মধ্যপ্রাচ্যের চরম উত্তেজনাকর ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং অভ্যন্তরীণ তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেট নির্বাচনের ভোটগ্রহণ। ওয়েস্ট মিনিস্টার বা সংসদীয় শাসনব্যবস্থার অধীন এই নির্বাচনটি দেশটির ইতিহাসে অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এবারের নির্বাচন মূলত দীর্ঘ ১৯ বছর ধরে ইসরায়েলের ক্ষমতায় থাকা ঝানু ও বিতর্কিত নেতা বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার এক চরম মরণপণ লড়াই।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নজিরবিহীন হামলা ঠেকাতে গোয়েন্দা ও সামরিক ব্যর্থতা, গাজায় দীর্ঘস্থায়ী নিষ্ঠুর সামরিক অভিযান পরিচালনা এবং ইরানের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধাবস্থা তৈরির কারণে দেশের ভেতরে ও বাইরে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন তিনি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান একাকীত্ব ও কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতার প্রেক্ষাপটে দেশটির ভোটারদের একটি বড় অংশ নেতানিয়াহুকে বহু আগেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। আজকের নির্বাচনে এই অসন্তুষ্ট ভোটাররা যদি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেন, তবে তা বহু বছরের দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের অবসান ঘটিয়ে নেতানিয়াহুকে সরাসরি ইতিহাসের পাতায় ছুড়ে ফেলবে।
তবে রাজনৈতিকভাবে চরম চতুর ও টিকে থাকার লড়াইয়ে অত্যন্ত দক্ষ এই ইসরায়েলি নেতাকে এত সহজে মাঠ ছেড়ে দেওয়ার পাত্র ভাবছেন না বিশ্লেষকরা। ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে চরম ডানপন্থী ও উগ্র জাতীয়তাবাদের যে উত্থান ঘটেছে, তা নেতানিয়াহুর বড় শক্তির জায়গা। নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল তার দলের পক্ষে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না আনলেও, ইসরায়েলের জটিল ও খণ্ডিত বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ছোট ছোট দলের সমর্থন নিয়ে কোয়ালিশন সরকার গঠনের ক্ষেত্রে তিনিই সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে পৌঁছাতে পারেন।
এবারের নির্বাচনে 'দ্বিদলীয় বা জোট রাজনীতির চালক নেতানিয়াহুর প্রধান ও সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন ইসরায়েলের সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোট। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত বিভিন্ন জনমত জরিপের তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ভোটারদের পছন্দের তালিকায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এবং সাবেক এই জেনারেল প্রায় সমানে-সমান বা অত্যন্ত কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছেন। সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোট ইসরায়েলের অন্যতম দুই প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা তথা সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইয়াইর লাপিদ এবং নাফতালি বেনেটের সঙ্গে একটি শক্তিশালী বিরোধী জোট গঠন করেছেন। জনমত জরিপগুলো স্পষ্ট আভাস দিচ্ছে যে, নেতানিয়াহুর দল লিকুদ পার্টি ও তাদের কট্টর ডানপন্থী মিত্রদের ব্লকের সঙ্গে গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন এই বিরোধী জোটের মধ্যে একটি হাড্ডাহাড্ডি ও স্নায়ুক্ষয়ী লড়াই হতে যাচ্ছে।
সাবেক জেনারেল ও সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোট ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুতে অত্যন্ত কঠোর ও আপসহীন অবস্থানের জন্য সুপরিচিত। আর এই যুদ্ধংদেহী ভাবমূর্তির কারণেই দেশটির ডানপন্থী ও মধ্যপন্থী—উভয় শিবিরের ভোটারদের কাছ থেকেই তিনি ব্যাপক সাড়া ও সমর্থন পাচ্ছেন। অন্যদিকে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু তার নির্বাচনী প্রচারণায় যুদ্ধকালীন দৃঢ় নেতৃত্ব এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তার গভীর ব্যক্তিগত ও কৌশলগত মিত্রতার বিষয়টিকে প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন। নির্বাচনী প্রচারণার শেষ মুহূর্তে নেতানিয়াহু দাবি করেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক হুমকিকে ‘চিরতরে’ নির্মূল করতে আবারও কঠোর পদক্ষেপ নিতে পুরোপুরি প্রস্তুত—তবে মার্কিন প্রশাসনের এই পূর্ণ সমর্থন ও পদক্ষেপ তখনই পাওয়া সম্ভব হবে, যদি ইসরায়েলের রাষ্ট্রক্ষমতায় নেতানিয়াহু বহাল থাকেন।
নেতানিয়াহুর এই কৌশলের বিপরীতে পাল্টা আক্রমণ শানিয়েছেন গাদি আইজেনকোট। তিনি বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে তীব্র অভিযোগ তুলে বলেন, নেতানিয়াহু মূলত ইসরায়েলি জনগণের মনে ‘ভীতি প্রদর্শন, চরম মিথ্যাচার ও কাল্পনিক হুমকির ওপর ভিত্তি করে’ সস্তা রাজনৈতিক প্রচারণা চালাচ্ছেন। আইজেনকোট দৃঢ়তার সাথে আরও উল্লেখ করেন যে, ওয়াশিংটন তথা হোয়াইট হাউজে থাকা ডোনাল্ড ট্রাম্প নিশ্চিতভাবেই ‘ইসরায়েলের জনগণের দ্বারা গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত যেকোনো নতুন নেতার সঙ্গেই পূর্ণ সহযোগিতার ভিত্তিতে’ কাজ করবেন। ফলে আজকের এই নেসেট নির্বাচন ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণে এক অগ্নিপরীক্ষা।