ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬,  ১৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে বসছে এআই ক্যামেরা, আইন ভাঙলেই স্বয়ংক্রিয় মামলা ফ্যাসিস্টরা স্বাস্থ্যখাতকে ধ্বংস করে দিয়ে গেছে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে জাপান সফরে নতুন ৪টি সমঝোতা স্মারক সই পাশাপাশি চার কবরে চিরনিদ্রায় একই পরিবারের চার সদস্য স্পেনে ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনা: নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৬৪, আহত ৮০ ঢামেকে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্সের ধর্মঘট ৭ দিনের জন্য স্থগিত ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচন: ১৮৫ কেন্দ্রের মধ্যে ১১৫টিই অধিক ঝুঁকিপূর্ণ প্রগতির আড়ালে নৈতিক দেউলিয়া সমাজ: বিশ্ব যখন শেখায়, আমরা তখন পিছিয়ে সেঞ্চুরি থেকে মাত্র ১ রান দূরে সাদমান, প্রথম দিনে বাংলাদেশের সংগ্রহ ২১৩ স্পেনে দ্রুতগতির দুই ট্রেনের সংঘর্ষে নিহত অন্তত ৪৬

বাস্তুচ্যুত ১৯ লাখ মানুষ

গাজায় তিন বছরে প্রাণহানি ৭৪ হাজারের বেশি


  • আপলোড সময় : বৃহস্পতিবার ০৮ অক্টোবর, ২০২৬ সময় : ১০:৩১ এএম

গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরুর তিন বছর পেরিয়ে গেলেও থামেনি মানুষের মৃত্যু, বাস্তুচ্যুতি ও ধ্বংসযজ্ঞ। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ৪ অক্টোবর পর্যন্ত নিহত ফিলিস্তিনির সংখ্যা ৭৪ হাজার ২৩৭ এবং আহত হয়েছেন ১ লাখ ৭৫ হাজার ২০৬ জন। নিহতের এই সংখ্যা গাজার যুদ্ধপূর্ব আনুমানিক ২২ লাখ জনসংখ্যার প্রায় ৩ দশমিক ৪ শতাংশ—অর্থাৎ প্রতি ৩০ জনে প্রায় একজনের মৃত্যু হয়েছে।

 

যুদ্ধের তিন বছরে নিহতদের মধ্যে রয়েছেন উদ্ধার সহায়তার জন্য আকুতি জানানো শিশু হিন্দ রাজাব, কবি ও শিক্ষক রেফাত আলারির, নিহত নাতনিকে ‘আমার আত্মার আত্মা’ বলে স্মরণ করা দাদা খালেদ নাবহান এবং উত্তর গাজা থেকে যুদ্ধের খবর জানানো সাংবাদিক আনাস আল-শরিফ। তাদের মতো হাজারো মানুষের মৃত্যু গাজার মানবিক বিপর্যয়ের ভয়াবহতা তুলে ধরেছে।

 

জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বয়স ও লিঙ্গ শনাক্ত করা ৭১ হাজার ৪৪৪ জন নিহতের মধ্যে ৪৭ দশমিক ৭ শতাংশ পুরুষ, ২৯ দশমিক ৮ শতাংশ শিশু, ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ নারী এবং ৭ দশমিক ১ শতাংশ বয়স্ক মানুষ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বাস্থ্য ক্লাস্টারের তথ্য বলছে, শুধু ২০২৩ সালের অক্টোবরেই ৮ হাজার ৮০৫ ফিলিস্তিনি নিহত হন। ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও হাজারো মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

 

৩ অক্টোবরের এক বিবৃতিতে হেমায়া সেন্টার ফর হিউম্যান রাইটস জানায়, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে তারা ২১ হাজার ৭৪৫ শিশুর নিহত হওয়ার তথ্য নথিভুক্ত করেছে। এ সময়ে শিশুদের আহত হওয়ার ঘটনা প্রায় ৪৬ হাজার এবং নিম্নাঙ্গ বিচ্ছেদের ঘটনা ১১ হাজার। অপুষ্টি ও পানিশূন্যতায় ১২৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ভেঙে পড়া, বিদ্যুৎ সংকট এবং ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রীর ঘাটতির মধ্যে ২৯৩ অপরিণত নবজাতকেরও মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

 

যুদ্ধের প্রথম বছরেই পারিবারিক ক্ষয়ক্ষতির ভয়াবহ চিত্র উঠে আসে। ফিলিস্তিনি নীতি ও জরিপ গবেষণা কেন্দ্রের ২০২৪ সালের মে-জুনে পরিচালিত জরিপে গাজার ৬১ শতাংশ মানুষ জানান, তাদের পরিবারের কোনো সদস্য নিহত হয়েছেন। ৭৮ শতাংশ বলেন, কোনো আত্মীয় নিহত বা আহত হয়েছেন। জরিপটি মধ্য ও দক্ষিণ গাজার যেসব এলাকায় যাওয়া সম্ভব ছিল, সেসব এলাকায় পরিচালিত হয়; উত্তর গাজা ও সক্রিয় যুদ্ধক্ষেত্র এর আওতায় ছিল না।

 

ইসরায়েলি হামলায় গাজার আবাসনব্যবস্থার ব্যাপক ধ্বংসের কারণে বাস্তুচ্যুতি দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। জাতিসংঘের হিসাবে, যুদ্ধ চলাকালে প্রায় ১৯ লাখ ফিলিস্তিনি—গাজার মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯০ শতাংশ—বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। অনেক পরিবারকে একাধিকবার স্থান পরিবর্তন করতে হয়েছে। বিশ্বব্যাংক, জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের এপ্রিলের মূল্যায়নে বলা হয়, ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ৩ লাখ ৭১ হাজার ৮৮৮টি আবাসন ইউনিট ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে, যা গাজার মোট আবাসনের প্রায় ৭৭ শতাংশ।

 

ফিলিস্তিনি কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১৬ জুন পর্যন্ত গাজায় প্রায় ২ লাখ ১ হাজার ২৯০টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৪২২টি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে। জুনের জরিপভিত্তিক আশ্রয়বিষয়ক মূল্যায়নে বলা হয়, গাজার প্রায় ৯৪ শতাংশ মানুষের আশ্রয় ও প্রয়োজনীয় গৃহস্থালি সামগ্রী প্রয়োজন ছিল। প্রায় ৬৫ শতাংশ পরিবার তাঁবু বা অস্থায়ী কাঠামোয় বসবাস করছিল।

 

যুদ্ধ গাজার অর্থনীতিকেও প্রায় অচল করে দিয়েছে। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার ২৪ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজার ৯২ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। বেকারত্ব বেড়ে ৭৮ শতাংশে পৌঁছেছে এবং কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর ৯০ শতাংশের বেশি কর্মহীন। ২০২৫ সালে মাথাপিছু বার্ষিক অর্থনৈতিক উৎপাদন কমে ২১২ ডলারে নেমেছে, যা ২০২২ সালের মাত্র ১৭ শতাংশ। একই সময়ে পণ্যের দাম ২০২২ সালের তুলনায় ২৭৪ শতাংশ বেশি ছিল।

 

কৃষি ও শিল্প উৎপাদন ২০২২ সালের তুলনায় ৯৪ শতাংশ এবং নির্মাণ খাত ৯৯ শতাংশ কমেছে। কৃষিজমি ধ্বংস হওয়ায় গাজার মাত্র ১ দশমিক ৫ শতাংশেরও কম চাষযোগ্য জমি ব্যবহারযোগ্য ও অক্ষত রয়েছে। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা সতর্ক করেছে, খাদ্যনিরাপত্তা এখন পুরোপুরি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের অপুষ্টি তাদের শারীরিক বৃদ্ধি, মেধা ও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের ওপর স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে।

 

২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি হলেও প্রাণহানি পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। যুদ্ধবিরতির পর অন্তত ১ হাজার ৪৬০ ফিলিস্তিনি নিহত ও ৫ হাজার ১১৬ জন আহত হয়েছেন এবং ৮৩৫টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। গাজার অর্ধেকের বেশি হাসপাতাল ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র অকার্যকর রয়েছে।

 

ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজার প্রায় ৯৮ শতাংশ স্কুল ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৯৩ শতাংশের বেশি বড় ধরনের সংস্কার বা সম্পূর্ণ পুনর্নির্মাণ প্রয়োজন। সেপ্টেম্বরে প্রায় ৫ লাখ ৪১ হাজার শিক্ষার্থী স্কুলে ফিরলেও অনেকেই মৌলিক সরঞ্জাম ছাড়াই অস্থায়ী শ্রেণিকক্ষে পড়াশোনা করছে। টানা তিন বছর সরাসরি বিদ্যালয়ের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়েছে ৪ থেকে ১৭ বছর বয়সী প্রায় ৭ লাখ শিশু। তাদের মধ্যে প্রায় ৪ লাখ ২০ হাজার কোনো সরাসরি শ্রেণিকক্ষভিত্তিক শিক্ষাই পায়নি।

 

জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থার সর্বশেষ হিসাবে, গাজা পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠনে প্রয়োজন হবে ৭১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। নতুন করে ক্ষয়ক্ষতির তথ্য যুক্ত হলে এই ব্যয় আরও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।

সূত্র: আনাদোলু এজেন্সি


এ সম্পর্কিত আরো খবর