ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
শত কোটি টাকার সম্পদ, রিট ফাইল চেপে রাখা ও প্রশাসনের নীরবতার অভিযোগ রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও চাঁদাবাজি কঠোর হাতে দমন করা হবে: আইনমন্ত্রী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় চায় বাংলাদেশ: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ডেঙ্গুতে আরও ৬ প্রাণহানি, এক দিনে হাসপাতালে ১৫৬১ জন ভর্তি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে: রাষ্ট্রপতি আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ: দুদক ‘বারবার মিথ্যা মামলা না দিয়ে আমাকে একবারে গুলি করে মেরে ফেলেন’ ২১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে বিনিয়োগে আগ্রহী মার্কিন কোম্পানি শেভরন পাবনায় ডিবির ওসির প্রত্যাহারে সাংবাদিকদের ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম

নাটোরের শংকর ভাগে চড়ক মেলা


  • আপলোড সময় : মঙ্গলবার ১৩ মে, ২০২৫ সময় : ৪:০২ এএম

নাটোর প্রতিনিধি

মঙ্গল ও রোগব্যাধী থেকে মুক্তি পাওয়ার মানতে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লোকোৎসব হচ্ছে চড়ক পূজা। নাটোরের শংকরভাগ গ্রামে ’দিনব্যাপী চড়ক মেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সোমবার (১৪ এপ্রিল) সকাল থেকে শুরু হয়েছে এ মেলা। নাটোর শহর থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার দূরে শংকরভাগ গ্রাম জুড়ে চলছে এ উৎসবের আমেজ। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভক্তরা এসেছে এ মেলায়। মনের বাসনা পূর্ণ করতে পূজা অর্চনা ও বিভিন্ন রকম ফল, হাঁস-মুরগি ও ছাগল মানত করছেন তারা। চড়ক পূজা এবং চৈত্রসংক্রান্তি উপলক্ষে দিনব্যাপী এ মেলায় হাজার হাজার মানুষের মিলন মেলা বসেছে। 

দুপুর থেকেই শংকরভাগ গ্রামের স্কুল মাঠ মানুষের পদচারণায় কানায় কানায় পরিপূর্ণ হয়ে ওঠেছে। কে হিন্দু, কে মুসলমান এটাও যেন চেনা দায়। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রায় দুইশ বছর ধরে এ এলাকায় অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে চড়ক পূজা। এ চড়কের মিলনমেলা আজও ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। তবে চড়কের মেলায় স্থানীয় আদিবাসীদের নৃত্য আর এখন চোখে পড়ে না। মানুষের পিঠের সঙ্গে কালা বা বর্শি বিধিয়ে ঘোরানোই এ মেলার ঐতিহ্য।

ওই গ্রামের বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব বয়সের শহিদুল্লাহ শহিদ জানান, এ গ্রামে আদিবাসীদের বসবাস বেশি। কিন্তু প্রভাবশালীদের অত্যাচরে অনেক আদিবাসী গ্রাম ছেড়ে চলে গেছে অনেক আগে ভারতে। এরপরও নানা প্রতিকূলতা মধ্য দিয়ে তারা বাঙালির কৃষ্টি ও ঐতিহ্য ধরে রাখতে প্রতিবছরই এ সময়ে খুব ঘটা করেই সড়ক পূজা উপলক্ষে মেলার আয়োজন করে থাকে।

মেলাকে ঘিরে হাজার হাজার নানা ধর্মের মানুষের ঢল নামে। এবারও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। শংকরভাগের ১৪২ ঘর আদিবাসী ছাড়াও আশপাশের সনাতন ধর্মাবলম্বীরা সবাই মিলেই চৈত্র মাসের শেষ দিনে এক হয়ে মিশে গেছে উৎসব উদযাপনে। এদিকে এ মেলাকে কেন্দ্র করে বসেছে নানা পসরার দোকান। এসব দোকানে মিলছে চিনি-গুঁড়ের জিলাপি, মুড়ি-মুড়কি, কদমা, চিনির তৈরি হাতি-ঘোড়া, মিষ্টি, হাওয়াই মিঠাই, মহিষের দুধের ঘোল ও পেঁয়াজু।

মেয়েদের জন্য রয়েছে কাঁচের চুড়ি, মালা, ফিতা, টিপ ও সিঁদুর।  গৃহিণীর জন্য লোহার তৈরি জিনিসপত্র দা, বটি, ঘটি, বাটি, খুন্তি ও কাঠের তৈরি নানা জিনিস।  আরও রয়েছে ভিউকার্ড, ঝিনুকের তৈরি শো-পিস-গহনা, শাঁখ-শাঁখা, পলা আরও কতো কী। মেলায় আসা সিংড়ায় কৃষ্ণা রাণী দাস জানান, তার ৫ বছরের শিশুর রোগ মুক্তির জন্য তিনি এ পূজায় এসেছেন। তিনি দুটি মুরগি ও বাতাসা মানত করেছেন।

