মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে চলমান উত্তেজনার পারদ আরও চড়িয়ে ইয়েমেনে নতুন করে সংঘাত চূড়ান্ত রূপ ধারণ করেছে। দীর্ঘদিনের যুদ্ধবিধ্বস্ত এই দেশটির সৌদি-সমর্থিত সরকার হুথিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা বিভিন্ন কৌশলগত অঞ্চল পুনর্দখলের লক্ষ্যে একটি বড় ধরনের সর্বাত্মক সামরিক অভিযান পরিচালনার ঘোষণা দিয়েছে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক সংকটের প্রেক্ষাপটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব নিয়ে তেহরান অত্যন্ত কড়া ও দ্ব্যর্থহীন বার্তা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এই নতুন সামরিক ও রাজনৈতিক ঘোষণা মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও বেশি অনিশ্চয়তা ও আশঙ্কার দিকে ঠেলে দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রাপ্ত প্রতিবেদনের সূত্রে জানা যায়, ইয়েমেনের প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের প্রধান রাশাদ আল-আলিমি গত রোববার (৪ অক্টোবর) এক গুরুত্বপূর্ণ টেলিভিশন ভাষণে এই সামরিক অভিযানের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। তিনি দেশবাসীর উদ্দেশে দেওয়া ওই বক্তব্যে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, দেশের প্রতিটি প্রান্তে সরকারের বৈধ রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব ও প্রশাসনিক শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়েই এই কঠোর সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। মূলত গত বেশ কিছুদিন ধরে দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামরিক সমীকরণে যে স্থবিরতা বা অচলাবস্থা বিরাজ করছিল, তা নিরসনের একটি মরিয়া প্রচেষ্টা হিসেবে এই আক্রমণাত্মক কৌশল বেছে নেওয়া হয়েছে। ইয়েমেনের সাধারণ মানুষের দীর্ঘ দুর্ভোগ এবং রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা রক্ষায় এই অভিযানকে তারা অপরিহার্য বলে মনে করছেন।
সৌদি আরবের পূর্ণ মদদপুষ্ট ইয়েমেনি সরকারের এই বহুল আলোচিত ঘোষণাটি এমন এক সংকটময় মুহূর্তে সামনে এসেছে, যখন দেশটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও কৌশলগত শহর তাইজের চারপাশের এলাকায় হুথি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সরকারি বাহিনীর তীব্র ও রক্তক্ষয়ী লড়াই চলছে। সাম্প্রতিক মাস ও সপ্তাহগুলোতে হুথিরা কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল লোহিত সাগরের উপকূলীয় অঞ্চল এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রধান ধমনী হিসেবে পরিচিত বাব আল-মান্দাব প্রণালির বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের দখলে নিয়ে নিয়েছে। এই অঞ্চলগুলোর পতন সরকারের জন্য বড় ধরনের কৌশলগত ধাক্কা হওয়ায়, হারানো এলাকার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করতে সরকারি বাহিনী এখন সর্বশক্তি দিয়ে মাঠে নেমেছে, যার ফলে সংঘাত ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, তাইজ ও এর আশপাশের এলাকার নিয়ন্ত্রণ যার হাতে থাকবে, ইয়েমেনের সামগ্রিক যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
এদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান তীব্র ভূরাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইরান তাদের অবস্থান অত্যন্ত কঠোর ভাষায় স্পষ্ট করে দিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এক গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক বার্তায় জানিয়েছেন যে, বর্তমান এই জটিল সংকটের কোনো প্রকার সামরিক সমাধান বাস্তবে সম্ভব নয়। তবে তিনি একই সঙ্গে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে, যদি সংঘাত নিরসনে কূটনৈতিক আলোচনার সমস্ত পথ বন্ধ হয়ে যায় এবং পরিস্থিতি ওই পর্যায়ে গড়ায়, তবে তেহরান যেকোনো ধরনের যুদ্ধের জন্য সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন উপস্থিতি এবং আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে ওয়াশিংটনের কৌশলগত সমীকরণের বিপরীতে ইরানের এই কঠোর অবস্থান বৈশ্বিক রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনার জন্ম দিয়েছে।
এই আঞ্চলিক সংঘাতের সুদূরপ্রসারী ও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব এখন মধ্যপ্রাচ্যের গণ্ডি পেরিয়ে সরাসরি আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্যপথেও পড়তে শুরু করেছে। যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) এক জরুরি সতর্কবার্তায় জানিয়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের অত্যন্ত সংবেদনশীল ও কৌশলগত হরমুজ প্রণালীতে চলাচলকারী একটি বাণিজ্যিক তেল ট্যাংকারে ভয়াবহ হামলা চালানো হয়েছে। এই সশস্ত্র হামলায় ট্যাংকারটির ইঞ্জিনরুম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। শুধু তাই নয়, ইয়েমেনের উপকূলীয় অঞ্চলের কাছাকাছি জলসীমায় আরও একটি বাণিজ্যিক জাহাজের ঠিক পাশেই পরপর একাধিক শক্তিশালী বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে হরমুজ প্রণালী এবং সংলগ্ন আঞ্চলিক জলপথগুলোতে বাণিজ্যিক জলযান ও ট্যাংকারগুলোর ওপর হামলার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় বৈশ্বিক বাণিজ্য, সাপ্লাই চেইন এবং জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও বাণিজ্যিক শিপিং কোম্পানিগুলো এই পরিস্থিতিতে চরম সতর্কতা অবলম্বন করছে, কারণ লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালীতে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে বিশ্ব অর্থনীতিতে এর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়তে বাধ্য।