দীর্ঘ ১২ বছরের জটিলতা ও নানা প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে চীন ও উত্তর কোরিয়ার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যিক যোগাযোগ আরও জোরদার করতে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা হয়েছে বহুল কাঙ্ক্ষিত ‘নতুন ইয়ালু নদী সেতু’। প্রায় ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ কৌশলগত ও দৃষ্টিনন্দন এই সেতুটি চীনের সীমান্তবর্তী দানদং শহর থেকে উত্তর কোরিয়ার সিনুইজু শহর পর্যন্ত বিস্তৃত। ২০১৪ সালেই সেতুটি চালুর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করা হলেও নানা আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ও কারিগরি জটিলতায় টানা এক যুগেরও বেশি সময় তা থমকে ছিল। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞা ও ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে প্রতিবেশী দুই দেশের বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের অগ্রগতিতে এই সেতু চালুকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
উল্লেখ্য, চীন বর্তমানে অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন উত্তর কোরিয়ার সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। দেশটির পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচির কারণে আরোপিত জাতিসংঘের কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও উত্তর কোরিয়ার সংকটাপন্ন অর্থনীতি টিকিয়ে রাখতে বেইজিং সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে আসছে। নতুন এই সেতু উন্মুক্ত হওয়ার ফলে দুই দেশের মধ্যে পণ্য পরিবহন, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং সাধারণ মানুষের যাতায়াত আগের চেয়ে অনেক বেশি দ্রুত ও সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এটি মূলত ১৯৩৭ থেকে ১৯৪৩ সালের মধ্যে জাপানের সাম্রাজ্যবাদী শাসন আমলে নির্মিত কয়েক দশকের পুরোনো ‘চীন-কোরিয়া মৈত্রী সেতু’র বিকল্প ও আধুনিক সংস্করণ হিসেবে তৈরি করা হয়েছে।
চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং বুধবার নিশ্চিত করেছেন, দুই মিত্র দেশের সার্বিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে নতুন এই সেতুটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত মাইলফলক। এটি কেবল দ্বিপক্ষীয় সীমান্ত বাণিজ্যই বৃদ্ধি করবে না, বরং উভয় দেশের জনগণের মধ্যে গভীর যোগাযোগ ও সামাজিক বিনিময় বৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তথ্য অনুযায়ী, গত বছর চীন ও উত্তর কোরিয়ার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ২৭০ কোটি মার্কিন ডলারে, যা মহামারিপূর্ব সময়ের উচ্চ বাণিজ্যের হারকে নির্দেশ করে। তবে এই বাণিজ্যের সিংহভাগই ছিল চীন থেকে উত্তর কোরিয়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় ও শিল্পের পণ্য রপ্তানি।
তবে দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে অবস্থিত হানকুক ইউনিভার্সিটি অব ফরেন স্টাডিজের চীনা অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক কাং জুন-ইয়ং বিশ্লেষণ করে জানান, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকা এবং অতিরিক্ত চীনা পণ্যের অবাধ প্রবেশে নিজেদের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে চীনের নিয়ন্ত্রণ বেড়ে যেতে পারে—এমন আশঙ্কায় পিয়ংইয়ং সীমান্ত বাণিজ্য হুট করে খুব বেশি নাও বাড়াতে পারে। ফলে দুই দেশের সীমান্ত বাণিজ্য অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
বাণিজ্যিক দ্বিধা থাকলেও চীন ও উত্তর কোরিয়ার ঐতিহাসিক সম্পর্ক বেশ গভীর। মাও সে তুংয়ের আমল থেকে শুরু হওয়া এই অটুট সম্পর্ককে প্রায়ই ‘ঠোঁট ও দাঁতের মতো ঘনিষ্ঠ’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। যদিও ২০১৭ সালে কিম জং উন পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা জোরদার করার পর দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের গতি কিছুটা থমকে গিয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার দিকে উত্তর কোরিয়ার ক্রমবর্ধমান ঝুঁক দেখে বেইজিং নতুন করে পিয়ংইয়ংয়ের ওপর নিজেদের রাজনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাব শক্তিশালী করতে তৎপর হয়ে উঠেছে।
রাশিয়াও সম্প্রতি উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে নিজেদের প্রথম সড়ক সেতু চালু করেছে এবং ইউক্রেন যুদ্ধে উত্তর কোরীয় সেনা সহযোগিতার বিনিময়ে গোপনে বিপুল পরিমাণ তেল সরবরাহ করে জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করছে বলে আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানে তথ্য এসেছে। এমন পরিস্থিতিতে উত্তর কোরিয়ার ওপর কর্তৃত্ব বজায় রাখতে গত মার্চে বেইজিং-পিয়ংইয়ং সরাসরি ফ্লাইট ও ট্রেন চালু করার পাশাপাশি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং নিজেই উত্তর কোরিয়া সফর করে শীর্ষ নেতা কিম জং উনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে অবস্থিত ইহা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লেইফ-এরিক ইজলির মতে, নতুন ইয়ালু নদী সেতু চালু হওয়া স্পষ্ট করে দেয় যে শি জিনপিংয়ের সাম্প্রতিক সফর কেবল আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সৌজন্য ছিল না, বরং উত্তর কোরিয়াকে নিজেদের কৌশলগত ছাতার নিচে ধরে রাখতে বেইজিংয়ের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনারই অংশ। সূত্র: বিবিসি