বলিউডে অ্যাকশন তারকা হিসেবে সমান জনপ্রিয় অভিনেতা টাইগার শ্রফ হঠাৎ বন্দুকধারীদের প্রাণঘাতী হামলার শিকার হয়েছেন। সোমবার সন্ধ্যায় মুম্বাইয়ের ব্যস্ততম জুহু এলাকায় তাঁর ব্যক্তিগত গাড়ি লক্ষ্য করে অতর্কিতে গুলি চালায় দুষ্কৃতকারীরা। এই নজিরবিহীন হামলায় অভিনেতা টাইগার শ্রফ নিজে সামান্য আহত হলেও দুর্ভাগ্যবশত তাঁর গাড়িচালক ও এক পথচারী সরাসরি গুলিবিদ্ধ হন। বিনোদন জগতের অত্যন্ত বিনয়ী ও প্রচারবিমুখ হিসেবে পরিচিত এক অভিনেতার ওপর এমন সশস্ত্র হামলায় থমকে গেছে পুরো ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি। একই সঙ্গে মেগাস্টারদের সার্বিক নিরাপত্তা ও জীবনরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে তৈরি হয়েছে তীব্র আতঙ্ক ও গভীর উদ্বেগ।
বাস্তবে বলিউডে বন্দুকধারীদের হামলা বা মুম্বাইয়ের আন্ডারওয়ার্ল্ড গ্যাংগুলোর তরফ থেকে তোলা আদায়ের হুমকি নতুন কোনো বিষয় নয়। নব্বইয়ের দশক থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সময়েও একের পর এক সুপারস্টার, খ্যাতিমান নির্দেশক ও তরুণ তারকাদের বাসস্থান বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে প্রকাশ্যে গুলিবর্ষণের মতো বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। টাইগার শ্রফের ওপর সাম্প্রতিক এই হামলার পর তারকাদের ওপর ঘটে যাওয়া অতীত ও বর্তমানের আলোচিত কিছু সশস্র আক্রমণের ঘটনা ফের প্রকাশ্যে উঠে এসেছে।
বলিউডের মোস্ট এলিজিবল ব্যাচেলর সালমান খানের ওপর ২০২৪ সালের ১৪ এপ্রিল গভীর রাতে এক ভয়াবহ হামলার ঘটনা ঘটে। মুম্বাইয়ের অভিজাত বান্দ্রা এলাকায় অবস্থিত সালমানের বাসভবন গ্যালাক্সি অ্যাপার্টমেন্ট লক্ষ্য করে বাইকে চড়ে এসে এলোপাতাড়ি গুলি চালিয়ে পালিয়ে যায় সশস্ত্র দুষ্কৃতকারীরা। পরবর্তীতে কুখ্যাত লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাং ওই হামলার দায় স্বীকার করে। ঘটনার পরপরই সালমান খানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাজ্য সরকারের নির্দেশে ব্যাপক মাত্রায় জোরদার করা হয়।
এর আগে ২০০০ সালের ২১ জানুয়ারি ভারতের অন্যতম শীর্ষ সফল প্রযোজক ও পরিচালক রাকেশ রোশানও (অভিনেতা হৃতিক রোশানের বাবা) প্রকাশ্য দিবালোকে বন্দুকধারীদের আক্রমণের শিকার হন। মুম্বাইয়ের পশ্চিম সান্তাক্রুজ এলাকার তিলক রোডে নিজ কার্যালয়ের সামনে অজ্ঞাত দুই হামলাকারী তাঁকে লক্ষ্য করে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে গুলি ছোড়ে। একটি গুলি তাঁর বাঁ হাতে লাগে এবং অপর একটি গুলি বুক ঘেষে চলে যায়। অত্যন্ত আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হলে ভাগ্যক্রমে চিকিৎসকদের চিকিৎসায় বেঁচে যান এই প্রবীণ নির্মাতা।
তবে তৎকালীন আন্ডারওয়ার্ল্ডের নির্মম আক্রমণের শিকার হয়ে জীবন দিতে হয়েছিল মিউজিক মোগল খ্যাত ‘টি-সিরিজ’-এর প্রতিষ্ঠাতা গুলশান কুমারকে। ১৯৯৭ সালের আগস্টে মুম্বাইয়ের আন্ধেরি এলাকায় অবস্থিত জিতেশ্বর মহাদেব মন্দিরের বাইরে প্রকাশ্যে তাঁকে গুলি করে নির্মমভাবে হত্যা করে অস্ত্রধারীরা। সে সময় ঘাতকরা তাঁকে হত্যা নিশ্চিত করতে অন্তত ১৬ রাউন্ড গুলি চালিয়েছিল, যা পুরো ভারতের বিনোদন জগতে শোকের ছায়া ফেলে দেয়।
বলিউডের গ্ল্যামারাস অভিনেত্রী দিশা পাটানির পরিবারও এই গ্যাংস্টার কালচারের নির্মম শিকার হয়েছে। ২০২৫ সালের ১২ সেপ্টেম্বর উত্তরপ্রদেশের বেরিলিতে অবস্থিত দিশা পাটানির পৈতৃক বাড়ির বাইরে আচমকা হামলা চালিয়ে প্রায় ৮ থেকে ১০ রাউন্ড গুলি ছোড়ে দুষ্কৃতকারীরা। তদন্তে উঠে আসে, এই হামলার নেপথ্যে কলকাঠি নেড়েছিল গ্যাংস্টার গোল্ডি ব্রারের চক্র। ঘটনাটি স্পষ্ট করে দেয় যে কেবল মুম্বাই নয়, তারকাদের মফস্বলে থাকা পরিবারগুলোও আজ কতটা অনিরাপদ।
একইভাবে ‘বিগ বস ওটিটি টু’ বিজয়ী জনপ্রিয় ইউটিউবার এলভিশ যাদবও প্রাণঘাতী হুমকির মুখে পড়েছিলেন। ২০২৫ সালের ১৭ আগস্ট গুরুগ্রামে অবস্থিত তাঁর ব্যক্তিগত বাসভবন লক্ষ্য করে মোটরসাইকেলে আসা তিনজন ব্যক্তি ২৪ রাউন্ডেরও বেশি গুলি বর্ষণ করে। ভাগ্যক্রমে এলভিশ ঘটনার সময় বাড়িতে না থাকলেও তাঁর পরিবারের সদস্যরা ভেতরেই উপস্থিত ছিলেন। পরবর্তীতে 'দ্য বহু গ্যাং' এই হামলার দায় স্বীকার করে এবং পুলিশ অভিযান চালিয়ে দুজনকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে।
বলিউডের স্পষ্টভাষী ও বিতর্কিত অভিনেত্রী এবং বর্তমানে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সংসদ সদস্য কঙ্গনা রাণৌতও বন্দুকধারীদের নিশানায় পড়েছিলেন। ২০২০ সালের আগস্টে মধ্যরাতে হিমাচল প্রদেশের মানালিতে অবস্থিত তাঁর ব্যক্তিগত বাসভবনের বাইরে আচমকা গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। যদিও ওই ঘটনায় কেউ হতাহত হননি, তবুও স্পষ্টভাষী তারকাদের জীবন যে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, এই ঘটনা তার একটি বড় প্রমাণ হয়ে দাঁড়ায়।
নব্বইয়ের দশকের অন্যতম হিট থ্রিলার সিনেমা ‘গুপ্ত’-এর পরিচালক রাজীব রাই ১৯৯৭ সালে অলৌকিকভাবে প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন। মুম্বাইয়ের মধ্যাঞ্চলে তাঁর কার্যালয় থেকে বের হওয়ার সময় আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন আবু সালেম গ্যাংয়ের পাঁচ সদস্য তাঁকে ঘিরে ধরে গুলি ছোড়ে। কিন্তু পূর্বেই গোয়েন্দা সংস্থা মারফত হত্যার হুমকি পাওয়ায় তাঁর সঙ্গে থাকা সতর্ক পুলিশ সদস্যরা দ্রুত পাল্টা গুলি চালিয়ে হামলাকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেন। এই বন্দুকযুদ্ধে এক হামলাকারী মারাত্মক আহত হয়েছিল।
কেবল ভারতেই নয়, দেশের বাইরেও ভারতীয় তারকাদের ওপর এমন সন্ত্রাসী হামলার খবর পাওয়া গেছে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে কানাডায় অবস্থানরত জনপ্রিয় পাঞ্জাবি গায়ক এপি ধিলনের বাড়ির সামনে এক ভয়াবহ গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের এক ঘনিষ্ঠ সহযোগী বলিউডের সঙ্গে গায়কের গভীর যোগাযোগ থাকার অজুহাতে এই হামলা পরিচালনা করে। পরবর্তীতে কানাডিয়ান পুলিশ অভিযান চালিয়ে অভিজিৎ কিংরা নামে এক হামলাকারীকে গ্রেপ্তার করে এবং আদালত তাকে ৬ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেন।
একইভাবে জনপ্রিয় কমেডিয়ান কপিল শর্মার মালিকানাধীন কানাডার একটি রেস্তোরাঁর বাইরে গত বছরের ১০ জুলাই গুলি চালায় গোল্ডি ব্রার গ্যাংয়ের সদস্য মানসিং সেখন। ঘটনার পর সেখন ভারতে পালিয়ে এলেও পরবর্তীতে পুলিশের হাতে ধরা পড়েন।
সবশেষে জুহু এলাকায় টাইগার শ্রফের গাড়িতে সশস্ত্র হামলা প্রমাণ করে যে ভারতের বিনোদন জগতে তারকাদের নিরাপত্তার ঝুঁকি এখন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছে।