আব্দুস সালাম, দিনাজপুর প্রতিনিধি :
দিনের আলোয় কড়া পাহারা থাকলেও অন্ধকার নামলেই উধাও হয়ে যাচ্ছে রেললাইনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা সরঞ্জাম। উত্তরাঞ্চলের অন্যতম ব্যস্ত চিলাহাটি-পার্বতীপুর-বিরামপুর রুটে এখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সংঘবদ্ধ চোরচক্র। চোরদের তাণ্ডবে রেললাইনের সংযোগস্থলগুলো মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ায় যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের ট্রেন দুর্ঘটনার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। চরম ঝুঁকিতে দিন কাটাচ্ছেন হাজার হাজার ট্রেনযাত্রী।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পার্বতীপুর-বিরামপুর ও পার্বতীপুর-চিলাহাটি রুটের প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকার অবস্থা বর্তমানে সবচেয়ে নাজুক। সম্প্রতি এসব এলাকা থেকে প্রায় ৭ হাজার প্যান্ড্রল ক্লিপ, ফিস বোল্ট ও ফিসপ্লেট চুরির মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে। ঢাকা-পার্বতীপুর-বিরামপুর রুটে গত এক বছরে কেবল রেল সরঞ্জাম হারিয়ে রেলওয়ের আনুমানিক ১৪ লাখ ৭০ হাজার টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে সর্বশেষ ২৫ আগস্ট রাতে পার্বতীপুরের ভবানীপুর রেলস্টেশনের সরকারি গোডাউনের তালা ভেঙে প্রায় ২ লাখ ৮৬ হাজার টাকা মূল্যের ক্লিপ, বোল্ট, হাতুড়ি ও শাবলসহ নানা মালামাল চুরি করে নিয়ে যায় চোরচক্র।
দিনে ওয়েম্যান ও মিস্ত্রিদের দল রেললাইনে পাহারা দিলেও পর্যাপ্ত লোকবলের অভাবে রাতের বেলা পুরো রুট প্রায় অরক্ষিত থেকে যাচ্ছে। পার্বতীপুর-বিরামপুর ৮ কিলোমিটার রুটে সকাল ৭টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত একজন মিস্ত্রির নেতৃত্বে ১১ সদস্যের ওয়েম্যান দল পাহারা দেয়, তবে রাতে পাহারা দেওয়ার মতো কোনো লোকবল নেই। অন্যদিকে পার্বতীপুর-চিলাহাটি ৭ কিলোমিটার রুটে ৮ সদস্যের একটি দল দিনে পাহারা দিচ্ছে, কিন্তু একই লোকবলকে অন্যান্য কাজের চাপও সামলাতে হয়। এ ছাড়া মধ্যপাড়া পাথরখনি-ভবানীপুর ১৩ কিলোমিটার রুটে রাতে পাহারার জন্য ২০ থেকে ২৫ জন কর্মী নিয়োজিত থাকেন। ফলে এই একই লোকবল দিয়ে দিনের বেলা মেইন রেললাইনের পাহারার কাজ চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে।
রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন উপ-সহকারী প্রকৌশলী (পিডব্লিউআই) শেখ আল আমিন জানান, জনবল বাড়ানোর জন্য বারবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হলেও এখনো কার্যকর কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। একই লোকবল দিয়ে সব জায়গায় দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে মেইন লাইনের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
অন্যদিকে, পার্বতীপুর রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহমুদ উন নবী জানান, তিনি নতুন যোগ দেওয়ার পর চুরির বিষয়ে থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ পাননি। এমন ঘটনা নিয়মিত ঘটলেও থানায় কেন লিখিত অভিযোগ করা হচ্ছে না তা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। চুরি যাওয়া মালামালের তথ্য গোপন রাখা হচ্ছে নাকি আইনি পদক্ষেপ নিতে চরম অবহেলা করা হচ্ছে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে নানা প্রশ্ন উঠছে।
স্থানীয় জনগণের মতে, প্যান্ড্রল ক্লিপ ও ফিসপ্লেট কেবল সাধারণ লোহার টুকরো নয়, এগুলো রেললাইনের কাঠামোগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। অবিলম্বে রাতের পাহারা জোরদার, সংঘবদ্ধ চোরচক্র ও চোরাই মালের ক্রেতাদের শনাক্ত করে সমন্বিত তদন্ত না করা হলে এই রুটে বড় ধরনের ট্র্যাজেডি এড়ানো অসম্ভব হয়ে পড়বে।