মোহনগঞ্জ (নেত্রকোণা) প্রতিনিধি:
‘কে দিলো পিরিতের বেড়া,লিচুরও বাগানে লিচুরও বাগানে গো সই... লিচুরও বাগানে' অসাধারণ এই ঘেটু গান নিয়ে উন্মাদনার মধ্যে নেত্রকোণার মোহনগঞ্জ ও তার আশপাশের এলাকা তথা বিস্তৃত হাওর অঞ্চলের এক চারণ কবি সংগীতশিল্পী আব্দুর ছত্তার তালুকদার নাম সামনে আসছে, যিনি নিজেকে ছত্তার পাগলা বলে পরিচয় দিতেন। ছত্তার পাগলা ও তাঁর ছোট্ট মেয়ে কল্পনা আক্তার খঞ্জনী বাজিয়ে হাওর জনপদকে বিনোদিত করেছেন কয়েক দশক।
নেত্রকোণা
ও সুনামগঞ্জ সমগ্র হাওর অঞ্চলের মানুষ আজ খুব খুশি। বর্তমান সময়ের সফল নায়ক, বহু তরুণের
রোল মডেল, সফল চলচিত্র, রায়হান রাফি নির্মিত ও শাকিব খান এবং সাবিলা নূর অভিনীত পবিত্র
ঈদুল আজহায় মুক্তি পায় ‘তাণ্ডব’ সিনেমাটি ইতিমধ্যে ব্যাপক আলোচনায় এসেছে।
সিনেমার একটি আইটেম গানে এই পাগল চারণ কবির গানটি নতুনভাবে কম্পোজ করে চিত্রায়ন ব্যবহৃত
হয়েছে। সিনেমার জন্য গানটি অসাধারণ লেগেছে। তবে মৌলিক সুর ঠিক রেখেই গানের অনেক ইম্প্রোভাইজেশন
হয়েছে। গানটি প্রকাশের পরপরই রীতিমতো আলোচনার ঝড় তুলেছে। সিনেমার প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান
এসভিএফ আলফা আই এন্টারটেইনমেন্ট লিমিটেড জানিয়েছে, ‘লিচুরও বাগানে’
শিরোনামে মূল গানটির গীতিকার ছত্তার পাগলা।
সামাজিক
যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা চলছে, কে এই ছত্তার পাগলা? খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নেত্রকোণায়
জন্মগ্রহণ করলেও তাঁর জীবন কেটেছে মোহনগঞ্জ কংশ নদীর তীরে। তিনি ছিলেন এক স্বতন্ত্র
ধারার স্বভাব কবি। যিনি নিজস্ব উচ্চারণ ও শব্দে কঠিন বিষয় সহজভাবে তুলে ধরতেন। নিরক্ষর
ও হতদরিদ্র হলেও তিনি তাৎক্ষণিকভাবে গান রচনা ও সুর করতেন। ভাটি অঞ্চলের জনপ্রিয় সংগীতশিল্পীদের
মধ্যে একজন তিনি। ট্রেনে, স্টেশনে, বাজারের মজমায় ঘুরে ঘুরে গান করতেন।
ছত্তার
পাগলার গানে নেত্রকোণার আঞ্চলিক ভাষা, মায়া ও মুগ্ধতা স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। গান গাওয়ার
সময় তিনি নিজ হাতে তৈরি বাঁশি বাজাতেন আর তাঁর মেয়ে বাজাতেন ডুগডুগি। তাঁর গানের ধারা
প্রচলিত বাউল গান থেকে আলাদা ছিল বলে স্থানীয় শিল্পীদের মাঝে তিনি অবহেলার শিকার হন।
ছত্তার পাগলার গান তান্ডব সিনেমা প্রেমীদের কাছে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ২০১৪ সালের এপ্রিল মাসে বিনা চিকিৎসায় মারা গেছেন তিনি। মৃত্যুর ১১ বছর পর ‘লিচুরও বাগানে’ গানের সুবাদে আলোচনায় এলেন ছত্তার পাগলা। ভাটি অঞ্চল ছাড়িয়ে দেশজুড়ে পরিচিতি পেলেন তিনি। ৮৭ বছরের জীবদ্দশায় কয়েক শত গান রচনা ও সুরারোপ করেছেন তিনি।
