আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক জোরালো সামরিক হামলার উপযুক্ত জবাবে আঞ্চলিক বিভিন্ন মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলা চালিয়ে পাল্টা অভিযান পরিচালনা শুরু করেছে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী। মঙ্গলবারের এক বিশেষ বিবৃতিতে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তাদের এই শক্তিশালী পাল্টা হামলায় বিপুলসংখ্যক মার্কিন সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন।
আইআরজিসি তাদের বিবৃতিতে জানায়, তারা জর্ডানে অবস্থিত একটি প্রধান মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে অত্যন্ত ভারী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে এবং এতে বহু মার্কিন সেনা নিহত ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়েছে। তবে জর্ডানে চালানো ইরানের এই হামলায় এখন পর্যন্ত কোনও সেনা হতাহত বা মারাত্মক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি বলে পাল্টা তথ্য জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুই মার্কিন কর্মকর্তা। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স-কে তারা জানিয়েছেন, প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতেই সামরিক বাহিনীর এই মূল্যায়ন করা হয়েছে এবং ইরানের অব্যাহত হামলা বহাল থাকায় মূল পরিস্থিতি পরিবর্তিত হতে পারে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, দেশটির সামরিক বাহিনী বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতেও বড় ধরনের শক্তিশালী ড্রোন হামলা চালিয়েছে। ঠিক একই সময়ে কুয়েতের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তাদের শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দেশের আকাশসীমায় প্রবেশ করা একটি শত্রুতাপূর্ণ ড্রোন হামলা সফলভাবে মোকাবিলা করছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে সম্মিলিত হামলা চালানোর পর থেকে তেহরানও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত মার্কিন বাহিনী ও মিত্রদের লক্ষ্য করে নিয়মিত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে আসছে।
জর্ডানের সশস্ত্র সামরিক বাহিনী নিশ্চিত করেছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দেশের আকাশসীমায় অনধিকার প্রবেশ করা অন্তত ১৩টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সফলভাবে শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। এর মধ্যে ১০টি ক্ষেপণাস্ত্র মাঝপথেই ভূপাতিত করা হয়েছে এবং অবশিষ্ট তিনটি ক্ষেপণাস্ত্র লোকালয় থেকে দূরে প্রত্যন্ত জনশূন্য এলাকায় গিয়ে পড়েছে। অন্যদিকে প্রতিবেশী বাহরাইন জানিয়েছে, ইরানের কয়েকটি বিধ্বংসী ড্রোন শনাক্ত করে তা ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।
এছাড়াও আইআরজিসি আরও দাবি করেছে যে, তারা ইরাকের উত্তরাঞ্চলীয় এরবিলে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে স্থলবাহিনীর সাহায্যে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের সুসংগঠিত হামলা পরিচালনা করেছে। এতে ঘাঁটির একটি গুরুত্বপূর্ণ মেরামত কেন্দ্র, কারিগরি সরঞ্জাম রাখা কয়েকটি সুরক্ষিত গুদাম এবং মার্কিন সেনাবাহিনীর নজরদারি বেলুন পরিচালনায় ব্যবহৃত একটি উচ্চপ্রযুক্তির ব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে গেছে। সেই সাথে সামরিক ঘাঁটির কয়েকটি প্রধান জ্বালানি ট্যাংকে আগুন ধরিয়ে দেওয়া এবং কয়েকজন মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার দাবিও পুনর্ব্যক্ত করেছে আইআরজিসি। তবে ইরাক কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর আনুষ্ঠানিকভাবে এরবিলে হামলার এই বিবরণ নিশ্চিত করেনি।
দীর্ঘ ৬ মাস ধরে চলা এই সামরিক সংঘাতটি সপ্তাহান্তের হামলার আগে মূলত অর্থনৈতিক অচলাবস্থায় রূপ নিয়েছিল। কিন্তু সপ্তাহান্তে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের লারাক দ্বীপে বড় আঘাত হানার পর ইরান প্রতিশোধ হিসেবে জর্ডানে থাকা দুটি মার্কিন বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে।
এদিকে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজ-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সাথে নতুন করে কোনো চুক্তি বা যুদ্ধবিরতি হওয়ার সম্ভাবনাকে সম্পূর্ণ গুরুত্বহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। উল্লেখ্য, গত জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও ইরানের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির ওপর সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উভয় দেশের ভিন্ন ব্যাখ্যার কারণে সেটি খুব দ্রুত ভেস্তে যায়।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ফক্স নিউজ-কে স্পষ্টভাবে বলেন, ইরানের সাথে নতুন করে আর কোনো চুক্তি সই করার বাস্তবিক অর্থ নেই। তাঁর ভাষায়, এমন চুক্তি ‘যে কাগজে লেখা হবে, তার ন্যূনতম মূল্যও থাকবে না’। তিনি আরও যোগ করেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে ইতিপূর্বে বহু সুযোগ দিয়েছে।
(সূত্র: রয়টার্স, ফক্স নিউজ)