আন্তর্জাতিক ডেস্ক
বিশ্ব ভূরাজনীতি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি করে ইরান ও রাশিয়ার অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক পুরোপুরি অবরুদ্ধ করা এবং দেশ দুটির ওপর সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞা আরোপের লক্ষ্যে একটি কঠোর ও নজিরবিহীন বিল পাস করেছে যুক্তরাষ্ট্রের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদ। প্রয়াত প্রভাবশালী মার্কিন সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের স্মৃতি ও রাজনৈতিক অবদানের প্রতি সম্মান জানিয়ে এই আইনটির আনুষ্ঠানিক নামকরণ করা হয়েছে ‘দ্য লিন্ডসে ও গ্রাহাম স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট অব ২০২৬’।
প্রতিনিধি পরিষদে অনুষ্ঠিত চূড়ান্ত ভোটাভুটিতে বিলটির পক্ষে ২৬২ জন আইনপ্রণেতা তাদের রায় প্রদান করেন, আর বিপক্ষে ভোট দেন ১৫৯ জন সদস্য। আন্তর্জাতিক প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা বৃহস্পতিবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে ওয়াশিংটনের এই গুরুত্বপূর্ণ আইনি ও রাজনৈতিক পদক্ষেপের খবর নিশ্চিত করেছে।
পার্লামেন্টে অনুমোদিত এই ঐতিহাসিক বিলের প্রধান লক্ষ্য হলো বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ইরান ও রাশিয়ার অর্থনৈতিক লেনদেন এবং আন্তর্জাতিক পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেওয়া। মার্কিন প্রশাসনকে দুই দেশের ওপর কঠোর বাণিজ্য শুল্ক বসানোর বিস্তৃত এখতিয়ার প্রদান করাই এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য। বিলটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উত্থাপন ও প্রণয়ন করেছিলেন স্বয়ং সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম।
নিম্নকক্ষে পাসের বেশ কিছুদিন আগেই গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ সিনেটে এটি বিপুল সমর্থন নিয়ে অনুমোদিত হয়েছিল। সিনেটে অনুষ্ঠিত ভোটাভুটিতে বিলটির পক্ষে ৮৬ জন সিনেটর ভোট প্রদান করেন এবং প্রস্তাবের বিপক্ষে অবস্থান নেন মাত্র ১১ জন সিনেটর। মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষে সর্বসম্মতিক্রমে ও সফলভাবে পাস হওয়ার পর প্রস্তাবিত বিলটি এখন মার্কিন প্রেসিডেন্টের সরকারি কার্যালয় হোয়াইট হাউসে পাঠানো হয়েছে। সেখানে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে বিলে স্বাক্ষর করা মাত্রই এটি কার্যকর ও পূর্ণাঙ্গ মার্কিন আইনে রূপ নেবে।
অনুমোদিত এই নতুন বিলটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের পুরনো একটি বৃহৎ পররাষ্ট্রনীতি সংক্রান্ত আইনের মেয়াদ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে। ১৯৯৬ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের স্বাক্ষরের মাধ্যমে জারি হওয়া ঐতিহাসিক ‘ইরান স্যাংশনস অ্যাক্ট’-এর সময়সীমা বর্ধিতকরণের প্রস্তাব এই বিলে যুক্ত রয়েছে।
পূর্ববর্তী আইন অনুযায়ী চলতি ২০২৬ সালেই ওই নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে নতুন গৃহীত আইনি ব্যবস্থার ফলে সেই সময়সীমা আরও বাড়িয়ে আগামী পাঁচ বছরের জন্য পূর্ণ কার্যকর রাখা নিশ্চিত করা হলো, যা মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের অর্থনৈতিক তৎপরতা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর আমেরিকার দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ অক্ষুণ্ণ রাখবে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদে বিলটি পাসের সময় দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও বেশ কিছুটা নজিরবিহীন মেরুকরণ লক্ষ করা গেছে। ভোটাভুটি চলাকালে বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির বেশ কয়েক ডজন আইনপ্রণেতা তাঁদের দলীয় রাজনৈতিক অবস্থান ও মতাদর্শ থেকে সরে দাঁড়ান। তাঁরা মার্কিন পার্লামেন্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ রিপাবলিকান পার্টির সদস্যদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে প্রস্তাবিত বিলটির সমর্থনে সরাসরি ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন।
ফলে ওয়াশিংটনের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলই যে বহির্বিশ্বে রাশিয়া ও ইরানের বিরুদ্ধাচরণে একাট্টা, সেই স্পষ্ট বার্তা ফুটে উঠেছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আল-জাজিরা প্রকাশিত এই খবর বিশ্ব বাণিজ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলার পাশাপাশি রাশিয়া ও ইরানের সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের সম্পর্ককে আরও জটিল ও উদ্বেগজনক পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেবে।