ফ্রান্সে শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া একটি সাধারণ স্থানীয় আন্দোলন বর্তমানে ভয়াবহ জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে। রাজধানী প্যারিসসহ দেশটির বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়া এই সহিংস বিক্ষোভে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ, সরকারি সম্পদ ধ্বংস এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে গত ১৮ দিনে পাঁচ হাজারের বেশি আন্দোলনকারীকে গ্রেপ্তার করেছে ফরাসি পুলিশ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দেশজুড়ে শত শত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে প্রশাসন।
চলমান এই অস্থিরতার সূত্রপাত হয়েছিল গত ১৭ সেপ্টেম্বর প্যারিসের একটি শহরতলীর হাইস্কুলে। সেখানে অপর্যাপ্ত শিক্ষক, ক্লাসের দীর্ঘ সময়সীমা এবং অতিরিক্ত শিক্ষার্থীসংখ্যার প্রতিবাদে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা একত্রিত হয়ে আন্দোলন শুরু করেন। খুব দ্রুতই এই স্থানীয় অসন্তোষ রাজধানীসহ পুরো দেশের স্কুলগুলোতে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে এবং শিক্ষা খাতের সামগ্রিক সংস্কারের এক বিশাল গণআন্দোলনে রূপ নেয়।
পরিস্থিতি সামাল দিতে এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গত রবিবার ফরাসি সরকারের পক্ষ থেকে নতুন করে প্রায় ৫০০ স্কুল সাময়িকভাবে বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়। এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার্দো জেফ্রে জানান যে, বর্তমান এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার মতো কোনো অনুকূল পরিবেশ বিদ্যমান নেই। ফ্রান্সে মোট হাইস্কুল ও জুনিয়র স্কুলের সংখ্যা ৩ হাজার ৭০০টি। এর আগে বিক্ষোভের শুরুর দিকে প্রায় ৪০০টি স্কুল বন্ধ করা হয়েছিল, যার সঙ্গে রবিবার আরও ৫০০ স্কুল যুক্ত হলো।
আন্দোলনের এই দেড় দশকের কাছাকাছি সময়ে ব্যাপক সহিংসতা ও ক্ষয়ক্ষতির চিত্র তুলে ধরে শিক্ষামন্ত্রী জানান যে, সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে শুরু হওয়া এই সংঘাতে এ পর্যন্ত অন্তত ১৭০ জন শিক্ষার্থী এবং ৭৮ জন শিক্ষক ও স্কুলকর্মী গুরুতর আহত হয়েছেন। এছাড়া বিক্ষুব্ধদের তাণ্ডবে এ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ২৪টি স্কুল পুড়িয়ে দেওয়া বা ব্যাপকভাবে ভাঙচুর করা হয়েছে। অন্যদিকে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন নুনেজ এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন যে, বিগত এক সপ্তাহে ফরাসি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পাঁচ হাজারের বেশি মানুষকে আটক করেছে, যার মধ্যে প্রায় ৮৫ শতাংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থী।
সরকারের তরফ থেকে এই তীব্র সহিংসতার জন্য বাইরের উসকানিদাতাদের সরাসরি দায়ী করা হচ্ছে। শিক্ষামন্ত্রী এক রেডিও সাক্ষাৎকারে দাবি করেন যে, কিছু উগ্র-বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মী সুকৌশলে ছাত্র আন্দোলনে অনুপ্রবেশ করে এর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছে এবং আন্দোলনটিকে চরম সহিংসতা ও অরাজকতার দিকে পরিচালিত করছে। তবে সরকারের এই কঠোর দমন-পীড়নের নীতির তীব্র সমালোচনা করেছেন অধিকারকর্মীরা। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে যে, তরুণ বিক্ষোভকারীদের ন্যায্য কণ্ঠস্বর দমন না করে বরং সরকারের উচিত তাদের দাবিগুলোকে গুরুত্বের সাথে শোনা। পুলিশের কৌশলকে ‘অতিরিক্ত’ ও ‘অসামঞ্জস্যপূর্ণ’ বলে আখ্যায়িত করেছেন সমালোচকরা।
সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে আন্দোলনের তেজ কিছুটা স্তিমিত মনে হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী নয়। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জন, প্রধান সড়ক অবরোধ এবং বিক্ষোভ মিছিল অব্যাহত রেখেছে। উভয় পক্ষই নিজেদের নিজ নিজ অবস্থানে কঠোরভাবে অনড় থাকায় সংকট নিরসনের কোনো স্পষ্ট রূপরেখা এখনো দৃশ্যমান হচ্ছে না। এরই মধ্যে আয়োজকরা আগামী মঙ্গলবার থেকে দেশজুড়ে আরও বড় পরিসরে নতুন করে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁর সরকার শিক্ষার্থীদের দাবি পূরণে সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ গ্রহণে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে।
সূত্র: এপি, জি নিউজ