মহাবিশ্বের সবচেয়ে রহস্যময় ও অধরা কণা নিউট্রিনো নিয়ে যুগান্তকারী গবেষণার স্বীকৃতিস্বরূপ চলতি বছর পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন বিশিষ্ট বেলজিয়ান পদার্থবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস হেলজেন। মঙ্গলবার সুইডেনের স্টকহোমে অবস্থিত রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস বাংলাদেশ সময় বিকেল ৩টা ৪৫ মিনিটে এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার বিজয়ীর নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে। মহাজাগতিক উৎস থেকে ছুটে আসা উচ্চ-শক্তির নিউট্রিনো আবিষ্কার এবং আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি নির্মাণের নেপথ্যে অসামান্য অবদানের জন্যই তাকে এই সর্বোচ্চ বৈজ্ঞানিক সম্মাননা প্রদান করা হলো।
ভৌগোলিক দিক থেকে দক্ষিণ মেরুর বরফ ব্যবহারের মাধ্যমে নিউট্রিনো কণা শনাক্ত করার অভিনব ধারণাটি প্রথম দিয়েছিলেন বিজ্ঞানী ফ্রান্সিস হেলজেন। ১৯৮৮ সালে উত্থাপিত তাঁর এই যুগান্তকারী ধারণাই পরবর্তীতে বিশালকায় ‘আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি’ বা গবেষণাগার প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত করেছিল। এক ঘনক কিলোমিটার আয়তনের এই সুবিশাল গবেষণাগারটি অত্যন্ত সংবেদনশীল অপটিক্যাল সেন্সরে সজ্জিত। এর মাধ্যমে গবেষক দল মহাশূন্যের দূরদূরান্ত থেকে আসা উচ্চ-শক্তির নিউট্রিনো কণা নিখুঁতভাবে শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন।
নিউট্রিনো কণাগুলো সর্বব্যাপী এবং আমাদের শরীরসহ সমগ্র বিশ্বজুড়ে প্রতিনিয়ত প্রবাহিত হলেও এগুলো অত্যন্ত বিরলভাবে পরমাণুর নিউক্লিয়াসের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে। অন্যান্য মহাজাগতিক কণা বিভিন্ন পরিবেশের প্রভাবে দিক পরিবর্তন করলেও বা শক্তি হারালেও নিউট্রিনোগুলো কোনো বাধা ছাড়াই সোজাসুজি আমাদের কাছে পৌঁছে যায়। ফলে এই কণাগুলো মহাবিশ্বের এমন সব গোপন ও দুর্লভ তথ্য উন্মোচন করতে পারে, যা অন্য কোনো প্রযুক্তির মাধ্যমে জানা একপ্রকার অসম্ভব। যখন একটি সাধারণ নিউট্রিনোর সঙ্গে অ্যাটমিক নিউক্লিয়াসের সংঘর্ষ ঘটে, তখন আলোর একটি বিশেষ ঝলকানি সৃষ্টি হয়, যা হিমবাহের স্বচ্ছ বরফে থাকা সেন্সরের মাধ্যমে সহজেই ট্র্যাক করা যায়।
দক্ষিণ মেরুর বরফ পরিবেশ বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য অত্যন্ত উপযোগী। যেহেতু এই স্থানটি ভৌগোলিক দিক থেকে অত্যন্ত স্থিতিশীল, ভূমিকম্পমুক্ত এবং বাইরের নানা ধরনের পরিবেশগত প্রভাব বা কোলাহল থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত, তাই হেলজেনের এই দূরদর্শী ধারণাটি বৈশ্বিক বিজ্ঞান মহলে দ্রুত ব্যাপক সমর্থন লাভ করে। এর কিছুকাল পরেই সেখানে সেন্সর বসিয়ে প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হয়। মহাশূন্য থেকে পৃথিবীর দিকে ছুটে আসা অতিরিক্ত শক্তির এই নিউট্রিনো কণাগুলো অত্যন্ত বিরল প্রকৃতির হওয়ায় এগুলোর সংঘাত নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য বিশাল আয়তনের বরফের প্রয়োজন ছিল। এরই ধারাবাহিকতায় এক ঘনক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত 'আইসকিউব' গবেষণাগারটির নির্মাণকাজ সফলভাবে ২০১১ সালে সম্পন্ন হয়।
বিজ্ঞানীরা এই গবেষণাগার চালুর খুব দ্রুতই প্রথম উচ্চ-শক্তির নিউট্রিনো কণার সন্ধান লাভ করেন। এর পরবর্তী কয়েক বছরের ব্যবধানে তাঁরা এমন সব নিউট্রিনো খুঁজে পাওয়ার ঘোষণা দেন, যা আমাদের নিজ সৌরজগতের সীমানা ছাড়িয়ে বহু দূরের কোনো অচেনা উৎস থেকে এসেছে। এর মধ্য দিয়ে মহাবিশ্বের অজানা নিউট্রিনো উৎসের সন্ধান করার আসল ও যুগান্তকারী কাজের সূচনা ঘটে। বর্তমানে আইসকিউব মেশিনে নিয়মিত ধরা পড়া কণাগুলো বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা অত্যন্ত শক্তিশালী নিউট্রিনো তৈরির প্রক্রিয়া সম্পর্কে নতুন নতুন তথ্য উদঘাটন করছেন।
এদিকে গত বছর পদার্থবিজ্ঞানে যৌথভাবে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন বিশিষ্ট গবেষক—জন ক্লার্ক, মিশেল এইচ ডেভোরেট এবং জন এম মার্টিনিস। বৈদ্যুতিক বর্তনীর মধ্যে স্থূল কোয়ান্টাম যান্ত্রিক টানেলিং এবং শক্তির কোয়ান্টাইজেশন আবিষ্কারের জন্য তাঁদের এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল। উল্লেখ্য, ১৯০১ সাল থেকে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার প্রদানের এই দীর্ঘ ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু হয়। এ পর্যন্ত মোট ১১৯ বার এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারটি প্রদান করা হয়েছে। এই বর্ণাঢ্য ইতিহাসে মাত্র ২৫ বছর বয়সে সর্বকনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে পদার্থে নোবেল জয়ের রেকর্ড গড়েছিলেন লরেন্স ব্র্যাগ। অপরদিকে সবচেয়ে প্রবীণ হিসেবে ৯৬ বছর বয়সে ২০১৮ সালে এই সম্মাননা অর্জন করেছিলেন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী আর্থুর আসকিন।