ইয়েমেনে সৌদি আরব সমর্থিত সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি লড়াইয়ে হুথি বিদ্রোহীদের গোপনে গোয়েন্দা সহায়তা ও তথ্য সরবরাহ করছে মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাবশালী দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সুপরিচিত অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম ‘ড্রপ সাইট নিউজ’-এর একটি চাঞ্চল্যকর বিশেষ প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আমিরাত-সমর্থিত ইয়েমেনের কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠী নিয়মিতভাবে সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর বিভিন্ন গোপন অবস্থান ও সামরিক লক্ষ্যবস্তুর সুনির্দিষ্ট তথ্য হুথি যোদ্ধাদের কাছে পাচার করছে। শুধু তা-ই নয়, আবুধাবি ও হুথিদের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে সরাসরি গোপন যোগাযোগের চ্যানেলও সক্রিয় রয়েছে।
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতিতে একসময় অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে একই জোটে থাকলেও বর্তমান সময়ে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের কৌশলগত স্বার্থ ও আঞ্চলিক আধিপত্যের বিরোধ থেকেই মূলত এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। অনেকে এই ঘটনাকে আন্তর্জাতিক রাজনীতির পরিচিত ‘শত্রুর শত্রু আমার বন্ধু’ তত্ত্বের সঙ্গে তুলনা করছেন।
প্রতিবেদনে গোয়েন্দা সূত্রের বরাڌ দিয়ে আরও জানানো হয়, আমিরাতের মদদপুষ্ট ইয়েমেনি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো হুথিদের কাছে নিয়মিত সামরিক লক্ষ্যবস্তুর তথ্য পৌঁছাচ্ছে। পাশাপাশি আবুধাবি সরাসরি হুথিদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় করে আসছে। তবে এই গোপন সহযোগিতা কেবল ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ আঞ্চলিক সংঘাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, সৌদি আরবের মূল ভূখণ্ডে কোনো ধরনের হামলার উদ্দেশ্যে আমিরাত হুথিদের কোনো তথ্য দিচ্ছে না বলেই প্রতিবেদনে জোর দিয়ে দাবি করা হয়েছে।
এদিকে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনটিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, সম্প্রতি একজন শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তা এই গোপন আঁতাতের বিষয়টি জানতে পেরে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে আনুষ্ঠানিকভাবে সতর্ক করেছেন। এ ধরনের বিপজ্জনক সহযোগিতা অবিলম্বে বন্ধ করার জন্য আমিরাতকে আহ্বান জানানো হলেও, মার্কিন সতর্কবার্তার পরও গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান অব্যাহত রয়েছে বলে সূত্রগুলো দাবি করেছে।
সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের পারস্পরিক এই দ্বন্দ্বের পেছনের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০১৫ সালে ইয়েমেনের ভয়াবহ গৃহযুদ্ধে সৌদি আরব ও আমিরাত যৌথভাবে হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করেছিল। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে দেশ দুটির কৌশলগত রাজনৈতিক স্বার্থে বড় ধরনের পার্থক্য তৈরি হয়। ইয়েমেনে আমিরাতের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল মুসলিম ব্রাদারহুডপন্থী প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল ইসলাহকে দুর্বল করে ফেলা, যে দলটি আবার সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।
গত বছরের ডিসেম্বরে দক্ষিণ ইয়েমেনে আমিরাত-সমর্থিত সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল (এসটিসি) এবং সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর মধ্যে সরাসরি রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়। পরবর্তীতে তীব্র সৌদি বিমান হামলার মুখে বাধ্য হয়ে আমিরাতকে ইয়েমেন থেকে তাদের সৈন্য প্রত্যাহার করতে হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে ইয়েমেনে নিজেদের হারানো প্রভাব ও আধিপত্য পুনরুদ্ধারের জন্যই আমিরাত হুথিদের অগ্রযাত্রাকে পরোক্ষভাবে ব্যবহার করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সৌদি-সমর্থিত বাহিনী দুর্বল হলে দেশটিতে আবুধাবির কৌশলগত অবস্থান সুদৃঢ় হতে পারে—এমন হিসাব-নিকাশ থেকেই এই সহযোগিতার অভিযোগ উঠেছে।
অবশ্য হুথি ও আমিরাত-সমর্থিত পক্ষগুলো এই অভিযোগ দ্ব্যর্থহীনভাবে অস্বীকার করেছে। হুথিদের শীর্ষ রাজনৈতিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ আল-বুখাইতি আমিরাতের সঙ্গে কোনো ধরনের গোয়েন্দা সহযোগিতার কথা নাকচ করে দাবি করেছেন যে, আমিরাত বর্তমানে পুরোপুরি নিরপেক্ষ অবস্থানে রয়েছে। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের তরফ থেকে নানামুখী চাপ থাকা সত্ত্বেও দেশটি পুনরায় সৌদি জোটে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। একইভাবে, আমিরাত-সমর্থিত সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের (এসটিসি) পক্ষ থেকেও হুথিদের কাছে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহের অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
যুদ্ধক্ষেত্রের এই নতুন পরিস্থিতির প্রভাবে ইয়েমেনে সংঘাত আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। ড্রপ সাইট নিউজের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, লোহিত সাগর উপকূলে আকস্মিক এক সামরিক অভিযান চালিয়ে সৌদি-সমর্থিত বাহিনীকে পর্যুদস্ত করেছে হুথিরা। ওই অভিযানে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দাব প্রণালীর নিয়ন্ত্রণও নিজেদের হাতে নিয়েছে তারা। ধারণা করা হচ্ছে, সে সময় সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর সামরিক ঘাঁটিতে হুথিদের চালানো অত্যন্ত নির্ভুল ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পেছনে আমিরাতের সরবরাহ করা উন্নত ও আধুনিক গোয়েন্দা তথ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
এদিকে ইয়েমেনে চলমান ভয়াবহ এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের কারণে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে এবং দেশটিতে প্রতিদিন বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গত ১ আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত দেশটিতে অন্তত ২ লাখ ৫০ হাজার মানুষ নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন।