ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬,  ৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
ইশরাক কাজটা ভালোই করেছে, তবে অস্ত্র হাতে নেওয়া ঠিক হয়নি: স্পিকার গণপূর্ত থেকে রাজউক: ধর্মীয় লেবাসের আড়ালে শত কোটি টাকার ঘুস বাণিজ্য পালিয়ে যাওয়া স্বৈরাচার পয়সা দিচ্ছে, দেশের ভেতর অস্থিরতার চেষ্টা করছে আরেক পক্ষ: প্রধানমন্ত্রী পদ্মা ও তিস্তায় ব্যারাজ তৈরি করব, পানির হিস্যা আদায় করা হবে: প্রধানমন্ত্রী বিনিয়োগ সম্মেলন স্থগিত ও নিরাপত্তাঝুঁকি: তীব্র চ্যালেঞ্জের মুখে সৌদি যুবরাজ ৬৭৮ কোটি টাকার অবৈধ স্বর্ণ ও হীরা চোরাচালান: ১ দিনের রিমান্ডে দিলীপ আগরওয়ালা রাজশাহীতে আখচাষীদের ১২ কোটি টাকার প্রণোদনা দিলেন প্রধানমন্ত্রী শাহজালাল বিমানবন্দরের স্টোর ভবনে অস্বাভাবিক ধোঁয়া আজ থেকে টানা ৫ দিন বন্ধ দেশের সব ব্যাংক ও শেয়ারবাজার কলম্বিয়ায় অবৈধ সোনার খনি ধসে নিহত ১৪

গণপূর্ত থেকে রাজউক: ধর্মীয় লেবাসের আড়ালে শত কোটি টাকার ঘুস বাণিজ্য


  • আপলোড সময় : মঙ্গলবার ২০ অক্টোবর, ২০২৬ সময় : ৯:৩২ পিএম

আব্দুল কাইয়ুম খান, বিশেষ প্রতিনিধি

সরকারি সেবা খাতগুলোতে দুর্নীতি, ঘুস এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের খবর এখন প্রায় নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। তবে সম্প্রতি এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্যে দেখা গেছে যে, সমাজের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিজেদের অপরাধ আড়াল করতে ধর্মীয় পোশাক ও সুন্নতি লেবাসকে এক ধরনের আত্মরক্ষার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন। সুন্নতি পোশাক, টুপি কিংবা ধোপদুরস্ত পাঞ্জাবি পরিধান করে অত্যন্ত কৌশলে তারা সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের চোখের সামনেই অবাধে শত কোটি টাকার ঘুস ও দুর্নীতির মহোৎসব চালিয়ে যাচ্ছেন।


বাহ্যিক সুন্নতি লেবাসের কারণে সাধারণ মানুষ প্রথম দর্শনে তাদেরকে পরহেজগার, সৎ ও শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব মনে করে ভুল করেন। আর এই বিশ্বাসযোগ্যতার সুযোগ নিয়েই তারা শত কোটি টাকার অবৈধ সাম্রাজ্য গড়ে তুলছেন। একটি বেসরকারি টেলিভিশনের অনুসন্ধানী অনুষ্ঠান "দুর্নীতি ডায়েরি"-তে সম্প্রতি গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী কায়কোবাদ এর বিরুদ্ধে ওঠা অঢেল অবৈধ সম্পদ অর্জনের চমকপ্রদ তথ্য ও চিত্র তুলে ধরা হলে এই ভণ্ডামির ভয়াবহ চিত্র দেশবাসীর সামনে স্পষ্ট হয়।


অনুসন্ধানী সেই প্রতিবেদনে বিস্তারিত তথ্য প্রমাণ তুলে ধরে দাবি করা হয় যে, সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় নির্দিষ্ট স্কেলের বৈধ আয়ের সাথে সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে প্রকৌশলী কায়কোবাদ, তার স্ত্রী এবং ছেলে-মেয়েদের নামে বিপুল পরিমাণ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের বিশাল পাহাড় গড়ে তুলেছেন। সরকারি পদে থেকে জনগণের করের টাকায় বেতন নিয়ে এভাবে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ ও ঘুস গ্রহণের ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।


প্রশ্ন উঠেছে, যদি কোনো ব্যক্তি প্রতিনিয়ত অনৈতিকভাবে ঘুস খাবে, সরকারি অর্থ তছরুপ করবে এবং দুর্নীতিকেই জীবিকা নির্বাহের পথ হিসেবে বেছে নেবে, তবে বাহ্যিকভাবে সুন্নতি লেবাস ধারণ করার পেছনে প্রকৃত উদ্দেশ্য কী? আমাদের সমাজ বাস্তবে দেখা যায় যে, ভূমি অফিসসহ বিভিন্ন সংবেদনশীল সেবা প্রতিষ্ঠানের বহু চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারী এই ধরনের ধর্মীয় লেবাস সার্বক্ষণিক পরিধান করে থাকেন। বিশেষ করে ভূমি অফিসে যাওয়া সাধারণ মানুষ সুন্নতি লেবাস দেখলে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সম্মান প্রদর্শন করেন এবং তাদের মনে একটি ধারণা তৈরি হয় যে এই ব্যক্তি অন্তত অসৎ হতে পারেন না। দুর্নীতিবাজরা সমাজে নিজেদের ঘুসখোর পরিচয় আড়াল করতে এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার চোখ ফাঁকি দিয়ে বিশেষ সামাজিক সুবিধা ও সহানুভূতি পাওয়ার হীন উদ্দেশ্যে এই লেবাসের চরম অপব্যবহার করে থাকে।


তবে এই ভণ্ডদের মুখোশ উন্মোচন করা কোনোভাবেই সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানা নয়। বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক সাধারণ নাগরিক অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ, খোদাভীরু এবং নীতিবান। দেশের এই ঈমানদার জনপদের প্রতি সচেতন সমাজের শ্রদ্ধা সর্বদা অবিচল ও সীমাহীন। কিন্তু যেসব ভণ্ড ও প্রতারক চক্র মুখে ধর্মের দোহাই দিয়ে এবং মাথায় সুন্নতি টুপি-পোশাক চড়িয়ে প্রকাশ্যে শত কোটি টাকার ঘুস বাণিজ্য ও দুর্নীতি চালিয়ে যাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোরতম আইনি শাস্তি নিশ্চিত করা আবশ্যক।


তারা কেবল রাষ্ট্র ও জনগণের অর্থ আত্মসাৎ করছে না, বরং পবিত্র ধর্মীয় পোশাক ও মূল্যবোধের চরম অপমান করছে। এই প্রতারকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত, যাতে ভবিষ্যতে কেউ ধর্মকে দুর্নীতির সুরক্ষাকবচ হিসেবে ব্যবহার করার সাহস না পায়। কারণ চূড়ান্ত বিচারে পরম করুণাময় আল্লাহ তায়ালা অপরাধীদের সাময়িক ছাড় দেন বটে, কিন্তু কাউকেই ছেড়ে দেন না এবং বিচারিক বিচার থেকে কেউই পার পাবে না।


গণপূর্ত অধিদপ্তর আজ দেশের অন্যতম একটি দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। মূলত সরকারের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও নির্মাণ কাজের তদারকিতে নিয়োজিত এই প্রতিষ্ঠানের স্তরে স্তরে অনিয়ম স্থায়ী রূপ নিয়েছে। তবে কেবল গণপূর্ত অধিদপ্তরই নয়, বাংলাদেশের যে সমস্ত সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), বাংলাদেশ পাসপোর্ট অফিস, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), বাংলাদেশ পুলিশ, ভূমি অফিস, কাস্টমস ও আয়কর অফিস, জেলা সাব-রেজিস্ট্রার অফিস এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এই সমস্ত সেবা প্রতিষ্ঠানে সেবা নিতে গিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার সাধারণ মানুষকে চরম মানসিক ও আর্থিক হয়রানির শিকার হতে হয়। সঠিক ফাইল ছাড় করতে বা সামান্য একটি সেবা পেতে টেবিলে টেবিলে ঘুস দেওয়ার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার মূল ভিত্তিকেই কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে।


রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) দুর্নীতির রাজত্বের দিকে তাকালে অবাক করা সব তথ্য বেরিয়ে আসে। উদাহরণস্বরূপ, রাজউকের একজন সাধারণ সিকিউরিটি গার্ড আব্দুল মালেক শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের মালিক হয়ে সশরীরে রূপকথার গল্পকেও হার মানিয়েছেন। একজন সাধারণ নিরাপত্তাকর্মী হয়ে কীভাবে তিনি বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থের মালিক হলেন এবং রাজধানীজুড়ে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুললেন, তা গোটা প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক ধসকে উন্মোচিত করে। শুধু নিরাপত্তাকর্মী মালেকই নন, রাজউকের পরিদর্শকদের দিকে চোখ রাখলে দেখা যায় যে, তাদের প্রায় প্রত্যেকেই ঢাকা শহরের প্রাণকেন্দ্রে একাধিক বিলাসবহুল বহুতল বাড়ির মালিক, দামি জায়গার মালিক এবং প্রভাব খাটিয়ে হাতিয়ে নেওয়া একাধিক সরকারি প্লটের একচ্ছত্র মালিক।


রাজউকের এই দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নীতি-নৈতিকতা সম্পূর্ণ লোপ পেয়েছে। তাদের কাছে সাধারণ নকশা অনুমোদন থেকে শুরু করে প্লট বরাদ্দ কিংবা ছাড়পত্র পাওয়ার প্রতিটি পদক্ষেপে বিপুল অংকের ঘুস দেওয়া বাধ্যবাধকতায় পরিণত হয়েছে। টাকা না দিলে মাসের পর মাস ফাইল আটকে রেখে সেবাগ্রহীতাদের হয়রানির চূড়ান্ত সীমানায় নিয়ে যাওয়া হয়।


সরকারি সেবা খাতের এমন সর্বগ্রাসী অনিয়ম দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোর জন্য এক মারাত্মক হুমকি। প্রশাসনিক স্তর থেকে সুন্নতি লেবাসের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এসকল ভণ্ড ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে অবিলম্বে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। অপরাধীদের কোনো ধর্মীয় বা সামাজিক পরিচয় থাকতে পারে না। রাষ্ট্রীয় সেবা খাতগুলোকে ঘুস ও দুর্নীতিমুক্ত করতে না পারলে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের সুফল সাধারণ জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছানো কোনোভাবেই সম্ভব হবে না।


সম্প্রতি অনুসন্ধানে রাজধানীর মধ্য বাড্ডার নবমতলা এলাকায় একটি ভবন নির্মাণে অনুমোদিত নকশা লঙ্ঘনের বিষয়টি সামনে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, ভবনটিকে রক্ষা করতে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) সংশ্লিষ্ট অথরাইজড অফিসার ও ইন্সপেক্টর বিভিন্ন ধরনের গোপন কৌশল অবলম্বন করছেন। এ ঘটনায় বড় ধরনের আর্থিক লেনদেনের আভাসও পাওয়া যাচ্ছে।

বিষয়টি বর্তমানে অনুসন্ধানাধীন থাকায় এ মুহূর্তে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে না। চলমান প্রক্রিয়া শেষ হলে প্রামাণিক কাগজপত্র ও প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণসহ বিস্তারিত বিষয় প্রকাশ করা হবে।

অভিযোগ রয়েছে, ভবনটি শুধু রাজউকের অনুমোদিত নকশাবহির্ভূতভাবে নির্মাণ করা হয়নি, পাশাপাশি পাশের জমির মালিকের প্রায় আড়াই শতাংশ সম্পত্তি জোরপূর্বক দখল করে নবম তলা নির্মাণ করা হয়েছে।

এ ধরনের গুরুতর অনিয়ম ও অন্যের সম্পত্তি দখলের ঘটনায় যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করেন, তাঁরা সমাজ ও আইনের শাসনের জন্য ক্ষতিকর। অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের শনাক্ত করা এবং প্রমাণিত হলে তাঁদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি।

আকাশজমিন / আরআর 



এ সম্পর্কিত আরো খবর