শীতকাল সমাগত। এর আগেই আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে নেমে আসতে পারে ভয়াবহ দুর্যোগ। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতি ও তেল সরবরাহ ব্যবস্থার বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়ে ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলারে পৌঁছে যাওয়ার মারাত্মক শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় পণ্য বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান ভিটেল (Vitol)-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) রাসেল হার্ডি এক সাম্প্রতিক সতর্কবার্তায় বিশ্ব অর্থনীতিকে এই ভয়াবহ ঝুঁকির বিষয়ে আগাম সতর্ক করেছেন।
লন্ডনে অনুষ্ঠিত মর্যাদাপূর্ণ এনার্জি ইন্টেলিজেন্স ফোরামে দেওয়া তাঁর এই গুরুত্বপূর্ণ ও চাঞ্চল্যকর বক্তব্যে হার্ডি জানান, গত সাত থেকে দশ দিনের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এবং অতিরিক্ত প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল পরিশোধিত জ্বালানি আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ করা হচ্ছিল। কিন্তু বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এই বিশাল সরবরাহ প্রবাহ যদি কোনো কারণে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়, তবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে এক অভূতপূর্ব ও নিয়ন্ত্রণহীন বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শীতের তীব্রতা শুরুর আগে পশ্চিমা দেশগুলোর কৌশলগত তেলের মজুত বর্তমানে তুলনামূলকভাবে বেশ কম রয়েছে। এমন একটি নাজুক ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রতিদিন অন্তত ১ কোটি থেকে ১ কোটি ৪০ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহ নিয়মিত বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের দীর্ঘদিনের সুস্থিতি ও ভারসাম্য পুরোপুরি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ভিটেল প্রধান রাসেল হার্ডি আরও জোর দিয়ে বলেন, মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল রপ্তানির এই নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ যদি বড় ধরনের বাধার মুখে পড়ে, তবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির ঘাটতি মুহূর্তের মধ্যে চরম আকার ধারণ করতে পারে। আর ঠিক সেই সংকটময় পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের বেঞ্চমার্ক মূল্য আকাশচুম্বী হয়ে প্রতি ব্যারেল ২০০ ডলাড় ছুঁয়ে ফেলার মতো বিপজ্জনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিতে সক্ষম।
বিশ্বের সামগ্রিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলটি বরাবরই অত্যন্ত সংবেদনশীল ও প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে আসছে। প্রতিদিন এই অঞ্চলটি থেকে বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের শিল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে পাঠানো হয়। ফলে এখানকার উৎপাদনে বা পরিবহনে সামান্যতম বিঘ্ন ঘটলে তার নেতিবাচক প্রভাব বিশ্ববাজারে অত্যন্ত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। শীত মৌসুমে ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন শীতপ্রধান অঞ্চলে জ্বালানির চাহিদা স্বাভাবিকের তুলনায় বহুগুণ বেড়ে যায়। ঠিক সেই সংকটকালে যদি সরবরাহ লাইন সংকুচিত হয়, তবে তেলের দাম রাতারাতি নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে।
জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেলে তার বিরূপ প্রভাব কেবল জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং এর জেরে সামগ্রিক পরিবহন ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, কলকারখানা, কৃষি ও খাদ্য উৎপাদন এবং পণ্য পরিবহনের ব্যয় আকাশচোঁয়া হয়ে ওঠে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে চলমান মূল্যস্ফীতির মারাত্মক চাপ আরও বহুগুণ তীব্র হয়ে ওঠার তীব্র আশঙ্কা করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা।
এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান জ্বালানি সরবরাহ সংকট ও সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে নতুন করে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা শুরু করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। ইউরোপীয় কমিশনের একজন দায়িত্বশীল মুখপাত্র গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, বুধবার স্থানীয় সময় সকাল আটটায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিশেষ 'অয়েল কো-অর্ডিনেশন গ্রুপ' এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসতে যাচ্ছে। বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় জোটের সুনির্দিষ্ট কৌশলগত অবস্থান কী হবে এবং আসন্ন শীতের ধাক্কা সামাল দিতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে, তা নিয়ে ওই বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনা ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল রপ্তানি ও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হলে বর্তমান পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং বড় ধরনের বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব। তবে জাহাজে জ্বালানি পরিবহনের এই লাইনে যদি দীর্ঘস্থায়ী বাধার সৃষ্টি হয় এবং পশ্চিমা দেশগুলোর তেল মজুত দ্রুত ফুরিয়ে আসে, তবে তা পুরো বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক গভীর সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। শেষ পর্যন্ত ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলারের এই চরম তেলের দাম কেবল একটি সম্ভাব্য বাজারদর হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং এটি বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এক চরম ও সর্বনাশা ঝুঁকির শক্তিশালী সংকেত হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।
সূত্র: আল-জাজিরা