কক্সবাজার প্রতিনিধি:
রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে গড়ে তুলেছেন এক ভয়ংকর অপরাধ সাম্রাজ্য। ভয়, ভীতি আর দখলদারিত্বের নামে পুরো একটি ইউনিয়নকে পরিণত করেছেন ব্যক্তিগত ‘নিয়ন্ত্রণশালায়’। কক্সবাজারের রামু উপজেলার দক্ষিণ মিঠাছড়ির প্রতিটি অলিগলিতে এখন উচ্চারিত হচ্ছে একটি নাম- আব্দুল্লাহ ভুট্টো। ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায়ক পরিচয়ে এক বছর ধরে তিনি চালিয়ে যাচ্ছেন চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, বালু উত্তোলন, অস্ত্রের মহড়া আর প্রকাশ্য হুমকির রাজত্ব।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ৫ আগস্টের পর থেকে আব্দুল্লাহ ভুট্টো যেন দক্ষিণ মিঠাছড়িতে এক মূর্তিমান আতঙ্কে পরিণত হয়েছেন। প্রতিশোধপরায়ণ রূপে আবির্ভূত হয়ে পুরো এলাকাকে পরিণত করেছেন তার অপরাধ সাম্রাজ্যের ঘাঁটি হিসেবে। ভয়ের ছায়া এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, নিজের আধিপত্য বজায় রাখতে মিঠাছড়ির বিভিন্ন পয়েন্টে বসিয়েছেন সিসিটিভি ক্যামেরা। এলাকাবাসীর গতিবিধি নজরে রাখতে নিয়েছেন আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তা। শুধু তাই নয়, পুলিশ-প্রশাসনের ভাষা অনুকরণ করে তিনি ব্যবহার করছেন ওয়াকি-টকি সেট- যাতে তার সহযোগীরা মুহূর্তেই খবর পৌঁছে দিতে পারে। স্থানীয়দের ভাষায়, এখন মিঠাছড়িতে ভুট্টোর অনুমতি ছাড়া নিঃশ্বাস নেওয়ারও উপায় নেই। কেউ মুখ খুললেই জোটে মামলা, হামলা বা গুলি। প্রশাসনের নীরবতা আর রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় ক্রমশ বেড়ে চলছে তার অপরাধী দাপট।
এতে
স্থানীয়দের মধ্যে বিরাজ করছে তীব্র আতঙ্ক ও অসন্তোষ। রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে অস্ত্রের
মহড়া ও হুমকির একের পর এক ঘটনায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে স্থানীয় জনসাধারণ।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে গত শুক্রবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে। দক্ষিণ মিঠাছড়ি স্টেশনে প্রকাশ্যে প্রতিপক্ষের ওপর দুই রাউন্ড গুলি ছোড়ে ভুট্টো ও তার সহযোগীরা। কেউ গুলিবিদ্ধ না হলেও পুরো এলাকা মুহূর্তে থমথমে হয়ে ওঠে। ঘটনার পর থেকে ভুক্তভোগীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
ভুক্তভোগী আহমদ উল্লাহ রামু থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। তিনি জানান, আমি বিগত ইউপি নির্বাচনে মেম্বার পদপ্রার্থী দুদু মিয়ার পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছিলাম। আবদুল্লাহ ভুট্টো ছিল তার প্রতিদ্বন্দ্বী। নির্বাচনে ভুট্টো হেরে যাওয়ার পর থেকেই আমাদের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। কিছুদিন আগে সে এক লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে, না দিলে পুলিশ দিয়ে হয়রানির হুমকি দেয়।
চাঁদা না দেওয়ায় ভুট্টো আহমদ উল্লাহকে স্টেশনে যেতে নিষেধ করে। শুক্রবার সন্ধ্যায় আহমদের ভাই সালামত উল্লাহ বাজারে গেলে, অস্ত্র হাতে ধাওয়া করে তাকে। সালামত দৌঁড়ে বাড়িতে ঢুকে পড়লে, পরিবার জানতে ঘটনাস্থলে আসে। তখন তাদের লক্ষ্য করেই ভুট্টো গুলি ছোড়ে।
বাজারের প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ভুট্টো দুই রাউন্ড গুলি ছুড়েছে। গুলি কারও গায়ে না লাগলেও আতঙ্কে পুরো বাজার ফাঁকা হয়ে যায়। এই প্রথম নয়, সে আগেও এমন করেছে।
