আহসান সাকিব হাসান:
পাহাড়ের
বুকে ছোট্ট এক জনপদে বেড়ে
উঠেছেন ২৩ বছরের যুবক
ফয়েজ উদ্দিন। অথচ এই বয়সেই
তিনি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বাংলাদেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করছেন।
নেতৃত্ব দিচ্ছেন একাধিক যুব সংগঠনে, কাজ
করছেন পাহাড়ি মানুষের জীবনমান উন্নয়নে। স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও তার
পদচিহ্ন আজ দেশের গণ্ডি
পেরিয়ে পৌঁছেছে আন্তর্জাতিক পরিসরে।
২০১৭
সালে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির
যুব ইউনিটে রাঙ্গামাটির কাউখালীর একজন স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে
তার কাজ শুরু হয়।
উদ্দেশ্য ছিল একটাই—“এই
মানুষগুলোর জীবনে পরিবর্তন আনতে হবে।” পাহাড়ের
দারিদ্র্য, স্বাস্থ্য সেবা ও নারী
শিক্ষার অভাবই তাকে উদ্বুদ্ধ করেছিল
সেবার এই পথে পা
বাড়াতে।
ফয়েজ
উদ্দিন তার ইন্দোনেশিয়া যাত্রা
সম্পর্কে বলেন, বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২শ
জন ইউথ এডভাইজারি কাউন্সিল
সদস্যের মধ্যে থেকে বিভিন্ন মানদণ্ডের
ভিত্তিতে আমাদের ৬টি জেলার ৬
জনকে প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত করা হয়। এই
নির্বাচিত ৬ জন যুব
প্রতিনিধি টানা ৫ মাস
ধরে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করেছে।
এই
সময়ে আমরা জেলা পর্যায়ে
যুব নেতৃত্বে সামাজিক, উন্নয়নমূলক কাজ করেছি যেমন,
যুব সচেতনতা কার্যক্রম, থিয়েটার ফর ডেভেলপমেন্ট (TfD), পাপেট শো,
বাল্যবিবাহ ও শিশু সুরক্ষা
বিষয়ক প্রচারণা, জলবায়ু পরিবর্তন ও উদ্যোক্তা উন্নয়নমূলক
কার্যক্রম, ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং, মেন্টরশিপ প্রোগ্রাম, এবং চাকরির মেলা
ও উদ্ভাবনী ল্যাব পরিচালনা।
প্রতিটি
কার্যক্রম শেষে আমাদের তৈরি
করা রিপোর্ট, উপস্থাপনা এবং বিভিন্ন দায়িত্বশীল
কাজের ভিত্তিতে Save the Children কর্তৃপক্ষ আমাদের কাজের অগ্রগতি এবং এর প্রভাব
বিশ্লেষণ করেছে। এই ৫ মাসের
নিরলস পরিশ্রম ও পর্যালোচনার পর
২৬ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে চূড়ান্ত
ভাইভা অনুষ্ঠিত হয়।
সবশেষে
আমাদের মধ্যে ২ জনকে Skill to Succeed (S2S) Global Youth Summit
2025, Indonesia-এর জন্য গ্লোবাল অ্যাম্বাসাডর
হিসেবে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত করা হয়। আমি
(ফয়েজ উদ্দিন) এবং সাতক্ষীরার রিজমা
এই গর্বিত দায়িত্ব লাভ করি, যেখানে
আমরা বাংলাদেশের তরুণদের পক্ষে বেকারত্ব, জলবায়ু পরিবর্তন ও যুব উদ্যোক্তা
উন্নয়নের বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক মঞ্চে উপস্থাপন করব।
এই
দীর্ঘ ও চ্যালেঞ্জিং যাত্রা
সহজ ছিল না। অনেক
কঠোর পরিশ্রম, সহযোগিতা এবং ধৈর্যের মাধ্যমে
এই সাফল্য অর্জিত হয়েছে। এজন্য কৃতজ্ঞতা জানাই সেই সকল মানুষের
প্রতি, যারা আমাদের পাশে
থেকে সাহস আর প্রেরণা
যুগিয়েছেন।
ফয়েজ
উদ্দিন, তিনি এখন শুধু
একজন স্বেচ্ছাসেবকই নন—তিনি একাধিক
