সন্তানদের নামে সম্পত্তি লিখে দেওয়ার পর শেষ বয়সে মা-বাবার গৃহহীন কিংবা অসহায় হয়ে পড়ার ঘটনা দেশের নানা প্রান্তে মাঝেমধ্যেই সংবাদের শিরোনাম হয়। বরিশালের গৌরনদীর হালিমা বেগমের মতো বহু বৃদ্ধ মা-বাবাকে জমি লিখে দেওয়ার পর স্বজনদের অবহেলার শিকার হতে হয়েছে। এমনই প্রেক্ষাপটে দেশের জ্যেষ্ঠ নাগরিকদের আইনি সুরক্ষা দিতে ১৮৮২ সালের দ্য ট্রান্সফার অব প্রোপার্টি বা সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে একটি নতুন ও বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে সরকার। আইনটি পাসের পর দেশের বিশিষ্ট আইনবিদ, গবেষক ও মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, সংশোধিত এই আইনটি বৃদ্ধ বয়সে মা-বাবাকে সামাজিক ও মানসিকভাবে শক্তিশালী নিরাপত্তা প্রদান করবে।
জাতীয় সংসদে পাস হওয়া দ্য ট্রান্সফার অব প্রোপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিলে যুক্ত হওয়া নতুন দুটি ধারা অনুযায়ী, এখন থেকে কোনো ব্যক্তি নিজের রক্তসম্পর্কের স্বজন কিংবা স্বামী বা স্ত্রীকে স্থাবর সম্পত্তি দান করার পরও নিজের জীবদ্দশা পর্যন্ত তা স্বাচ্ছন্দ্যে ভোগ করার পূর্ণ আইনি অধিকার নিজের কাছেই বজায় রাখতে পারবেন। আইনটির নতুন সংযোজিত ১২২ (ক) ধারায় পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত সম্পত্তির ভোগাধিকার তাঁর নিজের কাছেই সংরক্ষিত থাকবে। এমনকি দাতা জীবিত থাকা অবস্থায় যদি সম্পত্তি গ্রহণকারী গ্রহীতার মৃত্যু হয়, তবে আইন অনুযায়ী সম্পত্তি গ্রহীতার উত্তরাধিকারীদের কাছে হস্তান্তর হলেও দাতার আজীবন ভোগাধিকার সম্পূর্ণ বহাল থাকবে।
অন্য দিকে ১২২ (খ) ধারায় বলা হয়েছে, কোনো সম্পত্তি নিবন্ধনের মাধ্যমে দান করার পর তা সাধারণভাবে আর বাতিল বা ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে না। তবে দাতার কোনো সত্যিকারের ও অত্যন্ত জরুরি প্রয়োজন, যেমন চিকিৎসা, আর্থিক সংকট, শিক্ষা কিংবা বড় কোনো পারিবারিক প্রয়োজন মেটানোর স্বার্থে নির্ধারিত আইনি শর্ত পূরণ সাপেক্ষে ওই দান বাতিল কিংবা পরিবর্তন করার অধিকার দাতার হাতেই রাখা হয়েছে। এতে করে প্রতারণামূলক উপায়ে বয়স্ক ব্যক্তিদের কাছ থেকে জমি লিখে নেওয়ার মতো দেওয়ানি জালিয়াতি ও মামলা অনেকাংশে হ্রাস পাবে বলে আইনজীবীরা অত্যন্ত ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন।
আইনবিদ ও মানবাধিকার গবেষকদের মতে, এটি দেশের সব ধর্মের ও সব শ্রেণির নাগরিকদের জন্য সমভাবে প্রযোজ্য একটি যুগান্তকারী নাগরিক সুরক্ষা বিধান। এই সংশোধনের ফলে প্রচলিত মুসলিম আইনের হেবা বা সাধারণ দানের বিদ্যমান বিধানে কোনো ব্যাঘাত ঘটবে না কিংবা অন্য কোনো ধর্মীয় বিধানের সঙ্গে কোনো বৈপরীত্য তৈরি হবে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞরা মন্তব্য করেছেন, আইনটির মূল লক্ষ্য হচ্ছে শেষ বয়সে প্রবীণদের চরম অসহায়ত্ব থেকে আইনি প্রক্রিয়ায় মুক্তি দেওয়া। সন্তানদের কাছে জায়গা জমি হস্তান্তরের পরও বাবা-মায়ের থাকার ও জীবনধারণের নিশ্চিন্ত ব্যবস্থা তৈরি করাই এই আইনটির প্রধান উদ্দেশ্য।
দেশের প্রবীণ জনগোষ্ঠীর পরিসংখ্যানের কথা বিবেচনা করলে দেখা যায়, বর্তমানে দেশে ৬০ বছরের বেশি বয়সী নাগরিকের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৫৩ লাখের ওপর, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯ দশমিক ২৮ শতাংশ। দেশের এই বিশাল অংশের মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা দূর করতে আইনটির প্রয়োজনীয়তা ছিল অপরিসীম। নারীবিষয়ক বিভিন্ন সংস্থার পক্ষ থেকেও এই আইনি পরিবর্তনকে প্রবীণদের এবং বিশেষভাবে অসহায় নারীদের শেষ বয়সের অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে সরকারের একটি সাহসী ও অত্যন্ত দূরদর্শী আইনি উদ্যোগ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।