কাজী বাবলা, পাবনা:
সারা
শরীরে সিগারেট আর কয়েলের আগুনের ছ্যাঁকা, হাতের নখ উপড়ে ফেলে বানানো হয় প্রতিবন্ধী।
খাবার না দিয়ে রাতে চালানো হয় অমানুষিক নির্যাতন। আর দিনের আলোয় তাকে দিয়ে করানো হতো
ভিক্ষা। অপহরণের পর প্রায় সাড়ে ছয় মাস এভাবেই চলেছে ৬ বছরের শিশু সোয়াইব হোসেনের কষ্টের
জীবন। অবশেষে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে মায়ের কোলে ফিরিয়ে দিয়েছে। গ্রেফতার করা হয়েছে
অপহরণকারীকে। উদ্ধারের পর শিশুটিকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
পাবনা সদর থানা সুত্রে গেছে, পাবনা সদর উপজেলার চকছাতিয়ানী গোরস্থান এলাকার আমিনুল ইসলাম ও সোহানা জাহানের সন্তান সোয়াইব (৬)। বাবা অন্যত্র বিয়ে করায় মায়ের কাছেই থাকে সে। গত বছরের ২ অক্টোবর একই উপজেলার শানিরদিয়ার এলাকার আমজাদ হোসেনের ছেলে রফিকুল ইসলাম বিপ্লব শিশুটিকে বিস্কুট কিনে দেয়ার কথা বলে অপহরণ করে নিয়ে যায়। ঘটনার দিন থেকে রাত-দিন বিভিন্ন স্থানে খোঁজ করেও সন্তানের খোঁজ না পেয়ে ৭ অক্টোবর পাবনা সদর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি নং-৫৫৩, তারিখ-০৭-১০-২০২৪) করেন তার মা সোহানা জাহান। জিডির তদন্তভার দেয়া হয় এসআই (নিরস্ত্র) মো: জাকারিয়া হাওলাদারের উপর। এর এক পর্যায় আত্মগোপনে থাকা অভিযুক্ত রফিকুল ইসলাম বিপ্লব শিশু সোয়াইবের মাকে মোবাইল ফোনে জানান সোয়াইবকে সে অপহরণ করেছে।
তদন্ত
কর্মকর্তা এসআই জাকারিয়া হাওলাদার জানান, শিশু সোয়াইবের মা বিয়ষটি আমাকে জানান। প্রযুক্তির
সহায়তায় শিশুটি উদ্ধারের চেষ্টা করতে থাকি। কিন্ত বেশিরভাগ সময় বিপ্লবের ফোন বন্ধ থাকত।
ফোন নম্বর ট্র্যাক করে তার লোকেশন শনাক্তের চেষ্টা করার এক পর্যায় ঘটনার ছয় মাস পর
গত ১৮ এপ্রিল খুলনার রুপসা ফেরিঘাট এলাকায় তাদের অবস্থান জানা যায়। পরে রুপসা নৌ পলিশ
ফাঁড়ির সহয়তায় রুপসা ফেরিঘাট এলাকায় থেকে ভিক্ষা করানো অবস্থায় শিশুটিকে উদ্ধার এবং
অভিযুক্ত রফিকুল ইসলাম বিপ্লবকে আটক করা হয়।
পুলিশ
জানায়, উদ্ধারের পর শিশুটিকে পাবনা জেনারেল হাসপাতালের অর্থোপেডিক্স বিভাগে ভর্তি
করা হয়েছে। এরপরই বেরিয়ে আসে শিশুটির ওপর বর্বর নির্যাতনের চাঞ্চল্যকর তথ্য। ভুক্তভোগী
শিশু সোয়াইব জানায়, রাতে তাকে একটি কক্ষে বন্দি করে রাখতেন বিপ্লব। সহজে কিছু খেতে
দিতেন না। শরীরে দাঁতের কামড় বসিয়ে চামড়া তুলে ফেলতো। সারা শরীরে দেয়া হতো সিগারেট
ও কয়েলের আগুনের ছ্যাঁকা। বাম হাতের একটি আঙুলের নখ প্লাস দিয়ে উপড়ে ফেলা হয়েছে। এ
অবস্থায় দিনের বেলায় বিভিন্ন এলাকায় নিয়ে তাকে দিয়ে ভিক্ষা করানো হতো।
শিশু
সোয়াইবের মা সোহানা জাহান বলেন, পূর্ব পরিচয়ের সূত্র ধরে সেদিন বিপ্লব আমার কাছ থেকে
ছেলেটাকে নিয়ে যায় বিস্কুট কিনে দেবে বলে। তারপর থেকে ছেলেকে আর খুঁজে পাইনি। পরে বিপ্লব
ফোন করে জানায় সে আমার ছেলেকে অপহরণ করেছে। তারপর
থেকে তার ফোনও বন্ধ। এরপর সদর থানায় গিয়ে ঘটনা জানিয়ে জিডি করি।’
তিনি
আরও বলেন, ‘উদ্ধারের পর প্রথম দেখায় আমার ছেলেকে চিনতেই পারিনি। দিনের পর দিন কীভাবে
আমার শিশু সন্তানকে নির্যাতন করেছে ভাবতেই বুকটা ফেটে যায়। প্রায় প্রতিবন্ধী বানিয়ে
ফেলেছে আমার শিশু ছেলেকে। কঙ্কাল শরীর নিয়ে ছেলেটা নড়াচড়াও করতে পারছে না। আমি অভিযুক্ত
বিপ্লবের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ফাঁসি চাই।’
পাবনা
জেনারেল হাসপাতালের অর্থোপেডিক্স বিভাগের প্রধান ডা. মাসুদুর রহমান প্রিন্স বলেন,
‘দিনের পর দিন না খাইয়ে রাখা ও শারীরিক নির্যাতনের কারণে শিশুটির শারীরিক অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। তার হাতের একটা
আঙুল কেটে ফেলতে হবে। আমাদের সাধ্যমতো প্রয়োজনীয় চিকিৎসা চলছে। ঠিকমতো চিকিৎসা নিশ্চিত
করা গেলে আশা করছি দুই মাসের মধ্যে শিশুটি সুস্থ হয়ে উঠবে।’
পাবনা
সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) এ এসএম মনিরুজ্জামান বলেন, ঘটনাটি অমানবিক। উদ্ধাকৃত শিশু
সোয়াইব পাবনা জেনারেল হাসপাতালের অর্থোপেডিক্স বিভাগের ২৬ নম্বর বেডে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
এ ঘটনায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করে অভিযুক্ত বিপ্লবকে আদালতের মাধ্যমে
কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
আকাশজমিন/আরআর