নাটোর শহরের বিনতি রানী, সবিতা মুখার্জি, মায়া পাল জানান, এ পূজায় মানত করলে নাকি মনের বাসনা পূর্ণ হয়। রোগ বালাই ভাল হয়, তাই তিনি তার স্বামীর রোগ মুক্তির জন্য এখানে এসেছেন। পাবনা জেলার রাখী সরকার জানান, বিয়ে হওয়া প্রায় ৮ বছর পার হয়েছে। কিন্তু তার কোনো সন্তান হয়নি। লোকমুখে শুনেছেন, এই চড়কে মানত করলে নাকি বাচ্চা হয়। তাই তিনি বাচ্চার আসায় মানত করতে এখানে এসেছেন।

মেলা প্রসঙ্গে ওই গ্রামের ৮৩বছরের বৃদ্ধ সমেন্দ্র নারায়ন হোড় জানান, প্রায় দুইশ বছর ধরে এখানে চড়ক পূজা হচ্ছে। আগে নাকি আরও বড় করে আয়োজন হতো। তখন যারা চড়ক গাছে ঘুরতো তাদের আগের দিন রাতে মন্ত্র দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হতো। তারা আগুনের ওপর দিয়ে খালি পায়ে হাঁটতো, ধারালো অস্ত্র-শস্ত্রের ওপর খালি পায়ে দাঁড়াতো। কাটতো না, পুড়তোও না। কিন্তু এখন আর এতো নিয়ম পালন করা হয় না।

হরিপদ সাহা জানান, পুকুরে ডুবিয়ে রাখা চড়ক গাছ চৈত্র সংক্রান্তির সকালে তুলে আনা হয়। পরিষ্কার করে পূজা শেষে চড়কের জন্য প্রস্তুত করা হয়।  তিনটি বাঁশ একসঙ্গে বেঁধে লাল কাপড়ে জড়িয়ে নেওয়া হয়। ৪০-৫০ ফুট উঁচু গাছের মাথায় যে চড়ক লাগানো হয়, পূজা শেষে দুধ ও জল দিয়ে স্নান করানো হয়। পরে সন্ন্যাসীদের পিঠে বান (এক ধরনের বড় বড়শি) ফোঁড়ানো হয়। তারা সারাদিন জল না খেয়ে উপবাস করেন। এরপর দুপুরের পর থেকে শুরু হয় মূল আয়োজন। একে একে সন্ন্যাসীদের নেওয়া হয় শিববাড়ি মন্দিরে, সেখানে মন্ত্র এবং ওষুধি গাছের সাহায্যে সন্ন্যাসীদের আচ্ছন্ন করা হয়। কোমরে বেঁধে দেওয়া হয় লালসালু, যার ভেতরে থাকে মন্ত্রপুত কড়ি এবং ওষুধি গাছ। ফলে কোনো রকম সমস্যায় পড়তে হয় না তাদের। 

পরে দড়ি বেঁধে চড়ক গাছের সঙ্গে ঘোরানো হয় সন্ন্যাসীদের। এ সময় মঙ্গল কামনায় সন্তানদের শূন্যে তুলে ধরেন অভিভাবকরা। সন্ন্যাসীরা ঘুরে ঘুরে সে সব শিশুদের মাথা স্পর্শ করেন। অনেক সময় কোলেও তুলে নেন, ছিটিয়ে দেন খাগরাই-বাতাসা। চড়ক পূজা শেষে সন্ন্যাসীরা খাবার স্পর্শ করেন। শংকরভাগ চড়ক পূঁজা উদযাপন কমিটির সভাপতি হারান চন্দ্র গোস্বামী জানান, অন্যান্য বছর অন্তত ৫০/৬০ জনকে কালা বা বর্শি ফোঁড়ানো হতো। এ বছর ৩০ জনকে ফোড়ানো হয়েছে। মেলা পরিচালনার জন্য ২১ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি রয়েছে। দিনব্যাপী মেলায় বর্শি ফোঁড়ানো ও পূজা অর্চনা করা হয়। এ উপলক্ষে গান বাজনা করে উৎসব চলে।

তিনি আরো জানান, চড়ক পূজা পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লোকোৎসব। চৈত্রের শেষ দিনে এ পূজা অনুষ্ঠিত হয়। চড়ক পূজার উৎসব চলে বৈশাখের প্রথম দুতিন দিনব্যাপী। জনশ্রুতি রয়েছে, ১৪৮৫ খ্রিস্টাব্দে সুন্দরানন্দ ঠাকুর নামে এক রাজা এ পূজা প্রথম শুরু করেন। 

নাটোর সদর উপজেলা নিবার্হী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোসা আখতারজাহান সাথী জানান,এ মেলায় যাতে কোনো প্রকার অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে সে জন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থা নিয়োজিত রয়েছেন। মেলা উদযাপন কমিটিসহ স্থানীয় জনগণ সুন্দরভাবে মেলায় আয়োজন করেছেন। গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যকে ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন।

আকাশজমিন/আরআর 


এ সম্পর্কিত আরো খবর