আন্তর্জাতিক ডেস্ক
সৌদি
আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের জন্য
চলতি বছর ক্রমেই কঠিন
হয়ে উঠছে। ইয়েমেনের ইরানপন্থি হুথিদের হামলা, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ, অর্থনৈতিক
চাপ এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট
ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর নির্ভরতার ঝুঁকি—সব মিলিয়ে একাধিক
সংকটে পড়েছে তার পরিকল্পনা।
২৬
অক্টোবর সৌদি রাজধানী রিয়াদে
শুরু হওয়ার কথা ছিল দেশটির
বার্ষিক বিনিয়োগ সম্মেলন ‘ফিউচার ইনভেস্টমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’ (এফআইআই)। ‘মরুভূমির দাভোস’
নামে পরিচিত এ সম্মেলনে বিশ্বের
বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, অর্থনীতিবিদ ও বড় বিনিয়োগকারীরা
অংশ নেন। যুবরাজ সাধারণত
এ সম্মেলনকে সৌদি আরবে বিনিয়োগ
আকর্ষণের বড় সুযোগ হিসেবে
ব্যবহার করেন।
কিন্তু
এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। ইয়েমেনের ইরানসমর্থিত হুথিরা কয়েক সপ্তাহ ধরে
রিয়াদ লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও
ড্রোন হামলা চালিয়েছে। প্রাণঘাতী হামলার পর বিমানবন্দরের কার্যক্রমও
কার্যত বন্ধ রয়েছে। অনেক
পশ্চিমা সরকার তাদের নাগরিকদের সৌদি আরব সফর
না করার পরামর্শ দিয়েছে।
নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারাও হোটেল ও সম্মেলনস্থল নিয়ে
উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। শেষ
পর্যন্ত ১৯ অক্টোবর আয়োজকেরা
সম্মেলনটি আগামী বছর পর্যন্ত স্থগিত
করার সিদ্ধান্ত নেন।
যুবরাজ
হিসেবে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসার পর
গত এক দশকে মোহাম্মদ
বিন সালমান কয়েকটি বড় পরিকল্পনা নিয়েছিলেন।
তার ধারণা ছিল, হুথিদের পরাজিত
করা সম্ভব, সৌদি অর্থনীতির আমূল
পরিবর্তন ঘটানো যাবে এবং ডোনাল্ড
ট্রাম্প নির্ভরযোগ্য মিত্র হিসেবে পাশে থাকবেন। কিন্তু
এখন তিনটি পরিকল্পনাই বড় চ্যালেঞ্জের মুখে।
বিনিয়োগ সম্মেলন স্থগিত হওয়ার ঘটনাটি তার জন্য কঠিন
এক বছরের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
হুথিদের
মোকাবিলায় কঠিন সিদ্ধান্ত
সৌদি
আরব দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও হুথিদের পরাজিত
করতে পারেনি। ২০২২ সালে হওয়া
যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে রিয়াদ আশা করেছিল, হুথিদের
হুমকি নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে। কিন্তু
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর
যুদ্ধের প্রভাবে চলতি গ্রীষ্মে সেই
যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়তে শুরু
করে। হুথিরা ইয়েমেনে আরও ভূখণ্ড দখল
করেছে এবং সৌদি আরবেও
হামলা জোরদার করেছে।
যুবরাজের
ঘনিষ্ঠদের মতে, এখন সৌদি
আরবের সামনে কোনো সহজ পথ
নেই। দেশটি চাইলে স্থলবাহিনী পাঠিয়ে দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে
জড়াতে পারে। অথবা এমন বিমান
হামলা চালিয়ে যেতে পারে, যার
সফলতা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।
আরেকটি পথ হলো হুথিদের
সঙ্গে সমঝোতা করা, যা ইয়েমেনে
তাদের শাসন আরও শক্তিশালী
করতে পারে।
অর্থনৈতিক
পরিকল্পনাও চাপে
দীর্ঘস্থায়ী
যুদ্ধ যুবরাজের অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচিকে বড় ধাক্কা দিতে
পারে। ২০২৬ সালের আগেই
তার উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনায় ধীরগতি দেখা দিয়েছিল। সরকারি
অর্থের ওপর চাপ বাড়ায়
বড় কয়েকটি প্রকল্প স্থগিত করা হয়েছে। মূল্যস্ফীতির
সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়েনি
