ঢাকা, বাংলাদেশ ।
  সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬,  ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
শত কোটি টাকার সম্পদ, রিট ফাইল চেপে রাখা ও প্রশাসনের নীরবতার অভিযোগ রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও চাঁদাবাজি কঠোর হাতে দমন করা হবে: আইনমন্ত্রী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় চায় বাংলাদেশ: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ডেঙ্গুতে আরও ৬ প্রাণহানি, এক দিনে হাসপাতালে ১৫৬১ জন ভর্তি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে: রাষ্ট্রপতি আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ: দুদক ‘বারবার মিথ্যা মামলা না দিয়ে আমাকে একবারে গুলি করে মেরে ফেলেন’ ২১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে বিনিয়োগে আগ্রহী মার্কিন কোম্পানি শেভরন পাবনায় ডিবির ওসির প্রত্যাহারে সাংবাদিকদের ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম

ব্যাংকের বারোটা বাজিয়ে চলে গেলেন ম্যানেজার

নেত্রকোণায় সোনালী ব্যাংকে অনিয়ম- দুর্নীতির পাহাড়


  • আপলোড সময় : শুক্রবার ১৬ মে, ২০২৫ সময় : ৫:৩৬ পিএম

মোহনগঞ্জ (নেত্রকোণা) প্রতিনিধি:

নেত্রকোণার মোহনগঞ্জ সোনালী ব্যাংকের সাবেক ম্যানেজার মো. সাইকুল ইসলাম। আড়াই মাস আগে পাশের উপজেলায় বদলি হন। তবে দায়িত্বে থাকাকালে ব্যাংকটিকে রীতিমত অনিয়ম-দুর্নীতির কারখানা বানিয়ে ফেলেছিলেন তিনি। এসব কাজে ব্যাংকের পিয়ন ও অসৎ কর্মকর্তাদের দিয়ে  গড়ে তুলেছিলেন সিন্ডিকেট।


ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নেই এমন ব্যক্তিকে টাকার বিনিময়ে ভুয়া ট্রেড লাইসেন্স তৈরি করে ঋণ প্রদান, পুরাতন স্ট্যাম্পে শত শত মুক্তিযোদ্ধা ঋণ নবায়ন করে  সরকারের লাখ লাখ টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে পকেটে ভরেছেন ম্যানেজার। এছাড়া ব্যংকের নিয়ম ভেঙে একই মুক্তিযোদ্ধা ভাতার বিপরীতে একাধিক ঋণ প্রদান, একই পরিবারে একাধিক কৃষি ঋণ প্রদানসহ দীর্ঘ বছরের খেলাপী ঋণের ইন্সুরেন্স কেটে  হাতিয়েছেন কাড়ি কাড়ি টাকা।

এসব অনিয়মের চাপে ব্যাংকটিতে খেলাপী ঋণের পরিমাণ ৩৩ শতাংশ, যা জেলায় সর্বোচ্চ। ব্যাংকে অনিয়ম-দুর্নীতির ছড়াছড়ি থাকলেও বছর শেষে হওয়া অডিটে ধরা পড়েনি কিছুই। অভিযোগ আছে দুর্নীতির টাকার ভাগ ঘুষ হিসেবে দিয়ে অডিট কর্মকর্তাদেরও ম্যানেজ করেছেন তিনি। অভিযুক্ত সাইকুল ইসলাম বর্তমানে জেলার পূর্বধলা উপজেলার সোনালী ব্যাংকের ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত আছেন।

এ ঘটনায় তথ্য প্রমানসহ দুর্নীতি দমন কমিশনসহ (দুদক), বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক ও ময়মনসিংহ সোনালী ব্যাংকের জেনারেল ম্যানেজার, নেত্রকোণার ডিজিএম সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে অভিযোগ করেছেন ইবাদ হোসেন নামে স্থানীয় এক ব্যক্তি।  অভিযোগ ও অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য-প্রমাণ যাচাই করে জানা গেছে, 'হবি টি স্টল' নামে একটি দোকানের ট্রেড লাইসেন্সের বিপরীতে ২০২৩ সালে মোহনগঞ্জ সোনালী ব্যাংক থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে দোকানের মালিক হবি মিয়াকে। এর লাইসেন্স নম্বর ২৬৬৯। পৌরসভায় খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে এই নম্বরের লাইসেন্সটি 'প্রান্তর সামি ডেইরি ফার্মের' নামে এন্ট্রি করা রয়েছে।

এ বিষয়ে হবি টি স্টলের মালিক হবি মিয়ার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এসবের কিছুই আমি জানি না। সোনালী ব্যাংকের তৎকালীন পিয়ন হাবিবুর রহমানের সাথে ঋণের বিষয়ে কথা বলেছিলাম। তখন তিনি বলেছিলেন- জাতীয় পরিচয় পত্রের ফটোকপি, দুই কপি ছবি ও ৫ হাজার টাকা তাকে দেওয়ার জন্য। কথা মতো তাকে এসব দিয়েছি। পরে কয়েকদিনের মধ্যে তিনি আামকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ দিয়েছেন। আমার দোকানের নামে নকল ট্রেড লাইসেন্স করা হয়েছে, এটা এখন জানলাম। এসবের জন্য দায়ী পিয়ন হাবিব।

এদিকে নতুন স্ট্যাম্পে ঋণ নবায়নের নিয়ম থাকলেও পুরোনো স্ট্যামে ঋণ নবায়ন করে কয়েক লাখ টাকা সরকারি রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত তিন-চার বছরে ব্যাংকটিতে  মুক্তিযোদ্ধাদের শতাধিক ঋণ নবায়নে পুরোনো স্ট্যাম্প ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এ সংক্রান্ত ৩০ টির বেশি প্রমাণ এই প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে।

এদিকে ব্যাংকের নিয়ম লঙ্ঘন করে একটি মুক্তিযোদ্ধা ভাতার বিপরীতে দুটি ঋণ দেওয়া হয়েছে। পৌর শহরের সাতুর গ্রামের প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা রুস্তম আলী খানের ভাতার বিপরীতে ঋণ দেওয়া হয়েছে তাঁর স্ত্রী তারা বানু ও ছেলে মো. হাবিবুর রহমান খানকে (ব্যাংক পিয়ন)। তাদের ঋণের হিসাব নম্বর যথাক্রমে

৩৫১২১৫০০০০৭১৭ ও ৩৫১২১৫০০০১১২৩। এছাড়া নিয়ম লঙ্ঘন করে একই পরিবারে অর্থাৎ পিয়ন হাবিবুর রহমানের স্ত্রী কোহিনূর বেগম ও ছেলে কবির উদ্দিন খান বাপ্পীর নামেও রয়েছে কৃষি ঋণ।

একইভাবে নিয়ম লঙ্ঘন করে মিজানুর রহমান নামে এক ব্যক্তিকে (ঋণ হিসাব নং- ৩৫১২১৬২০০৬৩৮৪ ও ৩৫১২৬৭৩০১৬৭৫৬) দুটি কৃষি ঋণ দিয়েছেন।  মোহনগঞ্জ সোনালী ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সাবেক ম্যানেজার সাইকুল ইসলাম পিয়ন হাবিবসহ আরও কয়েকজনকে নিয়ে সিন্ডিকেট তৈরি করেছিলেন। গত কয়েক বছরে নবায়নকৃত মুক্তিযোদ্ধা ঋণে স্ট্যাম্প জালিয়াতি করে রাজস্ব ফাঁকি, ভুয়া ঋণ প্রদান, একই ব্যক্তি ও একই পরিবারে একাধিক কৃষি ঋণ, খেলাপী ঋণের ইন্সুইরেন্স নবায়ন করে অর্থআত্মসাতসহ নানা জালিয়াতি করে ব্যাংকের বারোটা বাজিয়েছেন।

ব্যাংকের নিয়মিত অডিটে এসব অনিয়ম ধরা পড়লেও ঘুষ দিয়ে এসব ম্যানেজ করে ফেলেন। তদন্ত করে এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।  অভিযোগকারী ইবাদ হোসেন বলেন, নবায়নকৃত মুক্তিযোদ্ধা ঋণে স্ট্যাম্প জালিয়াতি করে রাজস্ব ফাঁকি, ভুয়া ঋণ প্রদান, একই ব্যক্তি ও একই পরিবারে একাধিক কৃষি ঋণ, খেলাপী ঋণের ইন্সুইরেন্স নবায়ন করে অর্থআত্মসাতসহ নানা জালিয়াতির প্রমাণ হাতে পেয়েছি। ওই ম্যানেজার অনিয়ম-দুর্নীতি করে জনগণের স্বার্থ ক্ষতি করেছেন। অভিযোগ দিয়েছি দুদকসহ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে। তদন্ত করে ব্যবস্থা নিলে এমন কাজ আর কেউ করবে না।



অভিযুক্ত ব্যাংক পিয়ন হাবিব মিয়া (বর্তমানে এলপিআরে রয়েছেন)  বলেন,   আমি কোন অনিয়ম করিনি। আমার তো কোন সাইন পাওয়ার নেই। তবে ম্যানেজার সাইকুল ইসলাম বিষয়টি সাংবাদিকদের সাথে কথা বলে সমাধান করে দেওয়ার জন্য আমাকে দায়িত্ব দিয়েছেন।

জানতে চাইকে অভিযুক্ত ম্যানেজার মো. সাইকুল ইসলাম বলেন, অভিযোগের বিষয়টি সত্য নয়। তবে এনিয়ে আর বেশি কিছু বলতে চাননি।  অনিয়মের বিষয়গুলো অবহিত করলে মোহনগঞ্জ সোনালী ব্যাংকের বর্তমান ম্যানেজার শাহ আরিফ আহমেদ চেক করে এর অনেকগুলোর সত্যতা পান। তিনি বলেন, একটি মুক্তিযোদ্ধার ভাতার বিপরীতে একাধিক ঋণ দেওয়া, একই পরিবারে দুটি কৃষি ঋণ বা একই ব্যক্তিকে দুটি কৃষি ঋণ দেওয়ার নিয়ম নেই। ঋণ নবায়নে পুরোনো স্ট্যাম্প ব্যবহার করা আইনের লঙ্ঘন। তবে এসব কাজ যারা করেছেন তারা সঠিক কাজ করেননি।

অভিযোগগুলোর বিষয়ে অবহিত করলে নেত্রকোণা জেলার ভারপ্রাপ্ত ডিজিএম নূরুল ইসলাম প্রথমে বিষয়টি তদন্ত করে দেখার কথা বললেও কয়েকদিন পরে ফোনে জানান, অভিযোগের অনেক বিষয় আমি সমাধান করে ফেলেছি। বাকি গুলোও আমি আমর মতো করে সমাধান করে ফেলব।


এ সম্পর্কিত আরো খবর