দেশের গণমাধ্যম খাতকে শৃঙ্খলিত করার কিংবা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব করার কোনো ধরনের অপপ্রয়াস বা মানসিকতা বর্তমান সরকারের নেই বলে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে জানিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী আন্দালিভ রহমান। সোমবার সচিবালয়ে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের নিজ দপ্তরে বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার সারাহ কুকের সঙ্গে এক সৌজন্য সাক্ষাতকালে তিনি এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন। বৈঠকে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে গণমাধ্যমের সার্বিক স্বাধীনতা সুরক্ষার দৃঢ় প্রত্যয় পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।
সাক্ষাৎকালে ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করায় মন্ত্রী আন্দালিভ রহমানকে উষ্ণ অভিনন্দন জানান এবং তার মেয়াদে দুই দেশের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও সহযোগিতা আরও সুদৃঢ় হওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেন। এ সময় বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী। দীর্ঘ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ আলোচনায় দেশের বর্তমান গণমাধ্যম পরিস্থিতি, মুক্ত সাংবাদিকতার পরিবেশ এবং তথ্যপ্রযুক্তির যুগে সংবাদমাধ্যমের দায়িত্বশীলতা ও নৈতিকতা নিয়ে বিস্তারিত মতবিনিময় হয়।
বৈঠকের মূল আলোচনায় তথ্যমন্ত্রী আন্দালিভ রহমান স্পষ্ট করে জানান যে, বর্তমান গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে স্বাধীন সাংবাদিকতার পথকে মসৃণ ও উন্মুক্ত করতে সরকার সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে। সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি একটি সুস্থ, স্বচ্ছ ও সত্যনিষ্ঠ সমাজ গঠনে সরকার সম্পূর্ণ বদ্ধপরিকর। তবে একই সঙ্গে তিনি অত্যন্ত জোরালোভাবে উল্লেখ করেন যে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার আড়ালে সমাজে যাতে কোনো ধরনের অপতথ্য, গুজব বা অসত্য সংবাদ জনমনে বিভ্রান্তি ছড়াতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক ও সচেতন থাকতে হবে। বিশেষ করে মূলধারার গণমাধ্যম এবং ডিজিটাল সোশ্যাল মিডিয়ায় মানহানিকর, কুৎসা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার রোধে কার্যকর ও কঠোর আইনি ও সামাজিক পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার ওপর তিনি বিশেষ জোর দেন।
এ প্রসঙ্গে তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী তার বক্তব্যে বলেন, গণমাধ্যমের অবাধ স্বাধীনতার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। এই দুটির মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় রেখেই রাষ্ট্রীয় নীতি ও পরিকল্পনা নির্ধারিত হচ্ছে। তিনি আরও জানান, গণমাধ্যম নীতিমালা এবং এর সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সকল অংশীজনের সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের ধারাবাহিক ও নিয়মিত মতবিনিময় কার্যক্রম অত্যন্ত সফলভাবে চলমান রয়েছে। সাংবাদিকদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে সরকারের তরফ থেকে ইতিমধ্যে বিভিন্ন যুগোপযোগী উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, কেবল রাষ্ট্রীয় পর্যায় নয়, বরং সংবাদকর্মীদের আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার এই মহৎ উদ্যোগে গণমাধ্যমের মালিকপক্ষ ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকেও অত্যন্ত দায়িত্বশীল ও মানবিক ভূমিকা পালন করতে হবে।
অন্যদিকে, ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক বাংলাদেশের সাংবাদিকতা অঙ্গনের সার্বিক পরিস্থিতির প্রশংসা করে বলেন, মুক্ত ও স্বাধীন গণমাধ্যমচর্চা যেকোনো শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি। মতপ্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সংবাদকর্মীদের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রেখে বস্তুনিষ্ঠ ও নৈতিক সাংবাদিকতা চর্চা করা উচিত। বর্তমান ডিজিটাল যুগে ভুল তথ্য ও অপপ্রচারের ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শক্তিশালী ফ্যাক্ট-চেকিং বা তথ্য যাচাইকরণ ব্যবস্থার ওপর তিনি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। হাইকমিশনার জানান, যুক্তরাজ্যের মর্যাদাপূর্ণ অফিস অব কমিউনিকেশনস (অফকম) এবং বাংলাদেশের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের মধ্যে পারস্পরিক অভিজ্ঞতা বিনিময় ও সহযোগিতার অপার সম্ভাবনা রয়েছে, যা উভয় দেশের গণমাধ্যম খাতকে আরও সমৃদ্ধ করবে।
বৈঠকের শেষ পর্যায়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বর্তমান নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ সফলভাবে মোকাবিলা করা, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সঠিক ও নির্ভুল তথ্যের প্রবাহ নিশ্চিত করা এবং সর্বপরি একটি দায়িত্বশীল ও জবাবদিহিমূলক গণমাধ্যম সংস্কৃতি গড়ে তোলার বিভিন্ন কৌশল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। উভয় পক্ষই পারস্পরিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।