ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
শত কোটি টাকার সম্পদ, রিট ফাইল চেপে রাখা ও প্রশাসনের নীরবতার অভিযোগ রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও চাঁদাবাজি কঠোর হাতে দমন করা হবে: আইনমন্ত্রী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় চায় বাংলাদেশ: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ডেঙ্গুতে আরও ৬ প্রাণহানি, এক দিনে হাসপাতালে ১৫৬১ জন ভর্তি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে: রাষ্ট্রপতি আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ: দুদক ‘বারবার মিথ্যা মামলা না দিয়ে আমাকে একবারে গুলি করে মেরে ফেলেন’ ২১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে বিনিয়োগে আগ্রহী মার্কিন কোম্পানি শেভরন পাবনায় ডিবির ওসির প্রত্যাহারে সাংবাদিকদের ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম

দুর্গম বান্দরবানে সুরের জোয়ার, গিটার শিখছে পাহাড়ি-বাঙালি শিশু-কিশোররা


  • আপলোড সময় : শনিবার ০৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সময় : ১:১৩ পিএম

পাহাড়ের আঁকাবাঁকা আঁকাবাঁকা মেঠো পথ, চারিদিকের গাঢ় সবুজ প্রকৃতি এবং সাঙ্গু নদীর অবিরাম কলকল ধ্বনির সাথে এখন যুক্ত হয়েছে গিটারের এক মধুর মূর্ছনা। দেশের দুর্গম পাহাড়ি জেলা বান্দরবানে সময়ের সাথে সাথে শিশু-কিশোর তরুণদের মধ্যে সংগীতচর্চার এক অভূতপূর্ব জাগরণ তৈরি হয়েছে। পাহাড়ের বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর পাশাপাশি স্থানীয় বাঙালি শিশুরাও গিটারের সুরে নিজেদের সৃজনশীল প্রতিভাকে বিকশিত করার অনন্য সুযোগ পাচ্ছে।

 

বান্দরবানের এই সংগীত বিপ্লবের মূল কাণ্ডারি স্থানীয় সংগীতশিল্পী গিটার শিক্ষক বমরাম আমলাই। তাঁর হাত ধরে কয়েক বছর আগে মাত্র একজন শিক্ষার্থী একটি পুরনো গিটার নিয়ে যে কণ্টকাকীর্ণ যাত্রার সূচনা হয়েছিল, সময়ের বিবর্তনে তা- আজ নিয়মিত গিটার প্রশিক্ষণ উদ্যোগে রূপ লাভ করেছে।

 

বর্তমানে বান্দরবান শহরের উজানিপাড়ায় অবস্থিত উপজাতীয় নবোদয় সংঘ ভবনেবেসিক গিটার লার্নিং সেন্টারপরিচালিত হচ্ছে। প্রতি সপ্তাহে একাধিক ব্যাচে এখানে পাহাড়ি-বাঙালি শিশু-কিশোরদের গিটার বাজানো শেখানো হয়। বর্তমানে এই সংস্থায় অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী নিয়মিত প্রশিক্ষণ নিচ্ছে।

 

প্রশিক্ষণকেন্দ্রটির ইতিহাস বেশ চমকপ্রদ। ২০১৭ সালে মাত্র এক জন ছাত্রকে গান শেখানোর মধ্য দিয়ে আমলাই শিক্ষকতার জীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে একটি ছোট্ট ভাড়া করা ঘর এবং মাত্র একটি গিটার নিয়ে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ শুরু করেন। শুরুর দিকে গিটারে সংকট থাকায় তিন-চারজন শিক্ষার্থীকে একটিমাত্র গিটার ভাগাভাগি করে অনুশীলন চালাতে হতো।

 

ধীরে ধীরে প্রার্থীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় একটি সুসংগঠিত কাঠামো গড়ে ওঠে। বর্তমানে লার্নিং সেন্টারে গিটারের মৌলিক বিষয়াবলী, কর্ড, স্ট্রামিং, কর্ড প্রগ্রেশন, সরগম প্রাথমিক ভোকাল নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি আধুনিক সাউন্ড সিস্টেম ব্যবহারের কলাকৌশলও শেখানো হচ্ছে। বমরাম আমলাই মনে করেন, গিটার শেখা কেবল একটি বাদ্যযন্ত্র বাজানোতেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি তরুণদের মনে ধৈর্য, একগ্রতা, অধ্যবসায় দলবদ্ধ হয়ে কাজ করার মানসিকতা গড়ে তোলে।

 

সম্প্রতি এই উদ্যোগটির একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে পাহাড়ি শিশুদের এই সুরের জাদু নতুন মাত্রা লাভ করে। জনপ্রিয় ব্যান্ড লেভেল ফাইভ (Level Five)-এর জনপ্রিয় গানতুমিপরিবেশন করে শিক্ষার্থীরা। গিটারের মনমুগ্ধকর সুর পাহাড়ি শিশুদের দরদী কণ্ঠের সেই ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে ১০ লাখেরও বেশি ভিউ অর্জন করে।

 

সামাজিক মাধ্যমে সাড়া জাগানো ছাড়াও এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা বেশ কয়েকটি বড় মঞ্চেও সফল পরিবেশনা শেষ করেছে। জাতীয় সংসদ ভবন কমপ্লেক্সের সাংস্কৃতিক আয়োজনের পাশাপাশি দেশের অন্যতম শীর্ষ জনপ্রিয় রক ব্যান্ড ওয়ারফেজ (Warfaze)-এর সাথে একই মঞ্চে গিটার বাজিয়ে পারফর্ম করেছে আমলাইয়ের শিক্ষার্থীরা।

 

শিক্ষক বমরাম আমলাইয়ের নিজের জীবনের পথচলাও কম লড়াইয়ের ছিল না। শৈশবে রোয়াংছড়ির বেংছড়ি মুনথার বম পাড়ায় চার্চের অনুষ্ঠান গ্রামের মানুষদের গিটার বাজানো দেখে অনুপ্রাণিত হন তিনি। চতুর্থ-পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ার সময় অন্যের গিটার চেয়ে নিয়ে প্রাথমিক শেখা শুরু। পরবর্তীতে মারমা শিল্পী গোষ্ঠীর সভাপতি চথুই প্রু স্যারের সান্নিধ্যে ২০০৫ সালে বেজ গিটার শেখেন এবং ২০০৭ সাল থেকে স্থানীয় ব্যান্ড চিম্বুক-এর বেজ গিটারিস্ট হিসেবে নিয়মিত বাজিয়ে আসছেন।

 

দুর্গম পার্বত্য এলাকায় কাঠের গিটার এর আনুষঙ্গিক যন্ত্রাংশ সংগ্রহ অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এছাড়া বান্দরবানের আর্দ্র আবহাওয়ার কারণে কাঠের বাদ্যযন্ত্র স্ট্রিং দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। বর্ষাকালে দূরদূরান্তের পাহাড়ি গ্রাম থেকে শিশুদের নিয়ে আসার কষ্টও অনেক। তবুও থামেনি এই উদ্যোগ।

 

আমলাইয়ের মূল লক্ষ্য, পাহাড়ি শিশুদের মোবাইল আসক্তি, অনলাইন জুয়া মাদকের মতো সামাজিক ব্যাধি থেকে দূরে রাখা। ভবিষ্যতে একটি পূর্ণাঙ্গ স্থায়ী মিউজিক একাডেমি গড়ার স্বপ্ন দেখেন তিনি, যেখানে পিয়ানো, ড্রামস, গান লেখা মিউজিক কম্পোজিশনের পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা থাকবে; যেন পাহাড়ের নিজস্ব সুর ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বজুড়ে।

 


এ সম্পর্কিত আরো খবর