গাজীপুর
প্রতিনিধি
গাজীপুরের
টঙ্গীর আউচপাড়া এলাকার একটি আবাসিক মাদরাসায় মাত্র ছয় বছর বয়সী
কোমলমতি এক শিশুকে যৌন
নিপীড়নের মারাত্মক অভিযোগ এবং পরবর্তীতে অভিযুক্ত শিক্ষককে মারধরের ঘটনার পর এবার জনসমক্ষে
মুখ খুলেছেন ও সংবাদ সম্মেলন
করেছেন ভুক্তভোগী শিশুটির বাবা শাহজালাল রুমি।
শনিবার
(২৪ অক্টোবর) গভীর রাতে গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে এবং আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি পুরো ঘটনার বিবরণ দিয়ে তার বিরুদ্ধে ওঠা সকল মনগড়া ও ভিত্তিহীন অভিযোগ
জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। এ সময় তিনি
কান্নায় ভেঙে পড়ে তার ছোট মেয়ের ওপর চালানো পৈশাচিক নির্যাতনের সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন এবং দেশবাসীর কাছে সার্বিক সহযোগিতা কামনা করেন।
সংবাদ
সম্মেলনে ক্ষোভ প্রকাশ করে ভুক্তভোগী শিশুর বাবা শাহজালাল রুমি বলেন, ‘আমি আমার ছোট্ট সন্তানের ন্যায়বিচার চাইতে মাদরাসায় গিয়েছিলাম, কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা মব সৃষ্টি
করতে নয়। অথচ প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে সম্পূর্ণ মিথ্যা দাবি করা হচ্ছে যে আমি নাকি
সেখানে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মব সৃষ্টি করেছি
এবং ফ্ল্যাট দখল করতে গিয়েছিলাম। আমি কেন অনর্থক মব সৃষ্টি করতে
যাব? যদি আমি সেখানে মব বা জনতা
তৈরি করতাম, তবে ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা প্রায় দুই শতাধিক লোক আমাকে কেন প্রতিহত বা মারধর করল
না? আমি তো কেবল একজন
সাধারণ বাবা হিসেবে আমার বুকের ধনের সঙ্গে ঘটে যাওয়া অমানবিক ঘটনার একটু সুবিচার চাইতে গিয়েছিলাম।’
মাদরাসা
ভাঙচুরের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি নিজের মুখেই স্বীকার করছি যে, ঘটনার সময় সেখানে ছোট একটি কাচের গ্লাস ভেঙেছিল। আমি ইতোমধ্যে স্পষ্ট জানিয়েছি যে, ওই ভাঙচুরের সমস্ত
আর্থিক ক্ষতিপূরণ আমি নিজ দায়িত্বে দিয়ে দেব। তবে সত্য কথা হলো, অভিযুক্ত শিক্ষক ঘটনাস্থলে আসার আগেই দুর্ঘটনাবশত বা উত্তেজনার মুখে
গ্লাসটি ভেঙেছিল। সেই পুরো ঘটনার বাস্তব ভিডিও রেকর্ডও আমাদের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। আমি কখনোই ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর চালাতে চাইনি।’
অন্যদিকে
মাদরাসা কর্তৃপক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে ১৭ লাখ টাকা
হাতিয়ে নেওয়ার যে গুরুতর অভিযোগ
তোলা হয়েছে, সেটির তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে রুমি বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানে আধুনিক সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা রয়েছে। আমি আসলে কোথায় ১৭ লাখ টাকা
নিয়ে গেছি বা কোথায় পেলাম,
সেটি সিসিটিভি ফুটেজ খুঁটিয়ে দেখে নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা হোক। এছাড়া একটি আবাসিক মাদরাসায় এত বিপুল পরিমাণ
নগদ টাকা কিভাবে এবং কোন উদ্দেশ্যে রাখা হয়, সেই বিষয়টিও পরিষ্কার করা দরকার। আমার বিরুদ্ধে যেসব মিথ্যা ও বানোয়াট অভিযোগ
ছড়ানো হচ্ছে, আমি সেগুলোর একটি সুষ্ঠু ও আইনানুগ তদন্ত
চাই।’
মাদরাসা
কর্তৃপক্ষের করা বিভিন্ন বক্তব্যের সরাসরি বিরোধিতা করে তিনি আরও বলেন, ‘আমি মূলত কোনো দ্বিনি শিক্ষার প্রতিষ্ঠান বা শিক্ষকদের সামগ্রিকভাবে
বিরুদ্ধে নই। আমি পরম বিশ্বাস ও আস্থার সাথে
আমার আদরের মেয়েকে ধর্মীয় শিক্ষার জন্য ওই প্রতিষ্ঠানে পাঠিয়েছিলাম।
কিন্তু যেখানে আমার সন্তান নিজের জীবন ও শরীর নিয়ে
সম্পূর্ণ নিরাপদ নয়, সেখানে এমন জঘন্য ঘটনা ঘটলে একজন অসহায় বাবা হিসেবে আমার আর কী করার
থাকে? আমি পবিত্র ইসলাম ধর্ম বা প্রকৃত আলেম
সমাজের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলছি না। কিন্তু যারা ধর্মীয় মুখোশ ও পরিচয়কে আড়াল
হিসেবে ব্যবহার করে জঘন্য অপরাধ করে এবং সত্য ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার অপচেষ্টা চালায়, আমি মূলত তাদের বিরুদ্ধে কথা বলছি।’
নিজের
মানসিক অবস্থার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘এই মর্মান্তিক ঘটনা
ঘটার পর থেকে আমি
গত কয়েক দিনে এক মুহূর্তের জন্যও
ঠিকমতো ঘুমাতে পারিনি। আমার দিনরাত কীভাবে কাটছে, তা একমাত্র মহান
আল্লাহ তাআলাই ভালো জানেন। আমার জায়গায় যদি অন্য কোনো সাধারণ বাবা থাকত, তবে পরিস্থিতি এর চেয়েও অনেক
বেশি খারাপ হতে পারত। আমি তো রক্ত-মাংসের
একজন মানুষ ও বাবা। আমার
ছোট্ট মেয়ের সঙ্গে এত বড় ঘটনা
ঘটার কথা শোনার পর নিজের রাগ
ও মানসিক নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা আমার জন্য অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।’
অভিযোগ
জানানোর পরও কর্তৃপক্ষের উদাসীনতার কথা উল্লেখ করে শাহজালাল রুমি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এই ন্যক্কারজনক ঘটনার
বিষয়ে আমি ঠিক তিন দিন আগেই প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষের কাছে লিখিত ও মৌখিক অভিযোগ
জানিয়েছিলাম। কিন্তু তিনি কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে বারবার
কালক্ষেপণ করেছেন এবং বলেছেন যে তিনি কিছুই
জানেন না। আমি তার কক্ষের বাইরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা
করেছি। পরবর্তীতে যখন বাধ্য হয়ে তার সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে গিয়েছি, তখন তিনি এমন চরম ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করেছেন যেন তিনি আমার মতো কোনো অভিভাবকের সঙ্গেই দেখা করতেই চাননি। আমার প্রশ্ন হলো, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ জানানোর পরও কেন কোনো আইনি বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা
নেওয়া হলো না?’