রাজধানীর কূটনৈতিক এলাকা বারিধারায় প্রাইভেট কারচাপায় এক অসহায় নির্মাণশ্রমিক নিহতের মর্মান্তিক ঘটনায় আইনি লড়াই নতুন মোড় নিয়েছে। আলোচিত এই মামলায় অভিযুক্ত কিশোরের জামিন আবেদন আদালত সরাসরি খারিজ করে দিয়েছেন। বিচারক স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে, বিত্তশালী বা অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার সুবাদে কেউ অপরাধ করে পার পেয়ে গেলে সমাজে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং অপরাধ প্রবণতা আরও বৃদ্ধি পাবে।
রোববার (৪ অক্টোবর) ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৮-এর বিচারক মো. আব্দুল মোক্তাদির অত্যন্ত কঠোর ও দূরদর্শী অবস্থান নিয়ে এই জামিন নামঞ্জুরের আদেশ প্রদান করেন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ শরীফ উদ্দীন মামুন আদালতের এই আদেশের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এর আগে গত ২৪ সেপ্টেম্বর একই আদালত অভিযুক্ত কিশোরকে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন।
ঘটনার সূত্রপাত ঘটে গত ২৩ সেপ্টেম্বর বিকেলে। বারিধারা ডিপ্লোমেটিক জোনের ১ নম্বর সড়কে ফুটপাতে বসে ক্লান্তি দূর করতে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন ২৪ বছর বয়সী নির্মাণশ্রমিক মেহেদী হাসান। তাঁর গ্রামের বাড়ি নীলফামারীর ডোমার উপজেলার সোনারায় গ্রামে। ঠিক সেই মুহূর্তে একটি বেপরোয়া গতির প্রাইভেট কার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সোজা ফুটপাতে উঠে পড়ে। গাড়ির নির্মম চাকায় পিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলেই মর্মান্তিক মৃত্যু হয় মেহেদীর। দুর্ঘটনার পরপরই স্থানীয় জনতা ক্ষোভে ফেটে পড়ে এবং গাড়ির চালকের আসনে বসা ওই কিশোরকে হাতেনাতে আটক করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করে।
তবে প্রাথমিক পর্যায়ে পুলিশ তাকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দিলে তীব্র সমালোচনার ঝড় ওঠে। পরবর্তীতে সিসিটিভি ফুটেজ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করে কিশোরের সরাসরি সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করার পর পুলিশ তাকে আবার হেফাজতে নেয় এবং শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠায়। নিহত মেহেদীর ভাই মোক্তাদির ইসলাম এ ঘটনায় গুলশান থানায় একটি মামলা দায়ের করেন, যেখানে আকাশ মারক (৪৪) নামের এক ব্যক্তিকে গাড়িচালক হিসেবে প্রধান আসামি করা হয়।
আজ রোববারের উচ্চতর শুনানিতে অভিযুক্ত কিশোরের পক্ষে জামিন আবেদন করেন প্রবীণ আইনজীবী গোলাম মোস্তফা খান। আদালতে তিনি দাবি করেন, ঘটনার দিন চালক কৌশলে বাঁ পাশ দিয়ে বের হয়ে গিয়েছিলেন এবং এই শিশুটি সম্পূর্ণ নির্দোষ। তিনি আরও জানান, এই মামলার আইনি বিধান অনুযায়ী সর্বোচ্চ তিন বা পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা হতে পারে, যা তারা ইতিমধ্যে ক্ষতিপূরণ হিসেবে ভুক্তভোগী পরিবারকে বুঝিয়ে দিয়েছেন। এমনকি বাদীর পরিবারের পক্ষ থেকেও আদালতে উপস্থিত হয়ে জামিনে কোনো আপত্তি না থাকার কথা জানানো হয়েছে। আইনজীবী উল্লেখ করেন, অভিযুক্ত কিশোর ইতোমধ্যে ১২ দিন ধরে কারা হেফাজতে বা হাজতবাস করছে।
রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি মোহাম্মদ শরীফ উদ্দীন মামুন এই জামিন আবেদনের তীব্র বিরোধিতা করে আদালতকে জানান যে, এটি একটি অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর ও গুরুতর অপরাধ। তাছাড়া অভিযুক্তের বয়স কম হলেও তার গাড়ি চালানোর কোনো ধরনের বৈধ লাইসেন্স ছিল না। এ সময় বিচারক মো. আব্দুল মোক্তাদির আসামিপক্ষের আইনজীবীকে প্রশ্ন করেন, একটি শিশুর কি আইনগতভাবে ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকার কথা?
উভয় পক্ষের আইনজীবীদের দীর্ঘ যুক্তিতর্ক ও পর্যালোচনার পর বিচারক তাঁর তাৎপর্যপূর্ণ পর্যবেক্ষণে বলেন, সিসিটিভি ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজে পরিষ্কার ফুটে উঠেছে যে সে কীভাবে গাড়িটি নিয়ে বেরিয়ে এসেছে। এই মুহূর্তে যদি তাকে জামিন দেওয়া হয়, তবে জনমানসে এই বার্তা যাবে যে বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালিয়ে মানুষ হত্যা করেও সহজেই ছাড়া পাওয়া সম্ভব। বিচারক ক্ষোভ প্রকাশ করে আরও বলেন, এ ধরনের ঘটনাকে বিন্দুমাত্র প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। যদি ছাড় দেওয়া হয়, তবে সমাজের বিত্তশালী ও শিশুরা আইন এবং বিচার ব্যবস্থাকে অত্যন্ত সহজ ও তুচ্ছ ভাবার সুযোগ পাবে। শেষ পর্যন্ত সমস্ত যুক্তি খণ্ডন করে আদালত অভিযুক্ত কিশোরের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেন।