধীর কয়েক বছর পর আবার দস্যুতায় ফিরে যাওয়ার প্রবণতা দেখা গেছে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এ কারণে আত্মসমর্পণকারী অপরাধীদের কার্যক্রমের ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
তিনি বলেন, যারা পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ার চেষ্টা করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি এবং কার্যকর আইনি পদক্ষেপ অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে জলদস্যু ও বনদস্যুদের তৎপরতা পুরোপুরি বন্ধ করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান ও তৎপরতা অব্যাহত থাকবে।
সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উপস্থাপিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে খুন, ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং মব সহিংসতার ঘটনায় আগের বছরের তুলনায় নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। একই সঙ্গে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা ও সহিংসতার ঘটনাও কমেছে বলে সরকার জানিয়েছে।
সালাউদ্দিন আহমদ আরও জানান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সংসদ সদস্যদের নির্দিষ্ট নোটিশ ও অনুসন্ধানের পরিপ্রেক্ষিতে সরকার প্রয়োজনীয় তথ্য ও নথিপত্র প্রস্তুত রাখছে। সংসদ সদস্যরা নির্দিষ্ট বিষয়ে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট তথ্য আরও বিস্তারিতভাবে জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হবে।
তিনি বলেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও উন্নত করতে সরকারের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাবোধ বাড়ানো সরকারের অন্যতম লক্ষ্য।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে আসা পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি-আগস্ট সময়ের তুলনায় ২০২৬ সালের একই সময়ে খুনের ঘটনা ২ হাজার ৬০৭টি থেকে কমে ২ হাজার ৩৩২টি, নারী ও শিশু নির্যাতন ১১ হাজার ২৬৯টি থেকে কমে ৯ হাজার ৩৪৭টি এবং ধর্ষণের ঘটনা ৪ হাজার ৬৬৬টি থেকে কমে ৪ হাজার ৪০২টিতে নেমেছে।
একই সময়ে মব সহিংসতার ঘটনা ৮৯টি থেকে কমে ৫৬টি এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা ও সহিংসতার ঘটনা ৯৯৯টি থেকে কমে ১৬৩টিতে দাঁড়িয়েছে। এসব পরিসংখ্যান তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির দাবি করেন।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য সংসদে তুলে ধরার সুযোগ রয়েছে বলেও জানান তিনি। সংসদ সদস্যদের নির্দিষ্ট নোটিশ, প্রশ্ন ও অনুসন্ধানের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রস্তুত করে তা জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হবে।