যুদ্ধের রাজনৈতিক উত্তাপ ও তীব্র কূটনৈতিক সংকটের ছায়ায় অনুষ্ঠিত উয়েফা নেশনস লিগ ফুটবলের ম্যাচটি মাঠের লড়াই ছাপিয়ে রূপ নিয়েছে এক অনভিপ্রেত ও লজ্জাজনক ঘটনায়। আয়ারল্যান্ড ও ইসরায়েলের মধ্যকার এই উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচের প্রথমার্ধ শেষে টানেলে ফেরার মুহূর্তে আইরিশ কোচিং স্টাফের এক সদস্যের দিকে ইসরায়েলি ফুটবলারের থুতু ছিটিয়ে দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। আল জাজিরা ও বিভিন্ন আইরিশ সংবাদমাধ্যমের সূত্রে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া অঙ্গনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। সার্বিয়ার নিরপেক্ষ ভেন্যুতে সম্পূর্ণ দর্শকশূন্য এক থমথমে স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত ১-১ ড্রয়ের মাধ্যমে শেষ হলেও খেলার ফলাফলের চেয়েও দুই দেশের রাজনৈতিক বৈরিতা এবং মাঠের ভেতরের এই ন্যক্কারজনক আচরণ বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
রোববার রাতে অনুষ্ঠিত ম্যাচটির প্রথমার্ধের খেলা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রেফারির শেষ বাঁশি বাজার পর মাঠের পরিস্থিতি মুহূর্তের মধ্যে অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, মাঠ ছেড়ে ড্রেসিংরুমে ফেরার সময় আয়ারল্যান্ডের কোচিং স্টাফের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ড্যামিয়েন ডয়েলের ওপর চরম ঔদ্ধত্য দেখিয়ে থুতু ছিটিয়ে বসেন ইসরায়েলের এক ফুটবলার। গাজার চলমান যুদ্ধ ও বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাবে এমনিতেই দুই দলের ম্যাচ ঘিরে তীব্র স্নায়ুচাপ বিরাজ করছিল, যা এই অনভিপ্রেত ঘটনার মধ্য দিয়ে আরও চরমে পৌঁছায়।
ম্যাচ শেষে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে আয়ারল্যান্ডের আইসল্যান্ডিক কোচ হেইমির হালগ্রিমসন নিজের তীব্র স্বস্তি প্রকাশ করে জানান যে, এই হাই-ভোল্টেজ ও মানসিক চাপযুক্ত সিরিজ শেষ হওয়ায় তিনি সত্যিই আনন্দিত। পুরো দলের ওপর দিয়ে যে মানসিক ঝড় বয়ে গেছে, তা কোনো দেশের জাতীয় দলের জন্যই কাম্য নয়। কঠিন ও প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও তার দলের খেলোয়াড়েরা যেভাবে অসাধারণ পেশাদারিত্ব ও মানসিক দৃঢ়তা প্রদর্শন করেছেন, তার জন্য তাদের পূর্ণ কৃতিত্ব প্রাপ্য বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
আইরিশ কোচের দিকে থুতু দেওয়ার ওই নিন্দনীয় ঘটনা সম্পর্কে সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি কোচ হেইমির হালগ্রিমসন। তবে তিনি স্পষ্ট করে জানান যে, ওই মুহূর্তে তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকলেও বিষয়টি এখন সম্পূর্ণভাবে উয়েফার ডিসিপ্লিনারি বা শৃঙ্খলা কমিটির বিচারাধীন রয়েছে। অন্যদিকে, ইসরায়েলি দলের কোচ রান বেন-শিমোন দাবি করেছেন যে, বিরতির সময় তিনি সরাসরি ড্রেসিংরুমে অবস্থান করায় মাঠে ঘটা ওই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি নিজ চোখে দেখেননি।
উল্লেখ্য, ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর নির্বিচার অভিযানের অন্যতম তীব্র সমালোচক রাষ্ট্র হলো আয়ারল্যান্ড। এর আগে সিরিজের প্রথম লেগের খেলায় হাঙ্গেরির মাঠে ইসরায়েলকে ৩-০ গোলের বড় ব্যবধানে পরাজিত করেছিল আইরিশরা। দুই দেশের মধ্যকার গভীর রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে উয়েফা কর্তৃপক্ষ সার্বিয়ার নিরপেক্ষ ভেন্যুতে দর্শকশূন্য স্টেডিয়ামে এই ম্যাচ আয়োজন করতে বাধ্য হয়।
দর্শকশূন্য মাঠে খেলা অনুষ্ঠিত হলেও খেলোয়াড়দের মধ্যকার স্নায়ুযুদ্ধ ও চরম অসন্তোষ ছিল দৃশ্যমান। এর আগের ম্যাচের মতো এই ম্যাচেও দুই দলের ফুটবলাররা ঐতিহ্যগত হ্যান্ডশেক কিংবা দলীয় পতাকা বিনিময়ের সৌজন্যতাটুকু বজায় রাখেননি। এমনকি প্রতিপক্ষের জাতীয় সংগীত পরিবেশিত হওয়ার সময়ও আইরিশ ও ইসরায়েলি খেলোয়াড়েরা মাথা নিচু করে নীরবতা পালন করেন। এছাড়া গাজায় নিহত সাধারণ মানুষের পবিত্র স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে কালো আর্মব্যান্ড পরে মাঠে লড়াইয়ে নেমেছিল আয়ারল্যান্ড দল।
মাঠের লড়াইয়ের দিক থেকে, প্রথমার্ধের ৩৯তম মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল করে আয়ারল্যান্ডকে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে দিয়েছিলেন ফরোয়ার্ড ট্রয় পারট। তবে বিরতির ঠিক পরপরই দুর্দান্ত এক আক্রমণ শানিয়ে ইসরায়েলকে সমতায় ফেরান দোর পেরেস। দ্বিতীয়ার্ধে ইসরায়েলের খেলোয়াড়দের নেওয়া জোরালো দুটি শট গোলপোস্টে লেগে ফিরে না আসলে খেলার ফল অন্যরকমও হতে পারত। শেষ পর্যন্ত ১-১ গোলের সমতা এবং মাঠের বাইরের অপ্রীতিকর সব বিতর্ক মাথায় নিয়েই পয়েন্ট ভাগাভাগি করে মাঠ ছেড়েছে দুই দল।