সড়কের মাঝখান দিয়ে বিশেষ বাস চলাচল করবে এবং যাত্রীরা কোনো যানজট বা সিগন্যালে আটকে থাকবেন না—এমন সোনালী স্বপ্ন নিয়ে শুরু হয়েছিল বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত বহুল আলোচিত বাস র্যাপিড ট্রানজিট বা বিআরটি প্রকল্প। কিন্তু চার বছরের নির্ধারিত এই মেগা প্রকল্পের কাজ দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে চলতে থাকলেও সড়কে একটি বিশেষ বাসও নামানো সম্ভব হয়নি। উল্টো ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ২০ কিলোমিটার এই পুরো পথে তীব্র যানজট এবং সাধারণ মানুষের সীমাহীন দুর্ভোগ বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। অবশেষে দীর্ঘ এই জনদুর্গোগ, পরিকল্পনার গলদ ও বিশৃঙ্খলার অবসান ঘটিয়ে প্রকল্পটি পুরোপুরি বাতিল করে বিদ্যমান অবকাঠামোকে একটি সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তর করার যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে গাজীপুরের এই বিআরটি প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিস্তারিত ও চুলচেরা আলোচনা হয়। এর পরদিন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ থেকে জারি করা এক অফিসিয়াল পত্রে সভার সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তসমূহ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়। মন্ত্রিসভার এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বিআরটি করিডরের ঝুঁকিপূর্ণ ও অসম্পূর্ণ স্টেশন এবং মাঝখানের লেন বিভাজক বা ডিভাইডার সম্পূর্ণরূপে অপসারণ করে এই বিশালাকার মহাসড়কটিকে তিন থেকে ছয় লেনের একটি সাধারণ ও সাবলীল মহাসড়কে রূপান্তর করার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সাথে প্রকল্পের আওতায় থাকা দুটি দুই লেনের উড়ালসড়ক প্রশস্ত করে চার লেনে রূপান্তর করার সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন সহযোগীদের সাথে দ্রুত আলোচনা করে সব ধরনের আইনি জটিলতার অবসান ঘটাতে এবং প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধের প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করতে বলা হয়েছে। এছাড়া বিআরটি পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ‘ঢাকা বাস র্যাপিড ট্রানজিট কোম্পানি’ চিরতরে বিলুপ্ত করে এর যাবতীয় কার্যক্রম সরাসরি সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) আওতাধীন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। মন্ত্রিসভায় গৃহীত এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে জরুরি ভিত্তিতে দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং প্রতি মাসের ৩ তারিখের মধ্যে কাজের নিয়মিত অগ্রগতি প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে বলা হয়েছে।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১২ সালে বিমানবন্দর থেকে গাজীপুরের শিববাড়ী পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই বিআরটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ১৫ দশমিক শূন্য ৭ কিলোমিটার ছিল সমতল সড়কপথ এবং বাকি অংশ ছিল উড়ালপথ। এই প্রকল্পের মূল পরিকল্পনা ছিল সড়কের মাঝখান দিয়ে দুটি পৃথক লেনে বিশেষ বাস চলাচল করবে এবং প্রতিদিন প্রায় ২৫ হাজার যাত্রী কোনো ধরনের সিগন্যাল বা যানজটের ঝামেলা ছাড়াই দ্রুত যাতায়াত করতে পারবেন।
মূলত বিদেশি অর্থায়নের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক বা এডিপির পাশাপাশি এতে যৌথভাবে অর্থায়ন করছে ফরাসি উন্নয়ন সংস্থা বা এএফডি এবং গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট ফ্যাসিলিটি বা জিইএফ। প্রকল্পটির প্রাক্কলিত প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ২ হাজার ৪০ কোটি টাকা। শুরুতে ২০১৬ সালের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করে ২০১৭ সাল থেকে আধুনিক স্বয়ংক্রিয় দরজার বিশেষ বাস চালুর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কিন্তু চরম অব্যবস্থাপনা ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে তা নির্ধারিত সময়ে শেষ হয়নি। পরবর্তীতে তিন দফা সংশোধনের মাধ্যমে এই প্রকল্পের মোট ব্যয় নাটকীয়ভাবে বেড়ে ৪ হাজার ৬৮ কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকে।