দীর্ঘদিন ধরে ছত্তার পাগলার গান নিয়ে গবেষণা করছেন কবি সরোজ মোস্তফা। তিনি বলেন, ‘লিচুরও বাগানে’ গানটির গীতিকার ও সুরকার ছত্তার পাগলা। তিনি জীবদ্দশায় পাণ্ডুলিপিতেও গানটি রেখে গেছেন। সরোজ মোস্তফা বলেন, ‘গানটা আশির দশকের আগে কেউ কোথাও শোনেনি, গানটা প্রথম জনসমাজে নিয়ে এসেছেন ছত্তার পাগলা’।
তিনি বলেন, ‘গানটি পূর্ব ময়মনসিংহ অঞ্চলের মাটির গান। এটি একটি ঘেটু (গাডু) গান। কৈশোরে ছত্তার পাগলা ঘেটু গানের দলে ছিলেন, ঘেটু গানের সংস্কৃতি থেকেই গানটির জন্ম।’ তবে আরেক সংগীত-গবেষক গৌতম কে শুভ দাবি করেছেন, এটি মূলত প্রচলিত ঘেটু গান। ‘কে দিল পিরিতির বেড়া লিচুরও বাগানে?’ অংশটি মূল গানের অংশ। এর সঙ্গে ছত্তার পাগলা নিজের মতো করে কথা সংযোজন করেছেন। নেত্রকোণায় ছত্তার পাগলার লেখা ভার্সনটিই বিখ্যাত হয়েছে।
গৌতম কে শুভ বলেন, লোকগান বরাবরই মানুষের মুখে মুখে ছড়ায়, পরে এতে লোকশিল্পীরা নিজের মতো করে কথা যুক্ত করে থাকেন। কবি সরোজ মোস্তফার দাবি, ‘লিচুরও বাগানে’ গানটি ছত্তার পাগলারই লেখা। ছত্তার পাগলার মধ্য দিয়েই গানটি প্রচলিত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘ছত্তার পাগলা যে ধরনের গানের শব্দচয়ন করেন, সেটার সঙ্গে গানটার মিল রয়েছে।’
ছত্তার
পাগলা মুখে গান বাঁধতেন। খুব একটা লিখতে-পড়তে পারতেন না। তাঁর কাছ থেকে শুনে শুনে অন্যরা
গান লিখে রাখতেন। তাঁর বেশির ভাগ গান লিখে রেখেছেন আল মামুন চৌধুরী নামের একজন দন্ত
চিকিৎসক। মোহনগঞ্জ পৌর শহরের দন্ত চিকিৎসক আল মামুনের চেম্বারে নিয়মিত আড্ডা দিতেন
ছত্তার পাগলা।
আল
মামুন চৌধুরী বলেন, গানটি ছত্তার পাগলার রচিত। দশকের পর দশক ধরে তাঁর কণ্ঠে গানটি শুনেছেন
ভাটি অঞ্চলের শ্রোতারা। ছত্তার পাগলার মৃত্যুর বছর তিনেক আগে তাঁর কাছ থেকে শুনে শুনে
গানটি হাতে লিখে রেখেছিলেন তিনি।
ছত্তার
পাগলার কাছে গানটির মর্মার্থ জানতে চেয়েছিলেন আল মামুন চৌধুরী। তিনি বলেছিলেন, ‘যত্নের
লিচুর বাগান দুষ্টু ছাগলে খেতে আসে। ফলে বাগানে বেড়া দিয়েছেন।’ঘেটু
গানটিতে প্রতীকীভাবে প্রেমকে তুলে ধরেছেন তিনি।
মৃত্যুর
আগে নেত্রকোণার মোহনগঞ্জ উপজেলার আদর্শনগর শহীদ স্মৃতি মহাবিদ্যালয় কলেজের বাংলা প্রভাষক,
কবি ও সাংস্কৃতিক সংগঠক রইস মনরমের কাছে গানগুলো রেখে গেছেন ছত্তার পাগলা। রইস মনরমের
কাছে আল মামুন চৌধুরীর হাতে লেখা ‘লিচুরও বাগানে’ গানটিও রয়েছে। গানটির একটি অনুলিপি আমার
কাছে এসেছে।
রইস মনরম বলেন, ‘ছত্তার পাগলার গানটি ভাটি অঞ্চলে ব্যাপক জনপ্রিয়।' ছত্তার পাগলার জন্মগ্রহণ করেন নেত্রকোণা জেলার পূর্বধলা থানার লালচাপুর গ্রামে, সেখানেই বেড়ে ওঠা। একাত্তরের পর পুরো পরিবার নিয়ে পাশের উপজেলা বারহাট্টার নুরুল্লাচর গ্রামে বসতি গড়েন। আমৃত্যু সেখানেই বাস করেছেন তিনি।
রইস
মনরম বলেন, গত শতকের ত্রিশ-চল্লিশের দশকে নেত্রকোণার প্রতিটি গ্রামে লেটো গানের দল
ছিল, শৈশবে রাতে ঘর থেকে পালিয়ে গান শুনতে শুনতে গানের প্রতি আসক্তি জন্মে ছত্তার ভাইয়ের।
একসময় নিজেও একটি লেটো গানের দলে ভিড়েছিলেন তিনি। পরে গানের দল ছেড়ে নিজেই গান গাইতে
শুরু করেন, সুর তুলে নিজেই সেই গান পরিবেশন করেন। সত্তর-আশির দশকে রেলস্টেশন কিংবা
হাটবাজারে গানের মজমা জমিয়ে তুলতেন তিনি। ট্রেনে ও রেলস্টেশনেও গান করতেন।
লিচুরও
বাগানে’ ছাড়াও ‘তওবা কইরা বল খেলাডা ছাড়’,
‘কাঙ্গাল মাইরা জাঙ্গাল দিলে গোনাহ হইবো তোর’, ‘ইঞ্জিন ছাড়া ঠেলাইয়া নেই খালি মালগাড়ি’,
লুঙ্গির নিচে টাউজার পইরা ঢাকার শহর যাই,ইলশা মাছের কিতা হইলো যাইন্নাবুইজা আইসহ' বেশ
কয়েকটি গান ভাটি অঞ্চলে জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
‘লিচুরও বাগানে’সহ এসব গান নিয়ে শিগগিরই একটি বই প্রকাশিত হবে। ছত্তার পাগলার বড় মেয়ে দিলোয়ারা বেগম বলেন, আব্বার অনেক আশা-আকাঙ্ক্ষা ছিলো। দেশ জুড়ে তাঁর গান সবাই শুনবে,দেখবে। আমাদের চাওয়ার কোন কিছু নাই। আমরা অনেক আনন্দিত আব্বার গান শুনে।
ছত্তার
পাগলার স্ত্রী মোছাম্মৎ রব্বানু বলেন, হেটে গেলে গান গাইছে, রাস্তায় গেলে গান গাইছে,বাজার,
শহরে,মাজারে সব জায়গাতেই গান গাইছে। উনি আছিন পাগলের বেশে গান গেয়ে জীবন লুটাইছে। অভাবের
সংসারে মানুষ তাঁরে দাম দিছে না।
‘তাণ্ডব’
সিনেমার জন্য গানটিকে নতুনভাবে তুলে ধরেছেন প্রীতম হাসান। মূল গানটির মুখরাকে নেওয়া
হয়েছে। তার সঙ্গে গানটি নতুন করে লিখেছেন প্রীতম হাসান, মেহেদী আনসারি ও ইনামুল তাহসিন।
এতে কণ্ঠ দেন প্রীতম ও জেফার, সঙ্গে আছেন আলেয়া বেগম ও মঙ্গল মিয়া। গানের সুর ও সংগীতায়োজন
করেছেন প্রীতম হাসান।
সিনেমার
পরিচালক রায়হান রাফী বলেন, তাঁরা পুরোনো দিনের একটি গানকে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। সেই
ভাবনা থেকে গানটি নেওয়া হয়েছে। পরিচালকের পক্ষ থেকে এই গানের জন্য ছত্তার পাগলার পরিবারকে
মাত্র বিশ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে।
ছত্তার
পাগলার দুই স্ত্রী,চার ছেলে ও পাঁচ মেয়ে রয়েছে। স্ত্রী সন্তানদের দাবি ছত্তার পাগলার
গান রেডিও, টেলিভিশন ও সিনেমায় প্রচারিত হোক। এতে কোন আপত্তি নাই। তবে গীতিকার হিসেবে
যেন ছত্তার পাগলার নামটি থাকে।
আকাশজমিন/আরআর