উত্তরাঞ্চল প্রতিনিধি : / : 31
রাজশাহী মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (রামেবি) এক নজিরবিহীন ও উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ‘আপামর ছাত্র-জনতা’ পরিচয়ে একদল ব্যক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে জোরপূর্বক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মোহা. জাওয়াদুল হক এবং সেকশন অফিসার ও ভিসির পিএস নাজমুল হোসাইনকে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করেছেন বলে অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) দুপুরে সংঘটিত এই অনভিপ্রেত ঘটনায় পুরো একাডেমিক ও প্রশাসনিক মহলে তীব্র চাঞ্চল্য ও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগী সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে এক বিশাল মিছিল নিয়ে হঠাৎ করেই একদল ব্যক্তি জোরপূর্বক উপাচার্যের কার্যালয়ে প্রবেশ করেন। এ সময় তারা উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মোহা. জাওয়াদুল হককে বিগত সরকারের ‘দোসর’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক ও দাপ্তরিক কাজ ঢাকার ঠিকাদারদের পাইয়ে দেওয়ার মতো নানা গুরুতর অভিযোগ তুলে তাঁর সঙ্গে চরম দুর্ব্যবহার ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। একপর্যায়ে আগে থেকেই প্রস্তুত ও লিখে আনা একটি পদত্যাগপত্রে উপাচার্যকে জোরপূর্বক স্বাক্ষর দিতে বাধ্য করা হয়।
উপাচার্যের পদত্যাগপত্র আদায়ের পর ক্ষুব্ধ দলটি থেমে থাকেনি; তারা সেকশন অফিসার ও ভিসির ব্যক্তিগত সচিব (পিএস) নাজমুল হোসাইনকেও তাদের দপ্তরে খুঁজে বের করে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করার জন্য চাপ সৃষ্টি করেন। পরবর্তীতে স্বাক্ষর দিতে অস্বীকৃতি জানালে তার ওপর শারীরিক নির্যাতন চালানো হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
ঘটনার বিবরণ দিয়ে ভুক্তভোগী নাজমুল হোসাইন গণমাধ্যমকে জানান, ঘটনার দিন সকাল ১০টা থেকে উপাচার্য মহোদয় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে মন্ত্রণালয় আয়োজিত একটি গুরুত্বপূর্ণ অনলাইন বৈঠকে ব্যস্ত ছিলেন। ঠিক এর পরপরই বেলা ১১টার দিকে হঠাৎ একদল লোক মিছিল নিয়ে জোরপূর্বক কার্যালয়ের ভেতরে প্রবেশ করেন এবং উপাচার্যকে লক্ষ্য করে গালিগালাজ শুরু করেন। পরবর্তীতে পূর্বপ্রস্তুতকৃত পদত্যাগপত্রে জোরপূর্বক উপাচার্যের স্বাক্ষর নেওয়া হয়।
নাজমুল হোসাইন আরও জানান, ‘তারা যখন আমাকেও পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করতে চায়, তখন আমি এতে দৃঢ়ভাবে অস্বীকৃতি জানাই। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে তারা আমাকে মারধর করে এবং একপর্যায়ে জোরপূর্বক আমার কাছ থেকেও পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর আদায় করে নেয়।’
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, উপাচার্য ও তাঁর পিএস-এর স্বাক্ষর নেওয়ার পর জোরপূর্বক তাদের কার্যালয় থেকে বের করে দেওয়া হয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। এখানেই শেষ নয়; অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে উপাচার্যের কক্ষ থেকে কম্পিউটারের সিপিইউ এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতের কাজে ব্যবহৃত সিসিটিভির গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতিগুলো খুলে নিয়ে যাওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। পরিস্থিতি আরও বেশি আতঙ্কজনক করে তুলতে পুরো ক্যাম্পাসের বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সংযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়, যার ফলে ক্যাম্পাসের ভেতরের সঙ্গে বাইরের যোগাযোগের পথ অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে।
উপাচার্য ও একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার মতো দায়িত্বশীল পদে থেকে এভাবে জোরপূর্বক পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর নেওয়া এবং কার্যালয়ে ভাঙচুর ও লুটপাটের এই ঘটনাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক শৃঙ্খলার ওপর চরম আঘাত বলে মনে করছেন সচেতন মহল। বর্তমান পরিস্থিতিতে ক্যাম্পাসের সার্বিক নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় দ্রুত প্রশাসনিক ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছেন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।