এর মধ্যে ইতিমধ্যে সরকারি কোষাগার থেকে ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা বেহিসাব খরচ করা হয়েছে। গত ২০২৫ সালে এই প্রকল্পের চতুর্থ দফা সংশোধনের প্রস্তাব পেশ করা হলে সেখানে ব্যয় বাড়িয়ে ৬ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকা এবং প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৯ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর পাঁয়তারা করা হয়েছিল। তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি বা একনেক সেই সংশোধিত প্রস্তাব পুরোপুরি নাকচ করে দেয়। বরং প্রকল্পের বিকল্প লাভজনক উপায় খুঁজতে এবং নকশাগত মারাত্মক ত্রুটির জন্য ঠিকাদার বা দায়ী সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করার কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
বিআরটি প্রকল্প নিয়ে চূড়ান্ত এই সিদ্ধান্তের আগে পুরো প্রকল্পটির চুলচেরা কারিগরি ও প্রযুক্তিগত দিক বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে বা বুয়েটের একটি দক্ষ বিশেষজ্ঞ দল। বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের প্রখ্যাত অধ্যাপক সামছুল হকের নেতৃত্বে গঠিত এই বিশেষজ্ঞ দলটি গত বছর অক্টোবর মাসে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক মন্ত্রণালয়ে তাদের সুনির্দিষ্ট মূল্যায়ন প্রতিবেদন জমা দিয়েছিল।
বিশেষজ্ঞ দলটি তাদের সেই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদনে এই প্রকল্পটিকে দেশের সামগ্রিক অবকাঠামো পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ইতিহাসে একটি চরম ‘পদ্ধতিগত ব্যর্থতার’ জলন্ত উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। যথাযথ কারিগরি সমীক্ষা, দক্ষ জনবল এবং নীতিনির্ধারক মহলে জবাবদিহির তীব্র অভাবেই এই নজিরবিহীন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে দলটির প্রতিবেদনে দ্ব্যর্থহীনভাবে তুলে ধরা হয়। মূলত প্রকল্পের প্রাথমিক পরিকল্পনা ও নকশায় মারাত্মক ত্রুটি এবং বিভিন্ন সেবা সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণেই এই মহা বিপর্যয় ঘটে। বিশেষজ্ঞরা জানান, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে উত্তরা থেকে কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত আরেকটি বিআরটি পথ নির্মাণের সুদূর প্রসারী পরিকল্পনা ছিল।
কিন্তু গাজীপুর-বিমানবন্দর মূল পথটি সময়মতো চালুর মুখ না দেখায় সেই দ্বিতীয় প্রকল্পটি বাধ্য হয়ে বাতিল করতে হয়। ফলে সামগ্রিকভাবে এই গাজীপুর-বিমানবন্দর অংশের মূল কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন ওঠে। পাশাপাশি আরও একটি বড় প্রযুক্তিগত ত্রুটি ছিল যে, বাংলাদেশে সাধারণ প্রচলিত বাসগুলোর দরজা বাঁ দিকে অবস্থিত। অথচ আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের বিআরটি লেনে স্টেশনগুলো এমন অভিনব কায়দায় তৈরি করা হয়েছিল যেখানে বাসের দরজা ডান দিকে হওয়া বাধ্যতামূলক। অবশ্য আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী বিআরটি লেনে ডান দিকের দরজাওয়ালা বাসই চলাচল করে থাকে। কিন্তু সমস্যা হলো, ডান দিকে নির্দিষ্ট দরজাওয়ালা বিশেষ বাস যদি চালু করাও হতো, তবে সেই বাসগুলো কোনোভাবেই গাজীপুর-বিমানবন্দরের নির্দিষ্ট সীমানার বাইরে সাধারণ সড়কে চলতে পারত না।
বুয়েট বিশেষজ্ঞ দলের প্রধান অধ্যাপক সামছুল হক প্রথম আলোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট মত দিয়ে বলেন, বিআরটি প্রকল্প নিয়ে বর্তমানে সম্ভাব্য যতগুলো বিকল্প রাস্তা খোলা রয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে বুদ্ধিদীপ্ত ও বাস্তবসম্মত বিকল্প হলো এই ব্যর্থ প্রকল্পটিকে চিরতরে বাতিল করে দেওয়া। তবে দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে গাজীপুরবাসীসহ এই ব্যস্ততম পথের নিয়মিত যাত্রীরা যে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ ও কষ্ট সহ্য করেছেন, তাদের জন্য দ্রুত বিকল্প কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তিনি পরামর্শ দিয়ে বলেন, গাজীপুরবাসীর যাতায়াত সহজ করতে কমলাপুর পর্যন্ত আধুনিক কমিউটার ট্রেন সেবা দ্রুত চালু করা যেতে পারে। কারণ এর মধ্যে রেলওয়ের তৃতীয় ও চতুর্থ লাইনের নির্মাণকাজ প্রায় শেষের পথে। এই প্রকল্প বাতিল করে এটিকে একটি উচ্চগতির মহাসড়কে রূপান্তর করা হলে গাজীপুরের বিশাল শিল্পাঞ্চলের লাখ লাখ ব্যবহারকারী ও সাধারণ মানুষ সরাসরি উপকৃত হবেন।
তবে সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিপরীতে ভিন্নমতও রয়েছে। গাজীপুর ঐতিহ্য ও উন্নয়ন নামে স্থানীয় একটি সামাজিক সংগঠন প্রকল্পটি সম্পন্ন করে বিশেষ বাস চালুর জোরালো দাবি জানিয়ে আসছে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে একাধিক সংবাদ সম্মেলন করা হয়েছে এবং সরকারের বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের দপ্তরে লিখিত চিঠি পাঠানো হয়েছে। সংগঠনটির সভাপতি মো. শামসুল হক সংবাদমাধ্যমকে জানান, দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে গাজীপুরের সাধারণ মানুষকে যে চরম দুর্ভোগ ও নরকযন্ত্রণা পোহাতে হয়েছে, তার পর প্রকল্পের কাজ যখন প্রায় ৯৭ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে, ঠিক এই মুহূর্তে এসে তা বাতিল করা কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত বা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
তারা সরকারের এই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে পুনরায় চিঠি দেবেন বলে জানান। অন্যদিকে, প্রকল্প বাতিলের বড় ধরনের আর্থিক প্রভাব ও ঝুঁকি নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছে দেশের স্বনামধন্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স বা বিআইপি। তারা গত বছর আয়োজিত এক সেমিনারে জোরালো দাবি জানিয়েছিল যে, অবকাঠামোগত নির্মাণকাজের মাত্র ৩ শতাংশ বাকি থাকতে হঠাৎ প্রকল্প বাতিল করা মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। তাদের হিসাব অনুযায়ী, এই প্রকল্প মাঝপথ থেকে সম্পূর্ণ বাতিল করতে গেলে বিদ্যমান স্টেশন, র্যাম্প ও চলন্ত সিঁড়ি অপসারণ করতে এবং দেশি-বিদেশি ঠিকাদারদের বিশাল অংকের ক্ষতিপূরণ পরিশোধ করতে সরকারের অতিরিক্ত এক হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় হতে পারে।
প্রকল্পের বাস্তব মাঠপর্যায়ের চিত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত পুরো মহাসড়কের মাঝখানে প্রায় ১৫টি আধুনিক স্টেশন অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছিল। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, একটি স্টেশনের কাজও আজও শতভাগ সম্পন্ন হয়নি। যাত্রীদের নিরাপদে সড়ক পারাপার ও ওঠানামার জন্য বেশ কয়েকটি ব্যয়বহুল পদচারী-সেতু বা ওভারব্রিজ নির্মাণ করা হলেও সেগুলোতে আধুনিক চলন্ত সিঁড়ি ও লিফট স্থাপন করা হয়েছে।
কিন্তু দীর্ঘ অবহেলা ও অযত্নে পড়ে থেকে এসব আধুনিক স্থাপনার অনেকগুলোই এখন সম্পূর্ণ ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। কোথাও যন্ত্রপাতিতে মরিচা ও জং ধরে নষ্ট হয়ে গেছে, আবার কোথাও অরক্ষিত অবকাঠামো ভেঙে পড়ছে। বিআরটি যাতায়াত লেন আলাদা করার জন্য ব্যস্ত সড়কের মাঝখানে শক্ত কংক্রিটের প্রতিবন্ধক বা ডিভাইডার বসানো হয়েছে। কোথাও কোথাও আবার লোহার বেড়া দেওয়া হয়েছে। এসকল অপরিকল্পিত ব্যবস্থার কারণে সড়কের প্রশস্ততা মারাত্মকভাবে কমে গেছে। কোথাও উড়ালপথ, কোথাও সমতল সড়ক আবার কোথাও অতিরিক্ত সরু লেন থাকার কারণে প্রতিদিন সাধারণ যানবাহন চলাচলে চরম বিপত্তি ও দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে।
এই প্রকল্প পুরোপুরি বাতিল করার কারণে এখন এই অসমাপ্ত স্টেশনগুলো ভেঙে ফেলার কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অবশ্য এর ভেতরে থাকা লিফট ও অন্যান্য মূল্যবান যন্ত্রপাতি অন্য কোনো জনগুরুত্বপূর্ণ স্থানে পুনর্বিন্যাস করে ব্যবহারের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর। এই গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কটি দিয়ে প্রতিদিন শুধু গাজীপুর নয়, বরং বৃহত্তর ময়মনসিংহ, উত্তরবঙ্গ ও টাঙ্গাইল জেলার কোটি কোটি মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করে থাকেন। অথচ দীর্ঘ ১৪ বছরের এই দীর্ঘমেয়ী নির্মাণকাজ চলার সময় নানা অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও ক্রেন দুর্ঘটনার মতো মর্মান্তিক ঘটনায় অন্তত সাতজন সাধারণ মানুষের তাজা প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে, যা দেশবাসীকে সবসময় আতঙ্কিত করেছে।
শুরু থেকেই এই মেগা প্রকল্পের পরিকল্পনা ও রূপায়ণে মারাত্মক ত্রুটি ছিল বলে সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞ মহল মনে করেন। নির্ভরযোগ্য বিভিন্ন সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভুল সমীক্ষা এবং চূড়ান্ত নকশা ছাড়াই মূলত হঠকারীভাবে এই জনদুর্ভোগের প্রকল্পটি অনুমোদন করা হয়েছিল। পরবর্তীতে যখন পুরোদমে নির্মাণকাজ শুরু হয়, তখন ভয়াবহভাবে ধরা পড়ে যে প্রকল্প এলাকায় কোনো ধরনের যথাযথ পয়োনিষ্কাশন বা ড্রেনেজ ব্যবস্থা নেই। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তাঘাট ও নির্মাণাধীন এলাকায় হাঁটু পানি জমে জলমগ্ন হয়ে পড়ে।
এছাড়া সড়কের নিচ দিয়ে যাওয়া বিভিন্ন সেবা সংস্থার গ্যাস, পানি ও বিদ্যুতের লাইনগুলো নিরাপদে সরানোর কোনো পূর্বপরিকল্পনা বা সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। সবচেয়ে বড় কথা হলো, দেশের অন্যতম ব্যস্ততম একটি মহাসড়কে দিনরাত নির্মাণকাজ চলার সময় সাধারণ যানবাহন ও যাত্রীদের নির্বিঘ্ন চলাচল সচল রাখার মতো কোনো কার্যকর বিকল্প ব্যবস্থাও ঠিকাদাররা রাখেননি। এতসব গাফিলতি ও অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ডের পেছনে প্রধানত তিনটি সরকারি সংস্থা সরাসরি জড়িত ছিল—সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর বা সওজ, সেতু বিভাগ এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর বা এলজিইডি। বুয়েটের বিশদ বিশেষজ্ঞ প্রতিবেদনে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলা হয়েছে যে, এই অপরিকল্পিত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রস্তুতকারী, ত্রুটিপূর্ণ নকশা প্রণয়নকারী পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এবং পুরো পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের সাথে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত অদক্ষ সরকারি কর্মকর্তাদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক জবাবদিহির মুখোমুখি করা উচিত।
এছাড়া এই প্রকল্পের সাথে সরাসরি জড়িত অর্থায়নকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা, প্রকল্প পরিচালনা কমিটি, বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ বা আইএমইডি এবং খোদ পরিকল্পনা কমিশনের ভূমিকা ও অবহেলা কতটুকু ছিল, তা নিয়ে উচ্চপর্যায়ের পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনার জোরালো সুপারিশ করা হয়েছে। দীর্ঘ ১৪ বছরের এই সীমাহীন ভোগান্তি ও হাজার হাজার কোটি টাকার অপচয়ের পর এই প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্ত দেশের মেগা প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় একটি বড় ও অবশ্যম্ভাবী শিক্ষা হয়ে থাকবে বলে মনে করছেন দেশসেরা বিশেষজ্ঞরা।