দীর্ঘদিন বিদেশে চিকিৎসা গ্রহণ শেষে দেশে ফিরে জাতীয় সংসদ অধিবেশনে যোগ দিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছেন ঢাকা-৮ আসনের সংসদ সদস্য ও বিশিষ্ট বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাস। ২০০৬ সালের পর দীর্ঘ রাজনৈতিক বিরতির পর প্রথমবারের মতো সংসদ অধিবেশনে যোগ দিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি নিজের মনের গভীর অনুভূতি প্রকাশ করেন।
৩ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে চলমান ত্রয়োদশ সংসদের অধিবেশনে প্রথমবারের মতো বক্তব্য দেন মির্জা আব্বাস। শারীরিক অসুস্থতার কারণে সংসদ অধিবেশনে হুইল চেয়ারে বসে নিজের সংক্ষিপ্ত ও আবেগপূর্ণ বক্তব্য তুলে ধরেন বিএনপির এই প্রবীণ রাজনীতিবিদ।
নিজের বর্তমান শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে মির্জা আব্বাস জানান, দীর্ঘ সাড়ে পাঁচ মাস ধরে তিনি চিকিৎসাধীন রয়েছেন। নির্বাচনের পরপরই একটি দলীয় রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে অবস্থানকালে তিনি আকস্মিকভাবে স্ট্রোক আক্রান্ত হন। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে দীর্ঘ সময় অবস্থান করতে হয়। চিকিৎসা সম্পূর্ণ শেষ না হলেও এবং শারীরিক অবস্থা পুরোপুরি সুস্থ না থাকা সত্ত্বেও নিছক ভালোবাসা, গভীর আবেগ ও সাধারণ মানুষের প্রতি মানবিক দায়বদ্ধতার কারণে তিনি আজকের অধিবেশনে উপস্থিত হয়েছেন। বক্তব্য প্রদানকালে আবেগে তার কণ্ঠ বারবার ভেঙে আসছিল।
বক্তব্যের শুরুতেই মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করেন মির্জা আব্বাস। একই সঙ্গে তিনি অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে।
তিনি অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, ২০০৬ সালের দীর্ঘ সময় পর আজ আবার এই কক্ষে একজন প্রতিনিধি হিসেবে দাঁড়িয়ে কথা বলার সুযোগ পাওয়া তার পুরো রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম আবেগপূর্ণ ও স্মরণীয় এক মুহূর্ত। এটি তার জীবনের জন্য যেমন আনন্দের, তেমনি অত্যন্ত গর্বের বিষয়।
নিজের শারীরিক অবস্থা ও চিকিৎসা সফর সংক্রান্ত স্মৃতিচারণ করে মির্জা আব্বাস বলেন, তার অসুস্থতার খবর পেয়ে জাতীয় সংসদের স্পিকার নিজে তাকে দেখতে গিয়েছিলেন। এ ছাড়া দেশের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সার্বিকভাবে প্রতিনিয়ত তার শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর রেখেছেন।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকাকালে স্পিকারের এমন সৌজন্যমূলক আচরণ তাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি কেবল একজন অসুস্থ সহকর্মীর প্রতি সাধারণ সমবেদনা ছিল না, বরং তা ছিল আমাদের দেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের এক অপূর্ব ও মানবিক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। রাষ্ট্রীয় শীর্ষ ব্যক্তিদের এই আন্তরিকতা ও ভালোবাসা তিনি কোনোদিন ভুলবেন না।
সংসদীয় রাজনীতির মূল চেতনা ও প্রকৃত দর্শন পুনর্ব্যক্ত করে মির্জা আব্বাস স্পষ্ট করে বলেন, আজ এই সংসদে ফিরে এসে তার মনে হচ্ছে রাজনীতি কেবল দলীয় পার্থক্য বা রাজনৈতিক সংঘাতের বিষয় নয়; রাজনীতি মূলত সাধারণ মানুষের কল্যাণ ও সেবা করার অন্যতম পথ। সংসদ কোনো নেহাত বিতর্কের মঞ্চ নয়, এটি সমগ্র গণমানুষের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানোর পবিত্রতম স্থান।
তিনি আরও আশা প্রকাশ করে বলেন, আল্লাহ তাআলা যেন তাকে দ্রুত পূর্ণ সুস্থতা দান করেন যাতে নিজের নির্বাচনী এলাকা তথা সমগ্র বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জন্য জীবনের বাকি সময়টুকু নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে কাজ করে যেতে পারেন।
বক্তব্যের শেষ অংশে তিনি তাকে দেখতে যাওয়া, শারীরিক খোঁজখবর নেওয়া এবং অসুস্থতার কঠিন দিনগুলোতে যার যার অবস্থান থেকে দোয়া ও প্রার্থনা করা সমস্ত সহকর্মী সংসদ সদস্য, রাজনৈতিক সহযোদ্ধা এবং দেশবাসীর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
মির্জা আব্বাস শেষান্তে বলেন, দীর্ঘ ব্যবধানের পর আজ আবার সংসদে দাঁড়িয়ে তিনি দেশবাসীর কাছে কেবল একটি কথাই বলতে চান, মানুষের সেবায় এবং প্রিয় বাংলাদেশের সমৃদ্ধির স্বার্থে কাজ করতেই তিনি আবার ফিরে এসেছেন। দেশ ও জাতির সেবায় যেন নিজের জীবনের বাকি সময়টুকু সম্পূর্ণ আত্মনিয়োগ করতে পারেন, সেজন্য দলমত নির্বিশেষে দেশের সকল মানুষের কাছে দোয়া প্রার্থনা করেন তিনি।