স্থানীয়দের দাবি, ৫ আগস্টের পর থেকে আব্দুল্লাহ ভুট্টো একেবারে খোলাখুলি চাঁদাবাজির রাজত্ব চালাচ্ছেন। রাজনৈতিক মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে তিনি টার্গেট করছেন এলাকার ব্যবসায়ী ও বিত্তশালীদের। কারও জমি আছে, কেউ ঘর তুলছে বা ব্যবসা করছে- সবাইকে গিলে খেতে চান ভুট্টো। মাসোয়ারা না দিলে সরাসরি বলে- হত্যা মামলায় ঢুকিয়ে দেব, তখন আর কাউকে খুঁজে পাবে না। এমন হুমকিতে আতঙ্কিত হয়ে অনেকেই এখন মাসে মাসে চাঁদা দিয়ে জীবন বাঁচানোর পথ খুঁজছেন।
শফি আলম নামে এক গাছ ব্যবসায়ী জানান, প্রথমে এসে বলে- আমার নাকি আওয়ামী লীগের সঙ্গে যোগাযোগ আছে। এই কারণে চুপচাপ এক লাখ টাকা দিতে হবে, না হলে খুনের মামলায় ফাঁসিয়ে দেবে। আমি বাধ্য হয়ে টাকা দিয়েছি। পরিবার নিয়ে আছি, প্রতিবাদ করার সাহস পাই না। ভুক্তভোগীদের দাবি, এভাবেই রাজনৈতিক যোগাযোগের অজুহাত তুলে ভয়ভীতি দেখিয়ে আব্দুল্লাহ ভুট্টো নিয়মিতভাবে চাঁদা আদায় করছেন। অনেকে আতঙ্কে মুখ খুলতে না পারলেও দিনের পর দিন তার হাতে নিঃশব্দে টাকা তুলে দিচ্ছেন।
আরেকজন ব্যবসায়ী জানান, আমি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত না, তাও বলে- টাকা না দিলে আপনাকেই মামলায় ঢুকিয়ে দিব। এভাবে দুইবার টাকা নিয়েছে।স্থানীয় এক সমাজ কর্মী বলেন, টাকা না দিলে রাজনৈতিক পরিচয়কে হাতিয়ার বানিয়ে ভয় দেখায়। বলে, ‘এলাকার নিয়ন্ত্রণ আমার হাতে, কেউ টুঁ শব্দ করলে খবর আছে। এলাকাবাসীর ভাষ্য অনুযায়ী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নীরবতা ভুট্টোর এই চাঁদাবাজিকে আরও উৎসাহ দিচ্ছে। এখন তার ভয়েই অনেকে বাড়ির সামনে সিসিটিভি বসাচ্ছেন, কেউ কেউ এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছেন।
এক প্রবীণ নাগরিক বলেন, ভুট্টো এখন আর রাজনৈতিক নেতা না, সে একজন স্থানীয় গডফাদার। প্রশাসন কিছু না বলায় সে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, যে এলাকায় চাঁদার টাকা না দিলেই গুলি চলে, সেখানে রাষ্ট্রের অস্তিত্ব প্রশ্নবিদ্ধ। রাজনৈতিক পরিচয়ে এসব অপরাধীদের রক্ষা করা মানেই সন্ত্রাসকে প্রতিষ্ঠা করা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে দক্ষিণ মিঠাছড়ি ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায়ক আব্দুল্লাহ ভুট্টো সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এসব ভিত্তিহীন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ষড়যন্ত্র। আমাকে সামাজিকভাবে হেয় করার জন্য একটি পক্ষ এসব মিথ্যা প্রচার চালাচ্ছে। জেলা যুবদলের সভাপতি ছৈয়দ মো. উজ্জ্বল বলেন, গুলির ঘটনার কথা শুনেছি। তবে ঘটনাটি সত্য না মিথ্যা, সেটি এখনো নিশ্চিত না। ভুক্তভোগীরা চাইলে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। সত্যতা পেলে সাংগঠনিকভাবে আমরা অবশ্যই ব্যবস্থা নেবো।
বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির মৎস্যজীবী বিষয়ক সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল বলেন, কোনো ব্যক্তির দায় দল বহন করবে না। দল কাউকে গুলাগুলি করার অধিকার দেয়নি। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে যথাযথ সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।###
আকাশজমিন/আরআর