সরকারের সঙ্গে দফায় দফায় উচ্চপর্যায়ের দীর্ঘ বৈঠক ও আলোচনা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হওয়ার পর অবশেষে পাকিস্তানের কারাবন্দী সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সুচিকিৎসা এবং নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে কঠোর ও অনমনীয় অবস্থানে গেছে তার দল পাকিস্তান তেহরিক-ইন-ইনসাফ (পিটিআই)। সরকারের সঙ্গে সমঝোতার সমস্ত রাজনৈতিক পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পূর্বঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী এবার চূড়ান্তভাবে রাজপথে নেমেছে দলটি। রাজধানী ইসলামাবাদের অভিমুখে ব্যাপক শোডাউন ও সুশৃঙ্খল লংমার্চ শুরু করেছেন পিটিআইয়ের ক্ষুব্ধ ও চনমনে নেতাকর্মীরা।
গত শনিবার বিকেলে শুরু হওয়া সরকার ও পিটিআইয়ের মধ্যকার সংকট নিরসনের এই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা দীর্ঘ সময় ধরে চলে এবং রোববার সকাল পর্যন্ত গড়ায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দুই পক্ষের চরম অনড় অবস্থানের কারণে আলোচনা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়ে ভেস্তে যায়। আলোচনা ভেঙে যাওয়ার মূল কারণ হিসেবে জানা গেছে, পিটিআই নেতারা দলের প্রতিষ্ঠাতা প্রধান ও কারাবন্দী নেতা ইমরান খানের সঙ্গে তাৎক্ষণিকভাবে যোগাযোগ করার সুযোগ এবং শারীরিক অসুস্থতার কথা বিবেচনায় এনে তাকে দ্রুত উন্নত হাসপাতালে স্থানান্তরের দাবি জোরালোভাবে উত্থাপন করেছিলেন। ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের মাধ্যমে তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিশ্চিত করা এবং তার তিন আটক বোন ও স্ত্রী বুশরা বিবির পর্যাপ্ত চিকিৎসা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার দাবিও জানানো হয়। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে একতরফাভাবে শর্ত দেওয়া হয় যে, পিটিআইকে আগে লংমার্চের কর্মসূচি স্থায়ীভাবে বাতিল করতে হবে, এরপরই কেবল ইমরান খানের সঙ্গে দেখা করার বিষয়ে আলোচনা করা হতে পারে। তবে পিটিআই দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে জানিয়ে দেয় যে, তাদের শীর্ষ নেতার সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ বা তার সুচিকিৎসার সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা না পাওয়া পর্যন্ত তারা কোনোভাবেই লংমার্চ কর্মসূচি থেকে পিছপা হবে না।
আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পরপরই রোববার স্থানীয় সময় দুপুর দেড়টা থেকে রাজধানী ইসলামাবাদের উদ্দেশ্যে চূড়ান্ত লংমার্চ শুরু করে পিটিআই। পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশ, শহর ও দূরদূরান্তের অঞ্চল থেকে ছুটে আসা হাজার হাজার নেতাকর্মী ও সমর্থক এই লংমার্চে অংশ নিচ্ছেন। দেশের নানা প্রান্তে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে পথসভা ও যাত্রাবিরতি করে আগামী ৮ অক্টোবর ইসলামাবাদে পৌঁছানোর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে দলটির। এর আগে গত ২৭ সেপ্টেম্বর এই লংমার্চের প্রাথমিক তারিখ নির্ধারিত থাকলেও রাজধানীতে ব্যাপক পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েনের কারণে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কায় তা স্থগিত করে ৪ অক্টোবর পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছিল। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইসলামাবাদ প্রশাসন রাজধানীজুড়ে নজিরবিহীন নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলেছে। এমনকি যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি ও দাঙ্গা পরিস্থিতি সামাল দিতে শহরের সমস্ত সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোকে আগে থেকেই সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর দমনপীড়নের আশঙ্কাকেই মূলত বাড়িয়ে দিয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০২৩ সাল থেকে ৭৩ বছর বয়সী প্রবীণ রাজনীতিক ও পাকিস্তানের জনপ্রিয় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বিভিন্ন দুর্নীতি ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাতের অভিযোগে দীর্ঘ কারাবাস ভোগ করছেন। বর্তমানে তাকে রাওয়ালপিন্ডির একটি অত্যন্ত কঠোর নিরাপত্তা সংবলিত হাই-সিকিউরিটি কারাগারে বন্দি রাখা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে তার সঠিক চিকিৎসা না হওয়া এবং দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রাখার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে পিটিআই। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের সঙ্গে এই তীব্র সংঘাত এবং রাজপথের লংমার্চ কর্মসূচি পাকিস্তানের সামগ্রিক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে নতুন করে চরম সংকটের মুখে ফেলে দিয়েছে।
সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে