ক্যানসারের মতো মরণব্যাধির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কেবল ওষুধ আর থেরাপি নয়, রোগীর মানসিক শক্তি ও ভালোবাসাই যে বেঁচে থাকার সবচেয়ে বড় রসদ—তা আবারও প্রমাণ করল ছোটপর্দার জনপ্রিয় পরিচিত মুখ ও উপস্থাপক সামিয়া আফরিনের পরিবার। ডিম্বাশয় (ওভারিয়ান) ক্যানসারের চিকিৎসায় কেমোথেরাপির মুখোমুখি হওয়া সামিয়াকে চুল হারানোর বেদনায় একা হতে দেননি তাঁর প্রিয়জনেরা। স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও অনন্য সংহতি জানাতে নিজেরা হাসিমুখে মাথা ন্যাড়া করেছেন সামিয়ার স্বামী এস এম রেজাউল ইমরান এবং বড় ছেলে আহানাফ আরাবি।
দীর্ঘদিন ধরে মরণব্যাধি ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়ে যাওয়া সামিয়া আফরিন ডিম্বাশয়ের ক্যানসারের চিকিৎসায় বর্তমানে দেশে কেমোথেরাপি নিচ্ছেন। চিকিৎসকের পূর্ব পরামর্শ অনুযায়ী কেমোথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় মাথার চুল ঝরে পড়ার বিষয়টি মানসিকভাবে মানিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। নিজের চুল ছোট করে কাটার পর অবশেষে বড় ছেলে আহানাফ আরাবির হাতে মাথা ন্যাড়া করান সামিয়া। কিন্তু সন্তান কেবল মায়ের চুল কেটে ক্ষান্ত হননি; মায়ের এই কঠিন লড়াইয়ে সংহতি জানাতে ও মানসিক সমর্থন জোগাতে নিজের মাথার চুলও মুহূর্তে ফেলে দিয়ে মায়ের সামনে হাসিমুখে উপস্থিত হন। স্ত্রীর এই মানসিক যুদ্ধে তাঁকে একটুও একা অনুভব করতে না দিতে একই ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নেন স্বামী রেজাউল ইমরানও। তিনিও নিজ মাথার চুল কেটে ন্যাড়া হয়ে স্ত্রীর পাশে এসে দাঁড়ান।
পরিবারের এমন অভাবনীয় ভালোবাসা নিয়ে সামিয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, চুল মানুষের বাহ্যিক সৌন্দর্য হলেও জীবনযুদ্ধে টিকে থাকার জন্য আসল হলো ভেতরের আত্মবিশ্বাস। ক্যানসারের এই কঠিন দিনগুলোতে পরিবারের এই অবিচল সমর্থন তাঁর ভেতরের মনোবল বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
সামিয়া আফরিনের ক্যানসারের সঙ্গে এই পথচলা নতুন নয়। ২০২২ সালে প্রথমবার তাঁর কোলন ক্যানসার ধরা পড়ে, যা পরবর্তী সময়ে সিঙ্গাপুরে পরীক্ষার পর চতুর্থ পর্যায়ে (স্টেজ ফোর) পৌঁছেছে বলে নিশ্চিত করেন চিকিৎসকেরা। সেই চরম হতাশাজনক খবর পাওয়ার পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়লেও পরিবার, বাবা-মা ও স্বামীর সহচর্যে এবং সিঙ্গাপুরে ব্যয়বহুল ইমিউনোথেরাপি নেওয়ার মাধ্যমে নতুন করে জীবনের স্বাভাবিক ছন্দে ফিরছিলেন তিনি। কিন্তু নিয়মিত ফলোআপের অংশ হিসেবে সম্প্রতি জেনেটিক পরীক্ষায় ফের তাঁর ডিম্বাশয়ে ক্যানসার ধরা পড়ে। গত ২২ জুলাই সিঙ্গাপুরে জটিল অস্ত্রোপচারের পর বর্তমানে ঢাকায় তাঁর কেমোথেরাপির ছয়টি কোর্সের ধারাবাহিক চিকিৎসা চলছে।
মায়ের জীবন বাঁচাতে এবং সার্বক্ষণিক কাছে থেকে সেবা করতে কানাডায় পড়াশোনা বাদ দিয়ে দেশে ফিরে আসেন বড় ছেলে আহানাফ আরাবি। মায়ের প্রতি গভীর ভালোবাসার কথা জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, “মাকে সাপোর্ট দেওয়ার জন্যই নিজের চুল কেটে ফেলেছি। বন্ধুরা কারণ জানতে চাইলে বলেছি এবং সবাই আমাদের সাপোর্ট করেছে।” ক্যানসারের তীব্র শারীরিক যন্ত্রণা, মুখ লাল হয়ে যাওয়া ও খাবারের স্বাদ না পাওয়ার কষ্টের মাঝেও সামিয়া বর্তমানে ‘পারপাস বাই সামিয়া’ পডকাস্ট এবং উজ্জ্বলা ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে ক্যানসার আক্রান্ত রোগীদের মানসিক শক্তি বৃদ্ধি, সচেতনতা তৈরি এবং সামাজিক কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছেন। ক্যানসার জয়ের এই দীর্ঘ ও কঠিন যুদ্ধে পরিবারের এই ভালোবাসা আজ বিশ্বজুড়ে হাজারো ক্যানসার রোগীর কাছে আশার আলো হয়ে উঠেছে।