মানুষের বেতন।
যুবরাজের
বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলার
বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রকৃত বিনিয়োগ প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। আন্তর্জাতিক
মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এক বছর আগে
২০২৬ সালে সৌদি অর্থনীতিতে
৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল। এখন সংস্থাটি ৩
দশমিক ৩ শতাংশ সংকোচনের
আশঙ্কা করছে।
২০২৭
সালে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে কি
না, তা অনেকাংশে নির্ভর
করছে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফিরে আসার ওপর।
আর সেই শান্তি প্রতিষ্ঠায়
বড় ভূমিকা রাখতে পারেন ট্রাম্প।
ট্রাম্পের
ওপর নির্ভরতার ঝুঁকি
সৌদি
আরব ভেবেছিল, ট্রাম্পের ওপর তাদের যথেষ্ট
প্রভাব রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে বিপুল বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাকে কাছে
টানার চেষ্টা করেছে রিয়াদ। ট্রাম্প পরিবারের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্কও গড়ে উঠেছে। সৌদি
অর্থায়নে আয়োজিত গলফ প্রতিযোগিতার জন্য
ট্রাম্পের মালিকানাধীন গলফ কোর্স ব্যবহার
করা হয়েছে। এ ছাড়া ট্রাম্পের
জামাতা জ্যারেড কুশনারের প্রতিষ্ঠানে ২ বিলিয়ন ডলার
বিনিয়োগ করেছে সৌদি-সংশ্লিষ্ট একটি
তহবিল।
তবু
এসব সম্পর্ক ট্রাম্পকে এমন একটি যুদ্ধে
জড়ানো থেকে বিরত রাখতে
পারেনি, যেটিকে নিবন্ধে বিপর্যয়কর হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। সৌদি
আরবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে—এমন একজনের ভাষায়,
ট্রাম্প দীর্ঘ সময় কারও প্রতি
অনুগত থাকেন না।
যুবরাজ
ট্রাম্পকে ইরান যুদ্ধের উত্তেজনা
না বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ট্রাম্প যদি
আবার ইরানে বোমা হামলা শুরু
করেন, তাহলে সৌদি আরবকে চারদিক
থেকে হামলার মুখে পড়তে হতে
পারে বলে আশঙ্কা করছেন
সৌদি কর্মকর্তারা। দক্ষিণে হুতি, উত্তরে ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং পূর্বে ইরান
থেকে হামলার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
ফ্রান্সের প্রায় চার গুণ আয়তনের
বিশাল দেশটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত আকাশ
প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী
সরঞ্জাম থাকবে কি না, তা
নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।
যুবরাজের
ক্ষমতা কি হুমকির মুখে?
সৌদি
আরবে নির্ভরযোগ্য জনমত জরিপ না
থাকলেও সাধারণভাবে মনে করা হয়,
অধিকাংশ নাগরিক সরকারের ওপর আস্থা রাখেন।
তবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোর অস্থিরতা অনেককে উদ্বিগ্ন করেছে। ১০ অক্টোবর রিয়াদের
বিমানবন্দরে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১৩ জন নিহত
হওয়ার পর যুবরাজকে প্রকাশ্যে
খুব একটা দেখা যায়নি।
ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে দেখা করা ও
জনগণকে আশ্বস্ত করার দায়িত্ব পালন
করেছেন মন্ত্রীরা।
কয়েকজন
পশ্চিমা বিশ্লেষক প্রশ্ন তুলেছেন, সংকটে ভরা এ বছর
যুবরাজের শাসনের জন্য অস্তিত্বের হুমকি
তৈরি করতে পারে কি
না। তবে রিয়াদে কর্মরত
কূটনীতিকেরা মনে করেন, এমন
আশঙ্কা অতিরঞ্জিত। এক পশ্চিমা কূটনীতিকের
ভাষায়, সাত-আট বছর
আগে যুবরাজ আরও কঠিন পরিস্থিতিতে
ছিলেন।
সে
সময় তিনি সদ্য মনোনীত
উত্তরাধিকারী ছিলেন এবং নিজের ক্ষমতা
সুসংহত করার চেষ্টা করছিলেন।
ইয়েমেন যুদ্ধ তখনই দীর্ঘ অচলাবস্থায়
পড়েছিল। কাতারের ওপর সৌদি নেতৃত্বাধীন
অবরোধ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কেও অস্বস্তি তৈরি করেছিল। এর
মধ্যে ২০১৮ সালে ইস্তাম্বুলে
সৌদি কনস্যুলেটের ভেতরে সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যাকাণ্ড বিশ্বজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
বর্তমানে
যুবরাজের ক্ষমতা আগের চেয়ে অনেক
বেশি সুসংহত। তিনি প্রতিদ্বন্দ্বীদের কোণঠাসা করেছেন
এবং সৌদি রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা
বাদশাহ আবদুল আজিজের পর দেশটির অন্য
শাসকদের তুলনায় ক্ষমতা বেশি কেন্দ্রীভূত করেছেন।
তার বিরোধী থাকলেও সংগঠিত অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার
মতো শক্তি কারও আছে বলে
মনে করা হয় না।
এমনকি
দীর্ঘদিন ধরে ইয়েমেন যুদ্ধের
সমালোচনা করা পশ্চিমা মিত্রদের
মধ্যেও এখন সৌদি আরবের
বিরুদ্ধে প্রকাশ্য সমালোচনা তুলনামূলক কম। মার্কিন ডেমোক্র্যাট
সিনেটর ক্রিস মারফি, যিনি চলতি মাসে
রিয়াদে যুবরাজের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন, বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি ২০১৮ বা ২০২০
সালের মতো নয়। হুথিদের
অগ্রগতি ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার
মুখে সৌদি আরব যে
চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, তা
স্বীকার করা উচিত।
এবারের
সংকট কেন আলাদা
যুবরাজের
শাসনামলের শুরুর দিকের অনেক সমস্যা তার
নিজের সিদ্ধান্তের কারণে তৈরি হয়েছিল। ফলে
সেগুলো সংশোধন করার সুযোগও ছিল।
২০২১ সালের মধ্যে তিনি সৌদি পররাষ্ট্রনীতিতে
তুলনামূলক বাস্তববাদী অবস্থান নিতে শুরু করেন।
কাতারের ওপর অবরোধ প্রত্যাহার
করেন এবং হুথিদের সঙ্গে
সমঝোতার উদ্যোগ নেন। এমনকি জো
বাইডেন প্রশাসনও, যারা ক্ষমতায় আসার
আগে যুবরাজকে আন্তর্জাতিকভাবে একঘরে করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল,
পরে তার পরিবর্তিত নীতির
প্রশংসা করে।
কিন্তু
এবারের পরিস্থিতি আরও কঠিন। কারণ,
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটি এখন যুবরাজের নিজের
হাতে নেই। ট্রাম্প তার
পরামর্শ উপেক্ষা করে যুদ্ধ বাড়ালে
সৌদি আরবকে বড় নিরাপত্তাঝুঁকির মুখে
পড়তে হতে পারে।
গত
এক দশকে যুবরাজ সৌদি
সমাজে কিছু উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন
এনেছেন। নারীদের গাড়ি চালানোর অনুমতি
দেওয়া হয়েছে, নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ
প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। একসময় বিনোদন নিষিদ্ধের মতো কঠোর বিধিনিষেধ
থাকা দেশটিতে এখন কনসার্ট ও
সিনেমা হলের বিস্তার ঘটেছে।
এমনকি কিছু সচ্ছল বিদেশি
নাগরিকের জন্য আইনসম্মতভাবে মদ্যপানের
সুযোগও তৈরি হয়েছে।
তবে
সৌদি রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোয় পরিবর্তন তুলনামূলক কম। অর্থনীতি এখনো
তেল আয়ের ওপর নির্ভরশীল।
দেশটির সেনাবাহিনী মূলত শাসনব্যবস্থা সুরক্ষার
জন্য গড়ে তোলা হয়েছে,
দীর্ঘ যুদ্ধ পরিচালনার জন্য নয়। আর
পররাষ্ট্রনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র এখনো অপরিহার্য নিরাপত্তা
অংশীদার।
এই
নির্ভরতা কমাতে সৌদি আরব নতুন
মিত্র খুঁজছে। পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে
পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদারের উদ্যোগ তারই অংশ। তবে
এমন পরিবর্তন বাস্তবায়নে সময় লাগবে।
নিবন্ধটির
মূল্যায়ন হলো, ক্ষমতার দ্বিতীয়
দশকে মোহাম্মদ বিন সালমানের সবচেয়ে
বড় পরীক্ষা হবে শুধু সৌদি
আরবের আধুনিক চেহারা গড়ে তোলা নয়,
বরং দেশটির অর্থনীতি, সামরিক সক্ষমতা ও পররাষ্ট্রনীতির মৌলিক
ভিত্তিতেও পরিবর্তন আনা।
সূত্র:
দ্য ইকোনমিস্ট