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংগঠনের
গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আছেন। যেমন, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি–
কাউখালী উপজেলা টিম সাবেক প্রেসিডেন্ট,আরএইচস্টেপ কাউখালি – সাবেক প্রেসিডেন্ট। লিও ক্লাব অফ
চট্টগ্রাম নিউ পোর্ট সিটি–
প্রেসিডেন্ট। সেইভ দা চিলড্রেনএর
ইউথ এডভাইজারি কাউন্সিল– সদস্য। ব্রাক-এর 'আমরা নতুন'
নেটওয়ার্কে "প্রজেক্ট তরী" সহ- প্রতিষ্ঠাতা, আইআইডি-এর ইউথ ফর
পলেসি প্রোগ্রামে পলিসি চ্যাম্পিয়ন,ইউএনডিপি– ভাইস-প্রেসিডেন্ট এর
দায়িত্ব পালন করেছেন।
এসব সংগঠনের মাধ্যমে কাজ করেছেন নারী শিক্ষা ও ক্ষমতায়ন, মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা (বিশেষত পাহাড়ি অঞ্চলে) শিশু সুরক্ষা, শিশু শ্রম ও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশ সচেতনতা, প্রাথমিক চিকিৎসা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, প্রতিবন্ধী অধিকার ও অন্তর্ভুক্তি, যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা (SRHR) ডিজিটাল শিক্ষা ও যুব নেতৃত্ব দিয়েছেন।
তার
নেতৃত্বে বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলোর মধ্যে অন্যতম, প্রজেক্ট তরী: নারী ক্ষমতায়ন,
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও অনলাইন শিক্ষা।
মানষিক স্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্য ক্যাম্প:
রাঙ্গামাটির পাহাড়ি অঞ্চল সহ বাংলাদেশের বিভিন্ন
অঞ্চলে মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা। ফেনী, কুমিল্লা, চাঁদপুর, নোয়াখালী,চট্টগ্রাম: ৫ মাস কাজ,
সহযোগিতায় ছিলেন অলিম্পিক সাঁতারু এমা ম্যাককীন এবং
ইউনিসেফ। যুবদের জন্য নিতি নির্ধারণ:
যুব নীতি নির্ধারণে সরাসরি
অংশগ্রহণ। নারী ও শিশু
স্বাস্থ্য এবং বয়সন্ধিকালী স্বাস্থ্য
সুরক্ষা কর্মসূচি:
কিশোরীদের জন্য পিরিয়ড সচেতনতা।
২০২৪
সালের নভেম্বরে সেইভ দা চিলড্রেন-এর আন্তর্জাতিক সম্মেলনে
অংশ নেওয়ার পর, ২৬ এপ্রিল
২০২৫-এ ফয়েজ এবং
সাতক্ষীরার রিজমা নির্বাচিত হন। Skill to Succeed Global
Youth Summit 2025–এর অ্যাম্বাসাডর হিসেবে। ইন্দোনেশিয়ায় অনুষ্ঠিতব্য এই সামিটে তারা
আলোচনা করবেন বেকারত্ব, জলবায়ু পরিবর্তন এবং উদ্যোক্তা বিকাশ
নিয়ে।
ফয়েজ
উদ্দিন, তার জন্ম নোয়াখালীতে।
শৈশবে চলে আসেন রাঙ্গামাটির
কাউয়াখালীতে এখানেই শুরু হয় তার
সমাজসেবা ও নেতৃত্ব গড়ার
গল্প। তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
একজন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক যুব
নেতৃত্বের মুখপাত্র হিসেবে নিজেকে তুলে ধরা।
ফয়েজ উদ্দিন বলেন, পাহাড়ি অঞ্চলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবার সহজলভ্যতা রয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা বিস্তার, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে টেকসই উদ্যোগ, প্রতিবন্ধী ও নারী অধিকার নিশ্চিতকরণ, গ্লোবাল নীতি নির্ধারণে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করা। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বর হয়ে লড়াই করা তার মূল উদ্দেশ্য।
