ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজ্যে এক হৃদয়বিদারক ও মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় এক শহীদ সেনাসদস্যের পরিবারের তিনজন সদস্যসহ মোট চারজন প্রাণ হারিয়েছেন। শোকাহত পরিবারটিকে বহনকারী অ্যাম্বুলেন্সটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে মহাসড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ভারী ট্রাকে সজোরে ধাক্কা দিলে এই ভয়াবহ ও অপ্রত্যাশিত দুর্ঘটনাটি ঘটে। প্রিয়জনকে হারিয়ে শোকের সাগরে ভাসা একটি পরিবারের এমন আকস্মিক পরিণতি গোটা দেশ ও সংশ্লিষ্ট এলাকায় গভীর শোকের ও সহানুভূতির ছায়া নামিয়ে এনেছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত রোববার (৪ অক্টোবর) সকাল আটটার দিকে অযোধ্যা ও সুলতানপুর জেলার সীমান্তবর্তী এলাকার হালিয়াফুর সংলগ্ন পূর্বাঞ্চল এক্সপ্রেসওয়ের ৭৯.৬ কিলোমিটার পয়েন্টে এই দুর্ঘটনাটি সংঘটিত হয়। দেশটির চণ্ডীগড়ের পঞ্চকুলা থেকে সুবেদার মেজর সত্যবান সিংয়ের পবিত্র মরদেহ তার নিজ গ্রাম উত্তর প্রদেশের দেওরিয়ার গালিয়া দুদহাইলায় সামরিক মর্যাদায় দাফনের জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। শেষকৃত্যের উদ্দেশ্যে চলা সেই শোকাহত যাত্রার গাড়িবহরে থাকা অ্যাম্বুলেন্সেই পরিবারের নিকটাত্মীয়রা ও গাড়িচালক একসঙ্গে ভ্রমণ করছিলেন।
প্রাথমিক তদন্তের বরাত দিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষایی বাহিনী জানিয়েছে, নির্ধারিত গন্তব্যের দিকে ছুটে চলা অ্যাম্বুলেন্সটি হঠাৎ করেই চালকের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলায় চরম বিপত্তি ঘটে। নিয়ন্ত্রণচ্যুত হয়ে গাড়িটি সরাসরি গিয়ে ধাক্কা খায় পূর্বাঞ্চল এক্সপ্রেসওয়ের পাশে পার্ক করে রাখা একটি বিশালাকার পণ্যবাহী ট্রাকে। সংঘর্ষের তীব্রতা এতটাই প্রচণ্ড ছিল যে, অ্যাম্বুলেন্সটির সামনের অংশ সম্পূর্ণ দুমড়েমুচড়ে যায় এবং এটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা দেখে উদ্ধারকর্মীদেরও আঁতকে ওঠার উপক্রম হয়েছিল।
এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে শহীদ সেনাসদস্য সুবেদার মেজর সত্যবান সিংয়ের তরুণ পুত্র গৌরব সিং (২৮) এবং অ্যাম্বুলেন্সটির চালক জসপাল (৩০)-এর। অন্যদিকে, গাড়িতে থাকা অন্য দুই নিকটাত্মীয়—শহীদ সেনার ভাই রাজন চৌধুরী (৩৫/৩৬) এবং ভাতিজা রাম সমুজ সিং (৪০)—গুরুতর ও আশঙ্কাজনক অবস্থায় রক্তাক্ত ও জখম অবস্থায় গাড়ির ভেতরে আটকে থাকেন। খবর পেয়ে দ্রুত উদ্ধারকারী দল ও পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় তাদের উদ্ধার করে নিকটস্থ হাসপাতালে প্রেরণ করে। তবে হাসপাতালের চিকিৎসকদের সমস্ত চেষ্টা ও লড়াই ব্যর্থ করে দিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তারা দুজনেই একে একে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
এদিকে এই মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনার পর শহীদ পরিবারটির ওপর নেমে আসা শোকের পাহাড় যেন আরও ঘনীভূত হয়েছে। প্রিয় সেনাসদস্যের মৃত্যুর শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই একই পরিবারের আরও তিন সদস্যের এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ও আকস্মিক প্রয়াণে স্বজন ও এলাকাবাসীর মাঝে কান্নার রোল পড়ে গেছে। স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকাজ পরিচালনা করে এবং পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনে।
পুলিশের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়েছে, নিহতদের মরদেহগুলো উদ্ধার করার পর আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য ময়নাতদন্তের উদ্দেশ্যে সংশ্লিষ্ট মর্গে পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি, শহীদ সেনাসদস্য সুবেদার মেজর সত্যবান সিংয়ের মরদেহ বর্তমানে হালিয়াফুর থানায় সুরক্ষিত অবস্থায় রাখা হয়েছে। সব আইনি প্রক্রিয়া ও ময়নাতদন্ত শেষ হওয়ার পর অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও রাষ্ট্রীয় সামরিক আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমেই তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে। দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী এই দুর্ঘটনাটি সড়ক নিরাপত্তার বিষয়ে নতুন করে ভাবনার খোরাক জুগিয়েছে।