একাত্তরের
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে করা মূল মামলার বাদী ও সাক্ষী বীর
মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর মরদেহ দাফন নিয়ে পিরোজপুরে দিনভর নজিরবিহীন জটিলতা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ ১৫ ঘণ্টার চরম
উত্তেজনা ও নানা নাটকীয়তার
অবসান ঘটিয়ে অবশেষে গভীর রাতে কড়া পুলিশ পাহারায় তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়। এর আগে তাঁর
রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও পিরোজপুরের মাটিতে
দাফন করা নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে ব্যাপক বাধার সৃষ্টি হয়, যা নিয়ে জেলাজুড়ে
উত্তেজনা বিরাজ করছিল।
পারিবারিক
সূত্রে জানা গেছে, ৮৭ বছর বয়সী
গেজেটভুক্ত এই মুক্তিযোদ্ধা দীর্ঘদিন
ধরে শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক
পটপরিবর্তনের পর থেকে তিনি
নিজ এলাকা ছেড়ে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় তাঁর মেয়ের জামাতার বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। সেখানেই গত শনিবার সকাল
১০টার দিকে তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। দুপুরের দিকে তাঁর মরদেহ পিরোজপুর সদর উপজেলা পরিষদ চত্বরে নিয়ে আসা হলে উত্তেজনার সূত্রপাত ঘটে। স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মী ও কিছু সমর্থক
সেখানে জড়ো হয়ে তাঁর গার্ড অব অনার প্রদান
ও দাফনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানান।
মানিক
পশারীর স্বজনদের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় ধরে সাধারণ অ্যাম্বুলেন্সে মরদেহ বরফ ছাড়াই ফেলে রাখা হয়েছিল। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাফনের বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব বা নিরাপত্তা না
দেওয়ায় পরিবারটি চরম উদ্বেগের মধ্যে পড়ে। পরবর্তীতে পরিস্থিতি বিবেচনায় পুলিশি পাহারায় মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্সটি পিরোজপুর পুলিশ লাইন্সে নিয়ে যাওয়া হয় এবং নিরাপত্তার
কারণে গণমাধ্যমকর্মীদের সেখানে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। পিরোজপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইফতেখারুল ইসলাম শামীম এবং সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শরিফুল ইসলাম নিশ্চিত করেন যে, সেখানে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার প্রদান
করা হয়।
অন্যদিকে,
এই রাষ্ট্রীয় সম্মানের তীব্র বিরোধিতা করে পিরোজপুর জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি আবদুর রাজ্জাক দাবি করেন, মানিক পশারী একজন ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’ ছিলেন। তিনি গণমাধ্যমকে স্পষ্ট জানান, পিরোজপুরের মাটিতে তাঁর মরদেহ কোনোভাবেই দাফন করতে দেওয়া হবে না। এই ঘোষণার পর
শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামে মানিক পশারীর নিজ বাড়ির উদ্দেশ্যে মরদেহ নিয়ে যাওয়ার বিভিন্ন পয়েন্টে জামায়াত সমর্থকরা অবস্থান নেয় এবং এলাকায় খোঁড়া একটি কবরও ভরাট করে ফেলার ঘটনা ঘটে।
দিনভর
চরম অনিশ্চয়তা ও দাফন জটিলতা
চলার পর মানিক পশারীর
বোন মোছাম্মৎ রিনা আক্তার আক্ষেপ করে বলেন, ভাই মারা যাওয়ার পর দাফন করতে
না পেরে তারা চরম বিপাকে পড়েছিলেন। তবে গভীর রাতে সব বাধা ও
প্রশাসনের কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে চিতলিয়া গ্রামে অবশেষে কবর খনন করা হয় এবং রাত
দেড়টার দিকে শান্তিপূর্ণভাবে দাফন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। ২০০৯ সালের ১২ আগস্ট পিরোজপুর
থানায় সাঈদীসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মামলাটি দায়ের করেছিলেন এই মানিক পশারী।