তিনি
বলেন, “আমি চাই, আমাদের
মত পাহাড়ি ও প্রান্তিক তরুণরাও
নেতৃত্বে আসুক। শুধু ঢাকার না,
বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকেও নেতৃত্ব উঠে আসুক। তাহলেই
দেশ বদলাবে।” বদলে যাবে জলবায়ু
পরিবর্তন, পরিবেশ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য।
ফয়েজ
উদ্দিনের বড় ভাই ইঞ্জিনিয়ার
শাহাদাত হোসাইন বলেন, ফয়েজ ছোট থেকেই মানবিক
ও সমাজসচেতন। স্কুল জীবনে আমরা তাকে একজন
দায়িত্বশীল, শৃঙ্খলাপূর্ণ ও নেতৃত্বগুণে সমৃদ্ধ
ছাত্র হিসেবে পেয়েছি। ক্লাসের পড়ালেখায় সে সর্বদা প্রথম
সারিতে ছিল এবং বিভিন্ন
রচনা, বক্তৃতা, বিতর্কসহ মেধা প্রতিযোগিতায় উপজেলাসহ
জেলা পর্যায়ে সাফল্য অর্জন করেছে। সে আজ গ্রামের
গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের মুখ উজ্জ্বল করছে।
তার স্বেচ্ছাসেবী কাজে আমাদের ভীষণ
ভাবে অনুপ্রাণিত।
আমি
মনে করি, প্রতিটি পরিবার
যদি তাদের সন্তানদের মানবিক মূল্যবোধে গড়ে তোলে এবং
সমাজের প্রতি দায়িত্বশীল করে তোলে, তাহলে
আমরা একদিন অবশ্যই একটি ন্যায়ভিত্তিক, শান্তিপূর্ণ
এবং টেকসই সমাজ গড়ে তুলতে
পারব।
ফয়েজ
উদ্দিনের শিক্ষক আব্দুর রাজ্জাক হোসেন তালুকদার বলেন, প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকায় জন্ম নেওয়া ফয়েজের
শৈশব কেটেছে নানাবিধ সীমাবদ্ধতা, চ্যালেঞ্জ এবং সংগ্রামের মধ্যে।
কিন্তু এই প্রতিকূলতাই তাকে
গড়ে তুলেছে এক সমাজসচেতন, দৃঢ়চেতা
ও মানবিক যুবক হিসেবে। ছোটবেলা
থেকেই পাহাড়ি অঞ্চলের মানুষের জন্য বিভিন্ন ধরনের
সাহায্য করে আসছেন ফয়েজ।
বিশেষ করে নারী শিক্ষার
প্রসার, শিশু শ্রম ও
বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি, দুর্যোগকালে ত্রাণ বিতরণ সহ আরো অনেক
কিছু করেছেন। আমাদের এলাকার মানুষ তাকে সবাই খুব
স্নেহ করে। তার কাজে
অনুপ্রাণিত হয়ে আরো তরুণরা
সেচ্ছাসেবী কাজে যুক্ত হয়েছে।
এভাবেই ধীরে ধীরে সামনের
দিনগুলোতে সুন্দর বাংলাদেশ বিনির্মাণে ভূমিকা রাখবে।
সাধারণত
পাহাড়ি অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পৌঁছানো যেখানে কঠিন, সেখানে ফয়েজ উদ্দিন তার সততা, পরিশ্রম
ও মানবিক গুণাবলীর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে গর্বিত স্থান করে নিয়েছে। আমরা
তার এই অগ্রযাত্রায় গর্বিত
এবং তার ভবিষ্যতের সাফল্য
কামনা করি।”
আজকের
তরুণ প্রজন্ম যখন সোশ্যাল মিডিয়ায়
সীমাবদ্ধ, তখন ফয়েজ উদ্দিন
নিজেকে গড়েছেন মাঠে। সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে হয়েছেন
অসাধারণ একজন। তার এই পথচলা
শুধু অনুপ্রেরণার নয়—বরং প্রমাণ
করে দেয়, নেতৃত্ব আসে
কাজ দিয়ে, স্বপ্ন দিয়ে, এবং সেবার মনোভাব
দিয়ে। তাই-তো তরুণ
প্রজন্মের দ্বারাই সুন্দর পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখছে আগামীর বাংলাদেশ।